গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূসকে পাঠানোর জন্য চিঠি প্রস্তুত

অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের কাছে পাঠানোর জন্য ঝটপট দুটি চিঠির খসড়া তৈরি করে ফেলেছে। তবে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চিঠি দুটি চূড়ান্ত করা হয়নি। এনবিআর চেয়ারম্যান এবং সরকারের ওপরমহলের সঙ্গে আলোচনা করেই তা চূড়ান্ত করা হবে। সূত্র জানায়, ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়ে যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যাতে বিলম্ব না হয় সে জন্য সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে এনবিআর।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এনবিআর ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (আইআরডি) তৈরি করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিবেদনে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে নিয়ম ভেঙে আয়কর অব্যাহতি নেওয়া, পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে অনুমোদন না নিয়ে বিদেশ সফর ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়।
সূত্র জানায়, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকে কর্মরত থাকার সময় তাঁর সব কাজে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সমর্থন ছিল বা পরিচালনা পর্ষদ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়নি- এমন অভিযোগ রয়েছে এনবিআরের। গত মঙ্গলবার এনবিআর চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। জানা গেছে, মন্ত্রিসভার বৈঠকেও এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তের পর গতকাল এনবিআর কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করে দুটি চিঠির খসড়া তৈরি করেন।
জানা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনূসকে চিঠির জবাব দিতে সর্বোচ্চ ১৫ কর্ম দিবস সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান এবং অর্থমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে এ সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন চিঠি শুধু গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া হবে কি না।
চিঠির খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের রিভলবিং ফান্ড থেকে ৩৪৭ কোটি ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৩ টাকা এবং একই ব্যাংকের সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড থেকে ৪৪ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ৬২৫ টাকা গ্রামীণকল্যাণ নামক সহযোগী প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে গ্রামীণকল্যাণ পুনরায় গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিলে ‘বোরোয়িং ফ্রম ব্যাংকস অ্যান্ড ফরেন ইনস্টিটিউশন’ খাতে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে ৩৮৭ কোটি ৫১ লাখ ৬২ হাজার ৯৬ টাকা ঋণ দেয়। এ দুটি আপত্তিকর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
খসড়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক কেবল ভূমিহীনদের ঋণ দিতে পারে। গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে তহবিল স্থানান্তর করে গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ১৯ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৬ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রামীণ কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তহবিল স্থানান্তরিত না হওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের যে সম্পদ বিদ্যমান ছিল, তার উৎস হিসেবে গ্রামীণ কল্যাণ থেকে ওই অর্থ পুনরায় একই দিনে ঋণ হিসেবে কাগজে-কলমে স্থানান্তর দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্পদের বিপরীতে তহবিল না থাকলে ‘অব্যাখায়িত আয়’ হিসেবে বিবেচনাযোগ্য অর্থের উপর প্রযোজ্য আয়কর গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আয়কর অব্যাহতি কর্তন এসআরও নং-৯৩-আইন/২০০০-এর শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে রাজস্ব বোর্ড মনে করছে। এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলে খসড়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তহবিল স্থানান্তর-সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ কল্যাণের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয় মে ১৯৯৭ সময়ে। অথচ তহবিল স্থানান্তর দেখানো হয়েছে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে অর্থাৎ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় পাঁচ মাস আগে। খসড়া চিঠিতে উল্লেখ আছে, এ বিষয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে হবে গ্রামীণ ব্যাংককে।
সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে আয়কর প্রদান থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, কিন্তু গ্রামীণ কল্যাণকে দেওয়া হয়নি। তাই তহবিল স্থানান্তর আইনবহির্ভূতভাবে হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারির পর গ্রামীণ ব্যাংকের ‘সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড’ থেকে তিন কোটি ৯৪ লাখ ১৩ হাজার ৬৫ টাকা গ্রামীণ কল্যাণে স্থানান্তর করা হয়। এ কার্যক্রম সঠিক ছিল না বিধায় প্রদত্ত তহবিল গ্রামীণ ব্যাংককে ফেরত প্রদানের জন্য দাতা সংস্থা নোরাড ১৯৯৮ সালের ২৬ মে গ্রামীণ ব্যাংককে চিঠি দেয়। গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ৪৯তম সভার (২৮ জুলাই ১৯৯৮ তারিখে অনুষ্ঠিত) কার্যবিবরণী অনুযায়ী নোরাডের পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃক এনডাওমেন্ট ফান্ড হিসেবে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখ পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে স্থানান্তরিত ৩৯১ কোটি ৭০ লাখ ১৪ হাজার ৪১৩ টাকা থেকে নোরাডের ৭৫ কোটি ৪৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩ টাকা গ্রামীণ ব্যাংকে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে এরও ব্যাখ্যা চাইবে এনবিআর।
খসড়া চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল ২০০০ জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসআরও নং-৯৩-আইন/২০০০ অনুসারে ১ জানুয়ারি ১৯৯৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০০০ সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের আয়ের ওপর আরোপণীয় আয়কর সুপার ট্যাক্স ও মুনাফার কর প্রদান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এই শর্তে যে সব লভ্যাংশসহ ওই করের অর্থ একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করে তাতে জমা করতে হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। শর্ত অনুযায়ী পুনর্বাসন তহবিল গঠিত হলেও ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত পাঁচ বছরের এসব তহবিল থেকে ব্যবহার হয়েছে মাত্র এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। ১৯৯৮ সালের বন্যার পরও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পুনর্বাসন তহবিলের ব্যবহার খুবই কম। এনবিআর মনে করছে, এ ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের আয়কর রিটার্নে অসত্য আয়কর বিবরণী দেওয়া হয়েছে। যা আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ১৬৫ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
গ্রামীণ ব্যাংকের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটির পরিচালনাকাজে আইন বহির্ভূতভাবে কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে বলে এনবিআরের চিঠিতে উল্লেখ আছে।
২২ মার্চ ২০০৬ সালের অনুষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৭৬তম সভায় ড. ইউনূসের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজস করপোরেশকে ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রদত্ত মূলধন ঋণ ও চলতি ঋণের সুদের হার ১০, ১২, ১৬-এর পরিবর্তে ৫ শতাংশ পুনর্নির্ধারণ করে হিসাব নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় গ্রামীণ ব্যাংকের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
খসড়া চিঠিতে উল্লেখ আছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকটির পরিচালনায় একচ্ছত্র স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতিফলনে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত আইন কানুন অনুসরণ করা হয়নি। গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে কেন কোনো প্রশ্ন করেনি- তার সন্তোষজনক জবাব দিতে হবে।
ড. ইউনূসের কাছে যে চিঠি পাঠানো হবে, তার খসড়ায় আইন বহির্ভূতভাবে কর অব্যাহতি, বিদেশ থেকে ওয়েজ আর্নার্স সুবিধায় আনা অর্থ এবং সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইন ভঙ্গ করার বিষয়ে জানতে চাওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।