গতিহীন পিপিপি নিয়ে প্রতিবছর একই কথা

ppp

অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) পদ্ধতি কোনো কাজে দিচ্ছে না। সরকারের যেমন দোষ রয়েছে এতে, রয়েছে বেসরকারি খাতেরও সমস্যা। বেসরকারি খাত পিপিপিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না হীনস্বার্থের কারণে। আবার তাদের আকৃষ্ট করাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সরকারও ব্যর্থ।
গত ছয় বছরেও সরকার পিপিপি আইনই করতে পারেনি। আর বেসরকারি খাত চায় দ্রুত মুনাফা। স্বভাবগত কারণেই তারা দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার পথে যেতে চায় না। ফলে প্রতিবছরের বাজেটে পিপিপির জন্য যে বরাদ্দ থাকছে, তা খরচ হচ্ছে না। আর ছয় বছর ধরেই পিপিপি নিয়ে বাজেট বক্তব্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরনের কথা বলে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পিপিপি শুধু কাগজে-কলমেই থাকছে।
পিপিপি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের চুক্তি হয় বা সেবা তৈরির জন্য বেসরকারি খাতকে সরকার নিবন্ধন দিয়ে থাকে। নির্মাণ, মালিকানা, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওওটি); নির্মাণ, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওটি) এবং নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা (বিওও)—পিপিপির এ তিনটি পদ্ধতিই প্রচলিত।

বিপুল জনগোষ্ঠীর এ দেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; নদী, সমুদ্র ও বিমানবন্দর; সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল; সড়ক ও রেলপথ এবং বড় বড় সেতু নির্মাণ দরকার। সরকারের একার পক্ষে এগুলো করা কঠিন। প্রতিবছর ৩৯ হাজার কোটি টাকা হিসাবে পাঁচ বছরে ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা পিপিপি উদ্যোগ থেকে পাওয়া যাবে বলে ২০০৯ সালেই শুনিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। আগের মেয়াদে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছিল, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করতে অবকাঠামো খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যই পিপিপিকে ‘নব উদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’ নামে উপস্থাপন করে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে আপাতত অলাভজনক কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিপিপি প্রকল্পগুলোকে সহায়তার জন্যও বরাদ্দ রাখছে সরকার। সুযোগ রাখা হয়েছে প্রকল্পের কারিগরি সহায়তা বাবদ ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইনান্সিং (ভিজিএফ) থেকেও অর্থ ব্যয়ের। কিন্তু তাও গতিহীন পিপিপি।

ছয় বছর ধরে অর্থমন্ত্রী কী বলছেন: পিপিপি নিয়ে প্রতিবছরের বাজেট বক্তব্যেই কথা থাকে অর্থমন্ত্রীর। অর্থমন্ত্রী যা বলে আসছেন-

২০০৯-১০: ‘আগামী পাঁচ বছরে দরকার অতিরিক্ত ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। পিপিপি উদ্যোগে এ বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করা হবে।’

২০১০-১১: ‘ব্যক্তি খাতের সম্পৃক্ততায় ব্যাপক গতি পাবে পিপিপি। দেশি, বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-সহযোগীদের অংশগ্রহণে গঠিত একটি তহবিল ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো প্রকল্পের বিপুল অর্থায়নের চাহিদা মেটাবে।’

২০১১-১২: ‘পিপিপি আমাদের দেশের জন্য একটি নতুন ধারণা এবং অবকাঠামো খাতে পিপিপি চুক্তিগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে। সফলভাবে পিপিপি বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।’

২০১২-১৩: ‘আশানুরূপ না হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পিপিপি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। আমি আশা করি, অচিরেই এগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করা যাবে।’

২০১৩-১৪: ‘পিপিপি নিয়ে আমি প্রথম বাজেট বক্তব্যেই অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করি। দ্বিতীয় বছরে এ বিষয়ে নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়ন সম্ভব হয়। নতুন দপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই এ কার্যক্রম দেরিতে শুরু হয়েছে।’

২০১৪-১৫: ‘অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে উৎসাহিত করব।’

আলোর মুখ দেখেনি কোনো প্রকল্প: চলতি অর্থবছরে ছয়টি খাতে ৩৪টি পিপিপি প্রকল্পে ১ হাজার ১১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের (এক ডলার ৭৯ টাকা হিসাবে ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা) সম্ভাব্য ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে পরিবহন খাতেরই ১৬টি প্রকল্প। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ৩০টি পিপিপি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টিতে উপদেষ্টা নিয়োগ ও ৬টির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাস্তবে অর্থমন্ত্রীর কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি।

পিপিপি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে প্রকল্প সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৩টি। তবে এখন পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ৫০ কোটি ডলারের এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার হবে এর দৈর্ঘ্য। শুধু এই প্রকল্পটির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

কালিয়াকৈরে উচ্চ তথ্যপ্রযুক্তি (হাইটেক) পার্ক, জাতীয় কিডনি ডিজিজ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে দুটি হেমোডায়ালিসিস কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পও চুক্তির অপেক্ষায়। তবে অনেক দূর এগিয়ে এসেও কালিয়াকৈর তথ্যপ্রযুক্তি পার্কটি এখন জটিল আকার ধারণ করেছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সরকার চুক্তির জন্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না।

প্রবাসীরা ছোট প্রকল্পে আগ্রহী: বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ধরনের প্রকল্প চান প্রবাসীরা। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘২০১৫ সালের পরে বৈশ্বিক পিপিপি উদ্যোগ’ এক সেমিনারের আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। সেমিনারে গ্লোবাল এনআরবি ইউএসএর পক্ষ থেকে বলা হয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারকে ৮ শতাংশে উন্নীত করতে পিপিপি লাগবে। তবে পিপিপিকে উন্নয়নের প্রধান ধারায় নিয়ে আসতে শুধু বড় নয়, ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নেও নজর দিতে হবে। এর সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও (এনজিও) সম্পৃক্ত করা যায়।

গ্লোবাল এনআরবি ইউএসএর চেয়ারম্যান মাহবুবুল জোয়ারদার বলেন, পানি, বিমানবন্দর, মহাসড়ক, মেট্রোরেল, শিক্ষা, হাসপাতাল ও আবাসন খাতে বিনিয়োগে তাঁরা আগ্রহী। তিনি মনে করেন, যে দেশগুলো পিপিপিতে সফল হয়েছে, তারা যুগোপযোগী পিপিপি মডেল গ্রহণের মাধ্যমে তা করেছে। বাংলাদেশ এখনো আইনই তৈরি করতে পারেনি।

আটকে রয়েছে পিপিপি আইন: পিপিপি নীতিমালা ও কৌশল, ২০১০; পিপিপি কারিগরি সহায়তা অর্থায়ন নীতিমালা, ২০১২ (পিপিপিটিএএফ) এবং পিপিপিটিএএফ কর্মসূচি, ২০১২-এর আওতায়ও পিপিপি উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব।

তার পরও বেসরকারি খাতের আস্থা সুদৃঢ় করতে পিপিপি আইন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। তবে সংসদে এখনো পাস হয়নি। এই আইনে বেসরকারি খাতের অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, পিপিপি আইনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এতে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইনটি নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কমিটির একটি দল এ পর্যায়েও বিদেশ সফরের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

তবে পিপিপি আইনের জন্য কোনো উদ্যোগ আটকে থাকার কথা নয় বলে মনে করেন অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ। জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে তিনি জানান, খুব তাড়াতাড়িই পাস হবে পিপিপি আইন। আর এটি পাস হলে বেসরকারি খাত পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগে আগের চেয়ে বেশি এগিয়ে আসবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

গত বছরের জুনেই বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি আশা করছি যে, পিপিপি বিষয়ক আইন অবিলম্বে সংসদে উপস্থাপন করব।’