গরু আমদানিতে এবার রেকর্ড

এ বছরের নয় মাসে ভারত সীমান্তের ৩১টি করিডর দিয়ে ১৯ লাখ ৩০ হাজার গরু ও মহিষ বৈধ উপায়ে এসেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তর বলছে, অতীতে কখনো এত বিপুলসংখ্যক পশু আমদানি হয়নি।
সীমান্তের গ্রামগুলোর কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, আমদানি বেশি হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় এবার পশুর দামও কমে গেছে। কোরবানির পশুরহাটে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে একই সময় করিডর ব্যবহার না করে চোরাইপথেও পশু এসেছে। কিন্তু এর কোনো হিসাব বিজিবির কাছে নেই। বিজিবি বলেছে, চোরাইপথে গরু-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সীমান্তে প্রায়ই গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাদের হিসাবে শুধু এ বছরের নয় মাসেই সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ৩৮৪ জন বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁদের ২৪৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর ওই দেশের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যেসব গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, তার ৯০ শতাংশ ঘটনার পেছনেই থাকে গরু-বাণিজ্য। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে নতুন করে আরও ৫টি সীমান্ত হাট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব হাট চালু হলে ভারতীয় নাগরিকেরা তাঁদের গরু এ হাটে বিক্রি করতে পারবেন। এতে পাচার কমে যাবে।

চোরাইপথে গরু-মহিষ: যশোরের পুটখালী সীমান্তের গরু ব্যবসায়ী আবদুস সালাম জানান, ভারতের বিভিন্ন হাট থেকে সস্তায় কেনা গরু ভারতীয় মহাজন বা গরু ব্যবসায়ীরা সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের বিভিন্ন অংশে জড়ো করে বাংলাদেশের গরু ব্যবসায়ী বা মহাজনকে খবর দেন। সাধারণত বাংলাদেশের মহাজনেরা লোক পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপার থেকে গরু নিয়ে আসেন। এ জন্য রাখালি দিতে হয় গরুপ্রতি দেড় হাজার টাকা করে। একজন রাখাল সর্বোচ্চ ১০০টি গরু নিয়ে আসেন। সীমান্তের বেশির ভাগ স্থান কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। রাখালেরা প্রথমে বেড়া কেটে ফেলেন। পরে সেখান থেকে ছোট গরুর হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে কাঁটাতারের বেড়া বা গেটের ওপর দিয়ে পার করে দেন। পাহাড়ি এলাকায় ওপর থেকে গড়িয়ে দেওয়া হয় গরুগুলোকে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমানগর সীমান্তের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলম বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরু খোঁয়াড়ের মতো দেখতে একটি স্থানে জড়ো করা হয়। স্থানীয়ভাবে একে খাটাল বা বিট বলা হয়। এরপর শুল্ক কর্মকর্তারা প্রথা অনুসারে খাটালের গরুগুলোকে প্রথমে মালিকানাবিহীন অবস্থায় দেখিয়ে ‘বাজেয়াপ্ত’ ঘোষণা করেন। বাজেয়াপ্ত করার জন্য কাগজে-কলমে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতও বসে। আদালতের রায়ে ‘মালিকবিহীন বাজেয়াপ্ত’ গরু মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বাস্তবে গরু চোরাকারবারি কাছেই থাকেন, চোরকারবারির কাছ থেকেই গরু ব্যবসায়ী নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে গরু কেনেন। সরকারকে ৫০০ টাকা দেওয়ার বিনিময়ে চার দিন মেয়াদি গরুর মালিকানার রসিদ পান ব্যবসায়ীরা। রসিদের নম্বরটি গরুর গায়ে রং দিয়ে লিখে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন এলাকার সীমান্ত চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের বক্তব্য অনুসারে এসব আয়োজনের বিনিময়ে গরুপ্রতি বিজিবি ক্যাম্প ২০০ টাকা, থানা ২০০, ইউনিয়ন পরিষদ ৩০০ টাকা করে ভাগ পায়। এরপর রয়েছে সীমান্ত থেকে গরুর ট্রাক ঢাকায় আনার সময় পথে পথে চাঁদাবাজি।

চাঁদাবাজির ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ‘ব্যবসা নিয়ে কী হচ্ছে সেটা জানি না। কিন্তু পথে পথে চাঁদাবাজি হচ্ছে এটা ঠিক না। চাঁদাবাজির যে অভিযোগ করা হয়, সেটা পুরোনো।’

সীমান্তের ব্যবসায়ীরা জানান, গরু ব্যবসার সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন বিট বা খাটাল মালিকেরা। এদের রয়েছে শক্তিশালি সিন্ডিকেট। বিটের অনুমোদন দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ক্ষমতাসীন দলের সাংসদেরা এটা নিয়ন্ত্রণ করেন। মজার তথ্য হলো, গরুপ্রতি বিট মালিকেরা নির্ধারিত টাকা আদায় করলেও সরকার কোনো রাজস্ব পায় না।

সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক চোরাচালান প্রতিরোধ টাস্কফোর্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সীমান্তে সহিংস ঘটনা ঘটছে। এ জন্য বিটকে আইনের আওতায় আনার সুপারশি করেছে কমিটি।

আমদানি করা গরু-মহিষ: ব্যবসায়ীরা বলছেন, সীমান্তে প্রতিটি গরুর দাম গড়ে ১৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে আমদানি করা ১৯ লাখ ৩০ হাজার গরুর মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে ভারতে।

বিষয়টি স্বীকার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, বৈধপথে যত দিন গরু আমদানি করা সম্ভব না হবে, তত দিন গো-মাংসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

বিজিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে গরুর ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়া নিয়ে বারবার আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে ভারতের পক্ষে গরু রপ্তানির অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, গরু আসা বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এ কারণে বর্তমান ব্যবস্থায় গরু আনার অনুমতি দিয়েছে সরকার।

এনবিআর সূত্র জানায়, গরু আমদানির জন্য সীমান্তে ৩১টি করিডর স্থাপন করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি করিডর আছে রাজশাহী অঞ্চলে, ১২টি। যশোরে নয়, খুলনায় চার, সিলেট ও চট্টগ্রামে আছে তিনটি করে। এসব করিডর থেকেই অবৈধপথে আসা পশু বৈধ করা হয়। এনবিআরের হিসাবে, চলতি বছরের নয় মাসে আসা গরু থেকে ৯৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। এর আগের বছর পশু আমদানি করা হয় ১৪ লাখ ৪০ হাজার। এ থেকে ৭৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।

এনবিআর পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে ১২ লাখ ৪৯ হাজার গবাদিপশু এসেছে। এ থেকে ৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করা হয়। ওই বছরে ১১ লাখ ৪৫ হাজার গরু, এক লাখ মহিষ, তিন হাজার ২৫১টি ছাগল-দুম্বা এবং ৪২টি উট দেশে আসে। এ বছর সবচেয়ে বেশি পশু আসে যশোরের করিডরগুলো দিয়ে। সাতক্ষীরা সীমান্তের তিনটি ও যশোরের পুটখালী সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে আট-দশ হাজার গরু আসছে। সরকারি নিয়ম অনুসারে প্রতিটি গরু-মহিষের জন্য ৫০০ টাকা, দুম্বা বা ছাগলের জন্য ২০০ টাকা এবং উট, গাধা বা ঘোড়ার জন্য ছয় হাজার টাকা রাজস্ব দিতে হয়। তবে এ অর্থ আদায় করা হয় পশু বিক্রির মূল্য হিসাবে।