গণহত্যা-ধর্ষণ প্রমাণ হওয়ার পরও সাজা হয় যাবজ্জীবন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ওরফে কসাই কাদেরের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধ প্রমাণের পরও তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ কারণে এ রায়ের পর দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। চাপে পড়ে সরকার আইসিটি আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়। কাদের মোল্লার শাস্তি বাড়াতে সরকার আপিল করতেও বাধ্য হয়। ওই আপিল এবং কাদের মোল্লার নিজের করা আপিলের ওপর আজ রায় দেবেন আপিল বিভাগ।
কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দেওয়া রায়ে বলা হয়- মিরপুরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের সঙ্গে নিজে ও দলগতভাবে কাদের মোল্লা জড়িত ছিলেন বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু বিহারি অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনাদের সাহায্য নিয়ে একই উদ্দেশ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে। কাদের মোল্লা সজ্ঞানে এসব কাজে অংশ নিয়েছেন। যার ফলে নিরস্ত্র জনসাধারণ গণহত্যার শিকার হয়। মিরপুরের আলুবদি গ্রামে তিন শ থেকে সাড়ে তিন শ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যার সময় কাদের মোল্লা রাইফেল হাতে সেখানে উপস্থিত থেকে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। মিরপুর কালাপানি এলাকায় হযরত আলী, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের হত্যায় এবং হযরত আলীর ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণে কাদের মোল্লার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও নৈতিক সমর্থন ছিল। অন্যান্য ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী না থাকলেও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা কাদের মোল্লার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহ, যা মানুষের বিবেককে দংশন করে, সেসব অপরাধের গভীরতার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। আমরা সতর্কতার সঙ্গে অভিযুক্ত আসামির অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ধরন ও অপরাধের গভীরতা বিবেচনায় নিয়েছি। সুতরাং আমাদের রায় অবশ্যই অপরাধের গভীরতা ও আসামির ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।’ ট্রাইব্যুনাল এ কথা বলার পরও কাদের মোল্লাকে দুটি অপরাধে যাবজ্জীবন ও তিনটি অপরাধের দায়ে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেন।
রায়ে বলা হয়, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। একটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওই অভিযোগ থেকে তাঁকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচটির মধ্যে দুটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় (মিরপুরের আলুবদী গ্রামে গণহত্যা ও ধর্ষণ) তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর তিনটি অভিযোগ (এগুলোও হত্যাকাণ্ড) তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে রায়ে বলা হয়েছে, সব সাজা একসঙ্গে চলবে। অর্থাৎ ১৫ বছরের কারাদণ্ড যাবজ্জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। এ কারণে কাদের মোল্লাকে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রায়ে যে পাঁচটি অভিযোগ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৩(১), ৩(২)(এ)(এইচ) ধারায় এই অভিযোগ গঠন করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, আবদুল কাদের মোল্লার নির্দেশে একাত্তর সালের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে নওয়াবপুর এলাকা থেকে ধরে মিরপুর ১২ নম্বরে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে সেখানে ঈদগাহে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলানো হয়। এরপর কাদের মোল্লার নির্দেশে বিহারি আখতার গুণ্ডা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তাঁর লাশ আরো নিহত সাত ব্যক্তির লাশের সঙ্গে কালাপানি ঝিলে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী না থাকলে সাক্ষীদের বক্তব্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা প্রমাণ করে কাদের মোল্লা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
রায়ে আরো বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদের মোল্লা বাঙালি জাতির বিপক্ষে কাজ করেছেন। তিনি জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জামায়াত ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি। এ ছাড়া মিরপুরের বিহারি আখতার গুণ্ডা, হাক্কা গুণ্ডা, আব্বাস চেয়ারম্যান, হাসিব হাসমি, নেহালের মতো গুণ্ডাদের সক্রিয় ক্যাডার ছিলেন কাদের মোল্লা।
দুই. কাদের মোল্লার নির্দেশে ও তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ২৭ মার্চ কোনো এক সময় মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে মহিলা কবি মেহেরুন্নেসা এবং তাঁর বৃদ্ধা মা ও দুই ভাইকে জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যার পর তাঁর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। রায়ে বলা হয়েছে, এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে মিরপুরের বিহারিদের দ্বারা। আখতার গুণ্ডা, নেহাল, হাক্কা গুণ্ডা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। আর তাদের নেতৃত্বে ছিলেন কাদের মোল্লা। তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রমাণিত।
তিন. কাদের মোল্লার নির্দেশে সাংবাদিক-আইনজীবী খন্দকার আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে ধরে নিয়ে মিরপুর জল্লাদখানা পাম্প হাউসের পাশে হত্যা করা হয়। রায়ে বলা হয়, আবু তালেবকে জল্লাদখানায় নিয়ে হত্যা করা হয় এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ইত্তেফাকের তৎকালীন এই সাংবাদিককে মিরপুরের অবাঙালি আবদুল হালিম তাঁর গাড়িতে করে নিয়ে যায় বলে ওই গাড়ির চালক সাক্ষীদের জানান। এরপর আবু তালেব ফিরে আসেননি। আবদুল হালিম কাদের মোল্লার কাছে আবু তালেবকে হস্তান্তর করে বলেও সাক্ষীরা জানতে পারেন। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় এ অভিযোগেও কাদের মোল্লার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে।
চার. ৫০ জন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল কাদের মোল্লা মিরপুরের (পল্লবী) আলুবদি গ্রামে হামলা চালান। গ্রামটি ঘিরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বুসা মিয়া, জেরাত আলী, ফুয়াদ আলী, শুকুর মিয়া, আওয়াল মোল্লা, সোলে মোল্লা, রুস্তম আলী বেপারী, আজল হক, ফজল হক, রহমান বেপারী, নবী মোল্লা, আলমাত মিয়া, মোখলেসুর রহমান, ফুলচান, নওয়াব আলী, ইয়াছিন, লালু চান বেপারী, সুনু মিয়াসহ ৩৪৪ জনের বেশি লোককে হত্যা করা হয়। রায়ে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী এ ঘটনার বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দলিলপত্রেও এই ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। কাদের মোল্লা স্বশরীরে এখানে উপস্থিত ছিলেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
পাঁচ. একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় মিরপুরের কালাপানি এলাকার ৫ নম্বর লেনের ২১ নম্বর বাড়িতে ঢুকে কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সময় তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমেনা, দুই মেয়ে খাদিজা ও তাহমিনাকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া দুই বছরের শিশু বাবুকে আছড়িয়ে হত্যা করা হয়। এরপর হযরত আলীর ১১ বছরের মেয়েকে গণধর্ষণ করা হয়। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ২০(২) ধারা অনুযায়ী কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
এ অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী ছিলেন নিহত হযরত আলীর এক মেয়ে। তিনি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বর্ণনা দেন। সাক্ষী নিজেও নির্যাতনের শিকার বলে জানান। ঘটনাস্থলে কাদের মোল্লা উপস্থিত ছিলেন। হযরত আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে তিনি সশরীরে অংশ নেন।
যে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি
১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের গ্রাম খানবাড়ি ও শহীদনগরে (ঘাটারচর) কাদের মোল্লার নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গনি ও গোলাম মোস্তফাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আরো শতাধিক নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় বলে যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল, তা সাক্ষীদের বক্তব্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এ অভিযোগের পক্ষে তিনজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমেদ খান ১৯৬৯ সাল থেকে কাদের মোল্লাকে চেনেন বলে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের বিভিন্ন সভায় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা হিসেবে কাদের মোল্লাকে অংশ নিতে দেখেছেন। তবে তিনি নিজে কাদের মোল্লাকে ১৯৭১ সালে কোনো অপরাধ সংঘটনে দেখেননি। তিনি অন্যের কাছে খানবাড়ি ও ঘাটারচরের হত্যাকাণ্ডে কাদের মোল্লা অংশ নিয়েছিলেন- তা শুনেছেন। এ মামলার আরেক সাক্ষী নূরজাহান ১৯৭১ সালে ১৩ বছর বয়সের ছিলেন। তিনি নিজে ঘাটারচরে পাকিস্তানি সেনাদের গুলি করে মানুষ হত্যা করতে দেখেন। তাঁর স্বামী নবী হোসেনকেও তারা হত্যা করে। এ সময় কালোমতো লম্বা দাড়িওয়ালা একজন বাঙালিকেও রাইফেল দিয়ে গুলি করে মানুষ মারতে দেখেন নূরজাহান। তিনি তাঁর শশুরের কাছ থেকে জানতে পারেন, ওই বাঙালি লোকটি ছিলেন কাদের মোল্লা। এ মামলার অন্যতম সাক্ষী আবদুল মজিদ পালোয়ান একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। তিনি পাকিস্তানি সেনা সদস্য, কাদের মোল্লা ও বিহারিদের গুলি করে ঘাটারচরে মানুষ হত্যা করতে দেখেছেন। কাদের মোল্লার হাতে তিনি রাইফেল দেখেছেন।
আদালত উল্লিখিত সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনায় বলেন, সাক্ষী মজিদ পালোয়ান যিনি কাদের মোল্লাকে রাইফেল হাতে দেখেছেন তিনি সাক্ষ্যে বলেছেন, গুলির শব্দ শুনে তিনি ঘটনা দেখতে যান। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তখনকার অবস্থায় গোলাগুলি হলে মানুষ পালানোর পথ খুঁজবে। ঘটনা দেখতে ঘটনাস্থলে যাবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নূরজাহান বেগম তাঁর শশুর মজিদ পালোয়ানের কাছ থেকে শুনেছেন, যাঁর হাতে রাইফেল ছিল তিনি কাদের মোল্লা। রায়ে বলা হয়েছে, যেহেতু মজিদ পালোয়ানের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়, সেহেতু নূরজাহানের বক্তব্যও বিশ্বাস করার কারণ নেই। আরেকজন সাক্ষী তো ঘটনা দেখেননি। কাজেই এ অভিযোগের পক্ষে তিনিজন সাক্ষীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। এ কারণে এই অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়নি।