গণতন্ত্রের পথযাত্রা…ডা. এম এ হাসান

যে বাংলার রাজনীতি একসময় সর্বভারতীয় রাজনীতিকে পথ দেখিয়ে প্রভাবিত করেছে, সামগ্রিকভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারত ও বাংলাকে মুক্তির পথ দেখিয়েছে, তা আজ নানা পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত। যে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, সততা ও ত্যাগ পাকিস্তানিদের বিতাড়ন করে বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা অন্তর্হিত। যে দেশের সংসদ সদস্যরা নতুন দেশ নির্মাণে নানা পথ দেখিয়েছেন, অসাধারণ এক সংবিধান রচনা করেছেন, তাঁদের উত্তরসূরিরা এখন রাজনৈতিক ব্যবসায়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দেশ ও জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ বা লুণ্ঠনে তাঁরা যে কেবল দ্বিধাহীন তা-ই নয়, তাঁদের রাজনীতির পেছনে লুণ্ঠনই মুখ্য উদ্দেশ্য। জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন নয়, বাঁকা পথে আইন পরিচালনা করে, প্রশাসনকে প্রভাবিত ও ব্যবহার করে জনসম্পদ লুণ্ঠন ও ক্ষমতাবান হওয়ার জন্যই কিছু ধুরন্ধর ব্যক্তি তথা মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া একেকটি ক্ষমতার বলয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই ক্ষমতার বলয়গুলোই হলো তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দল। নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যম। এ নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের অধিকার, আশা, আকাঙ্ক্ষা ও গণতন্ত্রের খুব অল্পই সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতার মঞ্চ বা আখড়ায় যাওয়ার জন্য একেকটি দল বা গোষ্ঠী যে প্রয়াস চালায়, তার লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি এক ভোজ ও লুণ্ঠনের অবাধ ক্ষেত্র। এ কারণে অবস্থা পরিপক্ব না হওয়া পর্যন্ত দেশ নামক একটি দেহ ঘিরে লড়াই চলতে থাকে তাদের মধ্যে। বিরোধীপক্ষ কেবল অপেক্ষা করে ‘পাঁচ বছর মেয়াদি এক পূর্ণ ভোজ’-এর জন্য। এর আগে কেবলই বিতণ্ডা ও বিবাদ। এটা প্রাচীন মিসর, পারস্য, ইয়াহুদি, হিট্টি বা গ্রিক ঐতিহ্য বহন করে না। এটা Hammurabi-এর Code বা মনুর কোড অনুসরণ করে না। এর সঙ্গে প্রাচীনPolis বা প্লেটোর রিপাবলিক-সংশ্লিষ্ট সংঘের কোনো সম্পর্ক নেই।
এ ক্ষেত্রে জনগণ ভয়াবহ রকম অসহায়, ক্ষেত্রবিশেষে মূর্খতায় নিমজ্জিত নির্বাক গোষ্ঠী। আর এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত নির্মাণ। রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যায়ে সর্বজনের অংশীদারি নিশ্চিত করে সামাজিক ন্যায় ও স্বচ্ছতানির্ভর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা গেলেই গণতন্ত্রের ধারাটি সত্যিকার অর্থে চলমান হতে পারে। স্থানীয় সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক ধারা ও রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করে তা শক্তিশালী করা না গেলে ফড়িয়াতন্ত্র ও লুটেরাতন্ত্র থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। তৃণমূল পর্যায়ে সব কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত না হলে স্বৈরতন্ত্র, মোড়লতন্ত্র ও নবতর রাজতন্ত্র উৎখাত করা যাবে না। পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, ব্যক্তি অহংকারকে কবর দিতে না পারলে বহুমত প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
দুঃখজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের জনপ্রতিনিধিরা একেকজন ভূস্বামী, ভূমিপুত্র বা ছোটখাটো রাজার মতো আচরণ করেন। মাফিয়া ও লুটেরারা কখনো কখনো তাঁদের ব্যবহার করে বৃহদাকার মৎস্য কর্তৃক ছোট মৎস্য গ্রহণের সংস্কৃতি ‘মাৎস্যন্যায়’ চাপিয়ে দেয় জনগণের ওপর। তাদের দাপট ও প্রচার-প্রচারণার কারণে জনগণ ও সমাজ আক্ষরিক অর্থে নিজেদের প্রজা ভাবতে শুরু করে। ক্ষমতার অবৈধ চর্চা, অর্থের অপপ্রয়োগ সাধারণের মূল্যবোধ ও অহংকার চুরমার করে দেয়। জনগণ অন্যায়ের সঙ্গে সহবাস ও নতজানু জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো কোনো এক প্রান্তে তাদের রুখে দেওয়া। এভাবে জনগণ ন্যায়, সত্য, বিকল্প বিচার ও প্রকৃত গণতন্ত্র সামনে আনতে পারে। প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন যে গণতন্ত্রের জন্য সব কিছু নয় বা শরীরের সবটা নয়- এটা জনগণকে বুঝতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনের ধুয়া তুলে জনগণ ও মিডিয়াকে ব্যবহার করে কেবল নিজেদের ফায়দা হাসিল করে। জনগণের সম্মান, অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে এই পালাবদলের খেলা কখনোই জনকল্যাণ আনে না। গৃহনির্মাণের আগে গৃহপ্রবেশ যে কতটা অর্থহীন, তা জনগণ ও সব বুদ্ধিজীবীকে অনুভব করতে হবে।
এর পরও এই ক্রান্তিকালে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার সৃষ্টি নিঃসন্দেহে একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে। এ বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এই সরকারের প্রধান নিয়ে বিতণ্ডা পরিহার করা প্রয়োজন। এমন অবস্থান পরিহার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দু-চার সপ্তাহ আগে নিজ পদ থেকে ইস্তফা দিতে পারেন বা ছুটি নিতে পারেন। এই সময় রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা দিতে পারেন এবং অল্প সময়ের জন্য ওই সরকার পরিচালনা করতে পারেন। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ক্ষুদ্র মন্ত্রিসভায় নির্দলীয় উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে পারেন। স্পিকারও এই সরকারের প্রধান হতে পারেন।
নির্বাচন সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে নির্বাচন কমিশনের সদস্যসংখ্যা ন্যূনতম ৯ করা প্রয়োজন। এই কমিশন কমপক্ষে দুজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। এতে খোদ কমিশনের সিদ্ধান্তে একটি গণতান্ত্রিক অবস্থা ও ভারসাম্য থাকবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আইন এমনভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন, যাতে অশিক্ষিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি মনোনয়ন পেতে না পারে। কেউ অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে নির্বাচিত হওয়ার আগে তাকে নির্দোষ প্রমাণিত হতে হবে। জনগণের ‘না’ ভোটের অধিকার থাকতে হবে। সর্বোচ্চসংখ্যক ‘না’ ভোটপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হবেন। সংসদ বয়কটকারীরা রাজনীতিতে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন; বিশেষ করে যাঁরা বিনা কারণে ৩০ দিনের বেশি গরহাজির হবেন বা ৬০ দিনের বেশি অসুস্থ থাকবেন। আয়কর না দিয়ে বা সম্পত্তির হিসাব না দিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। কোনো সংসদ সদস্যই লাভজনক ব্যবসা, সরকারি টেন্ডার বা উন্নয়নকর্মের লাভালাভের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না।
কেবল লুটেরাতন্ত্র, ফড়িয়াতন্ত্র বা রাজনীতিবিদরাই জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় নন। জনগণের শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা তথা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রজার সম্পর্ক সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলো এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। জনগণ রাষ্ট্রনায়ককে ঈশ্বরতুল্য বা দেবতা জ্ঞান করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের পূজাপ্রবণতা। এতে রাষ্ট্রনায়ক ও সামজপতিরা দেবতা ও রাজারূপে পূজিত হন। জনগণ নিজেদের অধিকার ও সম্মান বিস্মৃত হয়ে নিজেদের দীনহীন গ্রহীতা হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বেগবান করে ভাবনার জগতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এই দর্শন বোঝার জন্য এবং জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য জনগণকেই উদ্যোগী হতে হবে। জনগণের বোধোদয় আসতে হবে নিজেদের মধ্য থেকে। জনগণ যখন নিজেকে ও অন্যকে সম্মান করতে শিখবে এবং ন্যায়ভিত্তিক সংস্কৃতি বিকাশে মনোযোগী হবে, তখনই সাম্য ও গণতন্ত্র ধরাছোঁয়ার মধ্যে আসবে। এ জন্য তাদের নির্মাণ করতে হবে নতুন আত্মপরিচয় আর বর্জন করতে হবে পুরনো জীর্ণ পরিচয়। এটা একটা শিল্প তথা বিশ্বাস। এটা যেমন সংস্কৃতি, তেমনি বিজ্ঞান। বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে কারো পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। পথ দেখানো সম্ভব। জনগণকে পরিবর্তন চাইতে হবে এবং তা বিশ্বাস করতে হবে। এ বিশ্বাসটি জ্যামিতির উপপাদ্যের মতো যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। ভক্তি ও পূজাকে এক করলে চলবে না। অন্ধত্ব বর্জন করে চক্ষুষ্মান হতে হবে। বুদ্ধিভিত্তিক বিচার প্রয়োগ করতে হবে। শান্তি ও সামাজিক ন্যায় সম্পর্কিত ধারণাটি প্রয়োগ করতে হবে। সব চিন্তা আবর্তিত হবে সুস্থ সমাজ ও শান্তিকে ঘিরে। সমষ্টির কল্যাণ ও মর্যাদা কখনো বিস্মৃত হওয়া যাবে না।
লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি