গণমাধ্যমকে দুষলেন পোশাক মালিকেরা

তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দায়ী করেছেন এই শিল্পের মালিকেরা। এই শিল্পে এভাবে নৈরাজ্য চললে তাঁরা ঈদের বেতন-বোনাস দিতে পারবেন না বলেও হুমকি দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, কোমলমতি নারী-পুরুষ শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে পোশাকশিল্পে অগ্নস্ফুিলিঙ্গ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছে।
পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মালিকপক্ষ এভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। সংবাদ সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ছিল বস্ত্র খাতের মালিকদের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিজিএমইএ ভবনে এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান। এ সময় সংগঠনগুলোর বর্তমান ও সাবেক সভাপতিসহ ঊর্ধ্বতন নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গণমাধ্যমে পোশাকশিল্পকে নিয়ে কিছু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অসত্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে, যা একান্তভাবে অনভিপ্রেত। পোশাকশিল্পের জন্য প্রচণ্ড মানহানিকর ও ক্ষতিকর।
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ মনে করে বিজিএমইএ। তারা বলে, গত সোমবার একটি জাতীয় পত্রিকায় পোশাকশিল্পের মজুরি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্যমূলক ও অসত্য। তবে তারা পত্রিকাটির নাম উল্লেখ করেনি। এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘এটি পোশাকশিল্পের শান্তি বিনষ্ট তথা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াস বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাকশিল্পের মজুরি সর্বনিম্ন, যা মোটেও সত্য নয়।’
সোমবার বিবিসিও একটি প্রতিবেদন করে। বিজিএমইএ প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলেছে, বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানায় এক পালায় ১৯ ঘণ্টা করে শ্রমিককে কাজ করতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে। কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়লেও মালিকপক্ষ ছাড় দেয় না। প্রতিবেদনটির কঠোর সমালোচনা করে সংগঠনটি বলেছে, এটি মোটেও সত্য নয়। এ বিষয়ে তদন্ত করে সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে একজন সাংবাদিক বলেন, আপনারা নাম উল্লেখ না করলেও প্রতিবেদনটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি বা প্রথম আলোর কী স্বার্থ যে তারা এমন প্রতিবেদন করবে? এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি বিজিএমইএ। তবে সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক এবং এই শিল্পের প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র জড়িত। এগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি মনে করেন, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম সমস্যার সমাধান হতে পারে না। মজুরি বোর্ড শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নিতে পারবে।
গার্ডিয়ান-এর মতো বিখ্যাত পত্রিকায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে প্রতিবেদনেরও কড়া সমালোচনা করেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। তাঁরা বলেন, পোশাকশিল্পে কমপ্লায়েন্স বা কর্মপরিবেশ ইস্যুতে যখন ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিয়ে সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে কাজ হচ্ছে, তখন এমন বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ দেশীয় পোশাকশিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা কাম্য নয়।
প্রশ্ন-উত্তর পর্বে আরেকজন সাংবাদিক বলেন, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কিছু রুগ্ণ পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে চায়। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত একদল শিল্পের মালিক উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকেন, তারা তাদের শিল্প ছেড়ে দিতে চান সিপিডির কাছে, গণমাধ্যমের কাছে, টক শোতে সমালোচনাকারীদের কাছে…।
তবে রাতে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁরা কখনোই এমন কারখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে চাননি।
নাম না বললেও প্রথম আলোতে প্রকাশিত পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নিয়ে প্রতিবেদনের তথ্য খণ্ডন করে সম্মেলনে দাবি করা হয়, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইনে বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কাজের পরিবেশ, ঝুঁকি ও মান। বিভিন্ন শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও ক্ষতিকর বস্তু বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসার প্রবণতা, কর্মপরিবেশ, কায়িক পরিশ্রম ইত্যাদির বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন শিল্পে মজুরি ভিন্ন হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে একজন নির্মাণশ্রমিক, একজন ট্যানারি শ্রমিকের কর্মপ্রকৃতি, পরিবেশ ও ঝুঁকি পোশাক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশি। আবার চাতালশ্রমিকের শ্রমকাল মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে পোশাক খাতের মতো সারা বছর কাজের সুযোগ থাকে না। এ প্রসঙ্গে পোশাকশিল্পের চেয়ে আরও অন্তত পাঁচটি খাতে শ্রমিকের নিম্ন মজুরি রয়েছে বলে তথ্য দেয় বিজিএমইএ। তবে এ খাতগুলো পোশাক খাতের মতো এত বড় নয়, সংগঠিতও নয়।
তৈরি পোশাক খাতে চলমান অস্থিরতা সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত কয়েক দিনে অনেক কারখানায় উৎপাদন হয়নি। এই নৈরাজ্য চলতে থাকলে অনেক মালিক ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিতে সক্ষম হবেন না।
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মালিক ও শ্রমিকদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দর-কষাকষি হবে বলে মনে করেন বিটিএমএর সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন। তিনি বলেন, ন্যূনতম মজুরি সম্মানজনক অবস্থানে আসতে হবে। বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, ‘মজুরি বৃদ্ধি অযৌক্তিক বলছি না। তবে আমাদের সক্ষমতা দেখতে হবে। উসকানিমূলক কথা বলা উচিত হবে না।’ যৌক্তিক ও সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আহ্বান জানাান বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী।