গণতন্ত্র চাই, ষড়যন্ত্র নয়…সৈয়দ আবুল মকসুদ

কোরবানির ঈদের তিন-চার দিন আগে এক সাংবাদিক আমাকে জানতে চাইলেন, ২৪ অক্টোবরের আর দেরি নেই। আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমঝোতা হবে বলে আমি মনে করি কি না। তখন ফাঁকা জায়গায় ও রাস্তার ওপর গরুর হাট বসা শুরু হয়েছিল। আমি তাঁকে বলেছিলাম: দুনিয়ায় হঠাৎ হঠাৎ অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনা ঘটে বলে শুনেছি। কোরবানির গরুগুলো যদি রাস্তা থেকে উড়াল দিয়ে গাছের ডালে গিয়ে বসে হাম্বা হাম্বা করে, অথবা নদ-নদীর মাছগুলো যদি ডাঙায় উঠে এসে মানুষের মতো কথা বলতে থাকে—তা ঘটলেও ঘটতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ-বিএনপি এক টেবিলে বসে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছাবে, তেমন অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমি বিশ্বাস করি না।
এর মধ্যে প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল যে যেকোনো দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও আভাসে মানুষকে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার কিছু প্রস্তাব থাকবে। সে কারণে মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার জন্য কান খাড়া রেখে ছিল। ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনি ভাষণ দেন। মিনিট বিশেকের ভাষণের শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য রক্ষা করতে পারেনি আমাদের মিডিয়া। ভাষণের প্রতিক্রিয়ার জন্য দিগিবদিক ছোটে। বাংলাদেশে কোনো বইয়ের চেয়ে তার রিভিউ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কোনো ভাষণের বিষয়বস্তুর চেয়ে তার প্রতিক্রিয়ার দাম বেশি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আমি আশাবাদীও নই, হতাশও নই। কিন্তু পেশাদার ভাষ্যকার ও চিরচেনা টক শো পাত্রপাত্রীদের প্রতিক্রিয়ায় গভীর—গভীরতর হতাশায় ডুবে যাওয়ার জো হয়েছে।
কোনো দেশের ভালো-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গল শুধু তার রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের ওপর নির্ভর করে না। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেতৃস্থানীয়দের বিচার-বিবেচনা, যুক্তিবাদিতা, দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতা ছাড়া রাষ্ট্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হতে পারে না। সংকটটি যেখানে একই সঙ্গে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক, সেখানে ভাষণটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই ও বিশ্লেষণ না করে শোনামাত্রই বগল বেজে উঠল। অনেকের কথা শুনে মনে হলো, তাঁদের অভিমত: আহা, এই তো চাই। এরই অপেক্ষায় ছিলাম চার বছর। নাগরিক সমাজের মিডিয়ানিযুক্ত মুখপাত্র, ব্যবসায়ী সমাজের নির্বাচিত মুখপাত্র অথবা যাঁকে কেউই কোনো দায়িত্ব দেয়নি, তিনিও নিজ দায়িত্বে বলে উঠলেন: সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
ওদিকে যাঁরা আসল লোক, আওয়ামী লীগের সাড়ে তিনজন এবং বিএনপির আড়াইজন মুখপাত্র নিজস্ব পরিচয় খুইয়ে হয়ে গেছেন তোতা মিয়া। তোতা পাখি যেমন মালিকের শেখানো একই কথা সারা দিন বলতে থাকে, তাঁরাও নেতার মুখের ও মনের কথাই প্রতিদিন প্রেসক্লাব ও রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাকক্ষ থেকে আওড়ান। বিচার-বিবেচনা করে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেন না কেউ। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট যে আজ এই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছেছে, তার মূল কারণ সেটাই। দেশ চুলোয় যাক, নিজের ভাগ্য ঠিক থাকলেই হলো।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ১৫টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গণতন্ত্রকে একটি সুদৃঢ় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বদ্ধপরিকর।’ তৃতীয় পরিচ্ছেদে আছে: ‘[আগে] একজন দিনমজুর সারা দিনের পরিশ্রম শেষে দুই কেজি চাল কেনার মতো মজুরি পেত না। আজ তার মজুরির টাকায় সে ৮ থেকে ১০ কেজি চাল কিনতে পারছে।’ চতুর্থ পরিচ্ছেদে: ‘ঘরের কাছে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ডাক্তার ও নার্সদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা ও বিনা মূল্যে ওষুধ পাচ্ছেন।’ পঞ্চমে আছে: ‘[সব ধরনের সরকারি কর্মকর্তার] বেতন-ভাতা বাড়িয়েছি।…বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরে পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেছি, পদের নাম পরিবর্তন করে মর্যাদাপূর্ণ নামকরণ চলমান রয়েছে।’ অষ্টমে আছে: ‘আপনাদের সমর্থন নিয়ে আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেব ইনশাল্লাহ।’ ১১তম পরিচ্ছেদে আছে: ‘২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে হত্যা-সন্ত্রাস-ধর্ষণ-লুটপাট-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দেশকে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিয়েছিল। সেই দুঃসহ দহন-জ্বালার আতঙ্ক মানুষকে এখনো তাড়া করে ফেরে।…দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথ বেয়ে।’ এর পরই ১২তম পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘এ অবস্থায় বিরোধী দলের কাছে আমার আহ্বান—বোমা মেরে, আগুন জ্বালিয়ে জনগণের জানমালের ক্ষতি করবেন না। কোরআন শরিফ পুড়িয়ে, মসজিদে আগুন দিয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা বন্ধ করুন। নিরীহ পথচারী আর গরিব বাস ড্রাইভারকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করুন। মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন।…কাজেই ছুরি, দা, খুন্তা, কুড়াল নিয়ে মানুষ মারার নির্দেশ প্রত্যাহার করার জন্য আমি বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
খালেদা জিয়া মানুষকে পুড়িয়ে মারার ‘নির্দেশ প্রত্যাহার’ করবেন কি করবেন না, তা তাঁর ব্যাপার। তাঁর ও তাঁর জোটের নেতাদের দাবি, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই প্রশ্নে একটি অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতির ভাষ্যকারেরা চিন্তিত। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের যে বাক্যটি শুনে তাঁরা করতালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছেন এবং পত্রপত্রিকাও প্রকাণ্ড শিরোনাম দিয়েছে ‘সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব’—তা হলো: ‘আমরা সকল দলকে সঙ্গে নিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাই। বিরোধী দলের কাছে আমার প্রস্তাব, নির্বাচনকালীন আমরা সকল দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন করতে পারি।…আমি বিরোধী দলের নেতাকে অনুরোধ করছি যে, তিনি আমার এই ডাকে সাড়া দেবেন। আমার এই অনুরোধ তিনি রক্ষা করবেন এবং আমাদের যে সদিচ্ছা, সেই সদিচ্ছার মূল্য তিনি দেবেন।’
বিরোধী দলের নেতা প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার মূল্য না দিলে বিশেষ কিছু আসে যায় না। তাঁকে বাদ দিয়েও দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করা সম্ভব যদি সরকারের নিজের সদিচ্ছা থাকে। সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ অনেকে শুনেছেন, কিন্তু তার টেক্সট পাঠ করার অবকাশ অনেকেরই হয়নি। কোনো ভাষণ বিশ্লেষণ করে বোঝার জন্য ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই। জাঁক দেরিদা বা জিওফ্রে হার্টম্যান প্রমুখের গ্রন্থাবলিও পড়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা একই। ‘সকল দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন’—কথাটির অর্থ যত সহজ, তার ব্যাখ্যা তত সহজ নয়। ‘সকল দল’ বলতে এখন যেসব দল সংসদে আছে, সেগুলো যেমন—আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি হতে পারে। অথবা নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত গোটা চল্লিশেক দল এবং অবিলম্বে যে গুরুত্বপূর্ণ দলটি (বিএনএফ) নিবন্ধিত হতে যাচ্ছে, সেটিসহ বাংলার মাটিতে যত দল আছে সব। ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, হিন্দু লীগ, ইসলামী ঐক্যজোট বা জাতীয় হিন্দু পরিষদ প্রভৃতি দলের কী রকম প্রতিনিধিত্ব ওই সরকারে থাকবে, তা জানা যায়নি। ‘সর্বদলীয়’ ও ‘নির্দলীয়’ দুই জিনিস।
ভাষণের পর প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, প্রস্তাবিত ‘সর্বদলীয় সরকার’ হলেই বাংলাদেশে চিরদিনের জন্য গণতন্ত্রের ল্যাঠা চুকে যাবে। বাংলাদেশে সব দল মিলে যদি একটি সর্বদলীয় সরকার গঠিত হয়ই, তা হলে নির্বাচন করার দরকার কী? সেই সরকারই হবে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক সরকার। শতভাগ মানুষের সরকার।
কথিত সর্বদলীয় সরকার ১১ সদস্যবিশিষ্ট হবে, নাকি ৩১ সদস্যবিশিষ্ট হবে, নাকি ৮১ সদস্যবিশিষ্ট হবে, তা স্পষ্ট নয়। কোন দলের কতটা প্রতিনিধিত্ব থাকবে, তাও অজানা। এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়েছে কি না, তা আমরা জানি না। সবচেয়ে ভালো হতো এবং সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ থাকত যদি প্রস্তাবিত সরকারের রূপরেখাটি নিয়ে সংসদে আলোচনা হতো। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেও যদি সংসদে আলোচনা হতো, তারও একটি মূল্য থাকত।
মন্ত্রী-মুখপাত্রদের কথায় জানা যাচ্ছে, সরকারের অভিপ্রায় বর্তমান সংসদে যেসব দলের যতটা প্রতিনিধিত্ব আছে, তার ভিত্তিতেই মন্ত্রিত্ব বরাদ্দ বা উপহার দেওয়া হবে। বিরোধী দল বলতে পারে, সম্প্রতি পাঁচ সিটি নির্বাচনের দলীয় ভোটের অনুপাতে মন্ত্রিত্ব চাই। সে আবদারও গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে যৌক্তিক হবে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮-এর নির্বাচনে দলীয়ভিত্তিক ভোট প্রাপ্তির গড় করে যা হবে—প্রতিটি দলের সেই অনুপাতেই মন্ত্রিত্ব থাকবে। সর্বসম্মতভাবে কোনো কিছু করা বাংলার মাটিতে অসম্ভব। সুতরাং সর্বদলীয় এই প্রস্তাব যে বায়বীয়, তা বিশেষজ্ঞরা না বুঝলেও অনেক বালিকা ও বালকও বোঝে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ১৪ পরিচ্ছেদটি সাংবিধানিক ধারা-সংক্রান্ত। ওসব আমার মাথায় ঢোকেনি। তবে তিনি বলেছেন: ‘সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের এক দফা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন।’ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচন কমিশনও এক পায়ে খাড়া। জানুয়ারিতে পুনর্নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রস্তুতি সম্পন্ন।
দুর্দিনে আওয়ামী লীগ সহযোগীদের কাছে পেতে চাইছে। একটি নৈশভোজ হলো। জনগণ যা ছয় মাস আগেই জানত, ২০ অক্টোবর রাত ১১টার সংবাদে তাই নতুন করে জানল। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে আওরঙ্গজেব ও ক্লাইভের সরকারও বহু বছর টিকে গিয়েছিল। বাংলাদেশে যেকোনো সরকারেরই একটি বিরাট সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হবে, ক্লাইভের সময় যেমন হয়েছিল। কিন্তু সেই ক্লাইভেরও বিচার হয়েছিল এবং তিনি আত্মগ্লানিতে নিজের ক্ষুর দিয়ে গলা কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন।
গণতন্ত্রকে সবচেয়ে ভালো শাসনব্যবস্থা বলা হয়। ভালো-মন্দ যা-ই হোক, এখন পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। এ ব্যবস্থায় দুর্বলতা অনেক। ব্যক্তিগতভাবে আমি গণতন্ত্রের যে জিনিসটিকে অপছন্দ করি তা হলো, এতে অনেক সময় একটি প্রগতিশীল দলকে বাদ দিয়ে জনগণ অপেক্ষাকৃত অপ্রগতিশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল দলকে বেছে নেয় এবং তাকে ক্ষমতায় বসায়। যেসব প্রগতিশীল রাজনীতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁদের এই বাস্তবতা মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না। প্রত্যেক গণতান্ত্রিক নেতার নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত খারাপ প্রার্থীর কাছেও পরাজয়ের জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। যদি তা না থাকে, তা হলে বুঝতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে তাঁর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। তা ছাড়া গণতন্ত্র জিনিসটি টেস্ট রিলিফ বা কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের চাল বা গম নয় যে কাউকে কিছু দিলাম আর কিছু দিলাম না।
রাজনৈতিক সংকট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব, কিন্তু সংবিধানে যদি কোনো গন্ডগোল থাকে, তা বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে মীমাংসা করতে হয়। আগামীকালই যদি বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সম্মত হন এবং পরিকল্পিত সরকারে শিপিং বা নৌ-যোগাযোগ মন্ত্রণালয় পেয়েও আপত্তি না করেন এবং সুপরিকল্পিত নির্বাচনে চল্লিশের মতো আসন পেয়েও সন্তুষ্ট থাকেন, তা হলেও বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট থেকে যাবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পরে সংবিধানের যে দশা হয়েছে, তা আমাদের চেয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলে যাঁরা প্রতিদিন আখ্যায়িত, তাঁরাই জানেন।
বর্তমানে বিরোধী দলে যাঁরা আছেন, তাঁদের মেধা, যোগ্যতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মন-মানসিকতা আমাদের অজানা নয়। তাঁদের কাছে গণতন্ত্রের চেয়ে ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের শাসনে জাতি কী পরিমাণ উপকৃত হবে, তা বিধাতার চেয়ে বিড়ি-সিগ্রেট বিক্রেতা ভালো জানে। তাঁরা সংবিধানের গলদগুলো সংশোধনের কথা বলছেন না। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছে একটি বিনীত অনুরোধ রাখতে চাই, অনুগ্রহ করে সংবিধানের অসংগতিগুলো দূর করতে একটি কমিটি গঠন করে সুপারিশ তৈরি করুন। ব্যক্তিস্বার্থে সংবিধানের মনগড়া ব্যাখ্যা দেওয়ার অবকাশ যেন না থাকে। এ দেশের মানুষ গোঁজামিল না, ষড়যন্ত্র তো নয়ই—গণতন্ত্র চায়।
বর্তমান সময়ের কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মনকে বড়ই পীড়া দিচ্ছে। সোজা পথের চেয়ে ভালো আর কোনো পথ হয় না। কী আশ্চর্য! ২০১৩ সালে এসে যদি দেখি মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতির বক্তব্যই সত্য, তা হলে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর আত্মা হাহাকার করবে। আর আমরা যাঁরা ষাটের দশকে স্বাধিকার আন্দোলনে সামান্যও সম্পৃক্ত ছিলাম, তাঁদের জীবনে তা হবে এক বিরাট ট্র্যাজেডি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।