গ্রামীণ ব্যাংকে এমডি দিতে আদালতে লড়বে সরকার

বাদী-বিবাদী কোনো পক্ষই নয়, তবু শুধু গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে উচ্চ আদালতে সরাসরি পক্ষ নেবে সরকার। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে সার্চ কমিটির কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়ার জন্যই সরাসরি আদালতে লড়বে সরকার। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব (দায়িত্বপ্রাপ্ত) আবু সালেহ্ মো. শেখ জহিরুল হককে গতকাল মঙ্গলবার চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল ১০ আগস্ট স্বাক্ষরিত চিঠিতে গ্রামীণ ব্যাংকে এমডি নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশকে ‘অসৎ এবং অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করাই সরকারের লক্ষ্য বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ড. ইউনূসের ‘অবৈধভাবে’ কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলে তার ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি প্রস্তুত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ১৫ দিনের মধ্যে এর জবাব চেয়ে এ চিঠি শিগগিরই ইউনূসের কাছে পাঠানো হবে। একইভাবে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছেও। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব পাওয়া না গেলে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সত্য বলে সিদ্ধান্ত নেবে সংস্থাটি। পরে প্রথমে আপসে ও পরে আইনি ব্যবস্থায় অর্থ ফেরত পেতে চেষ্টা করবে এনবিআর।
চিঠিতে লেখা অর্থমন্ত্রীর তথ্যানুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ২৬ নভেম্বর হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নম্বর-১৫৫৮৮) দায়ের করেন গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা পরিচালক তাহসিনা খাতুন। মামলায় গ্রামীণ ব্যাংককে বিবাদী করা হয়েছে। এতে সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে বিবাদী করা হয়নি। রিটে বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ড. ইউনূসই তাহসিনা খাতুনকে দিয়ে মামলাটি করিয়েছেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সার্চ কমিটির কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন হাইকোর্ট। ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নতুন এমডি নিয়োগ দিতেই সরকার এ রিট মামলার বিপক্ষে সরাসরি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলকে পাঠানো চিঠিতে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘অধ্যাপক ড. ইউনূস অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে গ্রামীণ ব্যাংককে অচল করে দেওয়া যায়। তিনি চান না, আমরা কোনো নির্বাহী পরিচালক নিযুক্ত করি। সেই উদ্দেশ্যে তিনি সার্চ কমিটির কাজ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিয়েছেন। তিনি বিবাদী করেছেন গ্রামীণ ব্যাংককে, কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে এ সম্বন্ধে অন্ধকারে রেখেছেন। ২৬ নভেম্বর ২০১২ তারিখে তাঁর লোকজন রিট পিটিশনটি করে। তারপর আবার একটি শুনানিতে স্থগিতাদেশটির মেয়াদ বর্ধিত করা হয়েছে।’
‘আমরা চাই, সেখানে সরকার একটি পার্টি (পক্ষ) হিসেবে যোগ দেবে এবং এই অসৎ ও অযৌক্তিক স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করার জন্য আবেদন করবে’- মাহবুবে আলমকে বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, ‘এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে এবং তাঁর (আইনমন্ত্রী) উপদেশ হলো, মন্ত্রণালয় অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে পারে। এই স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করাই আমাদের লক্ষ্য।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার ড. ইউনূস ও তাঁর পক্ষ নেওয়া ঋণগ্রহীতা পরিচালকদের হটিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুর সমাপ্তি চায়। সে ক্ষেত্রে দুটি কাজ করবে সরকার। একটি হলো- হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া। অন্যটি হলো- ইউনূসের পক্ষ নেওয়া গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৯ ঋণগ্রহীতা পরিচালককে সরাতে চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে এ ধরনের পরিচালক বাছাই করা। গত সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ দুটি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।’
গত বছরের ১২ মে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে ড. ইউনূস অব্যাহতি নেওয়ার পর নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়ার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করতে গিয়ে দুই ভাগ হয়ে পড়েন সরকার নিযুক্ত ও ঋণগ্রহীতা পরিচালকরা। এ অবস্থায় সার্চ কমিটি গঠনে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকার নিয়োজিত চেয়ারম্যানকে একক ক্ষমতা দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল পাস করার দুই দিন পর ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নতুন এমডি নিয়োগে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি আবেদনকারীদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে তিনজনের একটি প্যানেল মনোনীত করে তা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জমা দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে এর মধ্য থেকে একজনকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেবে পরিচালনা পর্ষদ।
ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি প্রস্তুত রেখেছে এনবিআর
আইনবহির্ভূতভাবে কর অব্যাহতি সুবিধার অপব্যবহার এবং আয়কর রিটার্নে কেন আয়-ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য বর্ণনায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন, এর ব্যাখ্যা চেয়ে ড. ইউনূসকে দেওয়ার জন্য চিঠি প্রস্তুত করে রেখেছে এনবিআর। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংককে আলাদাভাবে চিঠি পাঠানো হবে। তাতে ড. ইউনূস এমডি পদে কর্মরত অবস্থায় পরিচালনা পর্ষদের অজ্ঞাতে বা পূূর্বানুমতি না নিয়ে কেন রাজস্ব-সংক্রান্ত অনিয়ম করেছেন এবং এর দায় কার ওপর বর্তাবে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। দুটি চিঠিই প্রস্তুত। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চিঠি দুটি পাঠানো হয়নি।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, আয়কর আইনের ৯৩ ধারা অনুযায়ী, এনবিআরের একজন ডেপুটি কমিশনার এ বিষয়ে অভিযুক্ত করদাতাকে কর ফাঁকির বিষয়ে চিঠি পাঠানোর আইনি ক্ষমতা রাখেন। তবে এ জাতীয় চিঠি পাঠানোর ক্ষেত্রে এনবিআর সাধারণত চেয়ারমানের স্বাক্ষর নেয় অথবা চেয়ারম্যানের নির্দেশে অন্য কেউ এ দায়িত্ব পালন করেন। চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন চট্টগ্রামে থাকায় চিঠিতে কে স্বাক্ষর করবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
আয়কর আইনজীবী নূরে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজস্ব আইনের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী, যেকোনো ব্যক্তি রাজস্ব-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে অবশ্যই তাঁর কাছে লেনেদেন-সংক্রান্ত পুরো বিষয়ের ব্যাখ্যা চায় এনবিআর। জবাব সন্তোষজনক না হলে এনবিআরের হিসাবে যে পাওনা দাবি করা হয়, তা পরিশোধে সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের পরও যদি কেউ পাওনা পরিশোধ না করেন তাহলে এনবিআর আবারও সময় বেঁধে দিতে অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে পারে। এর পরও করখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বকেয়া পরিশোধ না করলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালামাল বিক্রি করে এনবিআরের পাওনা বুঝে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও পাওনা পরিশোধ না হলে মালামাল বিক্রির সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন গতকাল চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, এমডি থাকাকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন পাবলিক সার্ভেন্ট (প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী) ছিলেন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হিসেবে বিদেশ থেকে সম্মানী, পুরস্কার ও রয়ালটি বাবদ মোট ১২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার কর অব্যাহতি নিয়েছেন। বিদেশ গমন ও কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন থাকার কথা থাকলেও তিনি তা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়ার এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন দেখার বিষয় ড. ইউনূস পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নিয়েছেন কি না, নিয়ে থাকলে আয় বৈধ, নয়তো অবৈধ। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’