ঘন কালো মেঘ তাঁর পেছনে…মহসীন হাবিব

সংবাদটি দেশের অনেকের চোখে পড়েছে। সংবাদের বিষয় নিয়ে বেশ মুখরোচক আলোচনা করতেও শোনা গেছে। আলোচকদের চোখে-মুখে রসের ভাব, এক ধরনের কাল্পনিক সুখানুভূতি। ভীষণ কিউরিসিটি নিয়ে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা এক তরুণ বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ তুলে জানতে চাইল, ভাই, নেদারল্যান্ডসে নাকি কয়েকটি জেলখানা বন্ধ হয়ে গেছে? বিষয় কী? বললাম, ‘হ্যাঁ।’ বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ নিজের ঘটের তথ্যটুকু অন্যের কানে না ঢেলে দেওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পায় না। আমিও তো তাদেরই একজন। তাই বলতে থাকলাম, “নেদারল্যান্ডস সরকার আটটি কারাগার বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ কারাগারে থাকার মতো ‘যোগ্য’ লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সে দেশের কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ১৪ হাজার। কিন্তু বর্তমানে মোট বন্দির সংখ্যা ১২ হাজার। ডাচ বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে বন্দির সংখ্যা কমবে বৈ বাড়বে না। সুতরাং ওগুলো রেখে লাভ নেই। জানা গেছে, ওই কারাগারগুলোর একটিকে একই অবকাঠামো ঠিক রেখে অভ্যন্তরীণ ডিজাইন পাল্টে বিলাসী হোটেলে রূপান্তর করা হয়েছে। ও রকম কারাগার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। চারদিক কাচের মতো পরিষ্কার, নিয়মিত স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবার বিতরণ, জিমনেসিয়াম, গ্রন্থাগার, এমনকি কম্পিউটারের ব্যবস্থাও কোথাও কোথাও আছে। যেমন নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষকে হত্যাকারী ব্রেইভিককে কম্পিউটার দেওয়া হয়েছে, চাহিদামতো পর্যাপ্ত বই, ফিল্ম দেওয়া হয়েছে।” একটু থেমে ফিসফিস করে বললাম, ‘তার পরও সেখানে অপরাধের মাত্রা কমছে। অমন জেলখানা এ দেশে থাকলে স্কুলশিক্ষকরা নির্দোষ কারো মাথায় আঘাত করে স্ত্রীকে গিয়ে বলতেন, বউ, একজনের মাথা ফাটিয়ে এসেছি। আর জেলখানায় না পাঠিয়ে পারবে না ইনশাআল্লাহ।’ এবার পাশেই বসে থাকা তরুণের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার চোখে কী এক কল্পনা। অন্তরীণ মানুষের চোখে মুক্তির যে কল্পনা থাকে, ছেলেটির চোখে সেই কল্পনার পরিষ্কার ছাপ। মনে হলো, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এক বিশাল কারাগার থেকে সে মুক্তি চায়। কিন্তু পথ হাতড়ে পাচ্ছে না।
কী তার যন্ত্রণা, কেন সে মুক্তি চায়? বাংলাদেশের একটি জেলখানায়ও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ছয় হাজার বন্দি ধারণক্ষমতার জেলখানায় বাস করে ১৫ হাজার বন্দি । অস্বাস্থ্যকর, পয়োনিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থাহীন একটি নরক যেন। বিচারাধীন থাকলেই শাস্তির চেয়ে অধিক হয়ে যায়। তার পরও রকেটের গতিতে বাড়ছে অপরাধ, অপরাধপ্রবণতা। একজন আইনজীবী সেদিন বলছিলেন, কারাগারে স্থানের অভাবের বিবেচনায় নাকি বিচারকরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থাৎ কারাগারে স্থানসংকুলানের বিষয়টি তাঁদের মাথায় রাখতে হচ্ছে। শুনতে ভালো না লাগলেও সত্যি, বাংলাদেশে এখন অপরাধীর সংখ্যা এত যে সঠিকভাবে ধরা হলে কয়েক শ স্টেডিয়াম ভরে যাবে। জেলখানার বাইরে দেখতে হবে জনবিরল।
অন্যায়-অত্যাচার এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যেন অনলে পুড়ছে দেশ। ঘরের ভেতরে ঢুকে মানুষ হত্যা করে অপরাধীরা সটকে পড়ছে। যাঁরাই দেশ শাসনের দায়িত্ব নিচ্ছেন তাঁরাই দলের লোক নামক পাগলা কুকুর ছেড়ে দিচ্ছেন সাধারণ নিরীহ ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করা সেই জনসাধারণের মধ্যে। গণতন্ত্রের লাঠি হাতে নিয়ে দেশ পুড়িয়ে ছারখার করছে একদল লোক, যাদের পেশা রাজনীতি, আয় রাজনীতি। ৫৫ হাজার বর্গমাইলে আবদ্ধ জনপদে যেন ‘ঘন কালো মেঘ তার পেছনে/চারিদিকে বিদ্যুৎ চমকে/অঙ্গ ঘিরে ঘিরে তাঁর অগি্নর আবেষ্টন- যেন শিবের ক্রোধানলদীপ্তি! তোর মন্ত্রবাণী ধরি কালীনাগিনীমূর্তি গর্জিছে বিষনিঃশ্বাসে/কলুষিত করে তাঁর পুণ্যশিখা।’
এ পরিস্থিতির মধ্যেই ব্যবহারে ব্যবহারে মরচে পড়া কিছু শব্দ টিকে আছে দেশপ্রেম, জনসেবা, জনদরদ নামে। এসব শব্দ ব্যবহার করেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি নামের একই বৃন্তে দুটি চরিত্র সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে যাচ্ছে।
যাঁরা আশার কথা শুনিয়ে বলেন, ‘ওরে বাছা, এখনই অধির হলি যদি/শেষে তোর কী হবে দশা’, তাঁরা হয় ভণ্ডামি করেন, অথবা সান্ত্বনা দেন। অথবা ওই দলগুলোর দালালি করেন। বুঝে অথবা না বুঝে তাঁরা শান্তির নামে বাস্তিল দুর্গ নিরাপদ ও রক্ষা করে চলেছেন।
একটি সত্যি কথা না বলে চুপ থাকা যায় না। দেশে বেশির ভাগ মানুষ যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পক্ষে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। শাসকদল সে কথা মানতে নারাজ। কিন্তু তারও পেছনে আরেকটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। কী হবে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে? কেউ কি এক ফোঁটা নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত মানের সামান্য উন্নতি হবে? শুধু পুরনো মদ নতুন বোতলে পাওয়া ছাড়া! গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে দুঃশাসনের হাত থেকে এ জাতির মুক্তি নেই। বিএনপি ধারণা করছে, ক্ষমতায় যাওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। তাদের চোখ-মুখের রং পাল্টে গেছে। শুধু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটা পুনর্বহাল করলে আর পায় কে! আওয়ামী লীগের ধারণা, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আপস না করে এ ব্যবস্থার অধীনেই যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে তাহলে তাদের রাজনৈতিক জয় (এই জয় নবাগত উত্তরাধিকার জয় নয়, এ জয়ের ইংরেজি প্রতিশব্দ উইন) হবে। সেই রাজনৈতিক জয়ের ধাক্কায় আবার পাস করে যাবে। কিন্তু বিশ্বাস করতে কোনোই দোষ নেই যে নির্বাচন যে ব্যবস্থায় হোক আর সরকারের জাহাজে যারাই চড়ুক, সাধারণ নিরীহ, রাজনীতির বাইরে থেকে পেটের ভাত জোগাড় করে খাওয়া মানুষদের তাতে কোনো লাভ নেই, লোকসান ছাড়া।
বহুবার ভেবেছি, দেশের এই সার্বিক দুর্দশার জন্য দায়ী শাসকগোষ্ঠী, নাকি শাসিতরা! কারণ রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে এই জনগণই তো দৌড়ে গিয়ে হাসিমুখে ভোট দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করে। পরে ভেবে পেয়েছি, প্রতিবারই ভুয়া আদমব্যাপারির হাতে অথবা ভুয়া বিয়ে রেজিস্ট্রির ফাঁদে পড়ার মতো তারা প্রতারিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের রাজনীতিবিদরা সাঈদীর মুখ চাঁদে দেখার চেয়েও বানোয়াট-অসত্য কথা বলে বেড়ান। দলীয় বিবেচনা ও দুর্নীতি-অনিয়ম দেশের জেলখানা ভরে ওঠার জন্য দায়ী। এ দেশের মানুষের দুর্ভাগ্য, কোনো দলই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম ইচ্ছা পোষণ করে না। কারণ আইন ভেঙে বের হওয়ার প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি রাজনীতিবিদদের। যে ইউরোপ মাত্র ৬০ বছর আগে লাখো-কোটি নারী, শিশু, বৃদ্ধকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে, সেই ইউরোপে এখন একজন আরেকজনের দিকে চোখ তুলে তাকায় না। সব মানুষ ভদ্রতার চর্চা করে করে সত্যিই ভদ্রলোক হয়ে উঠেছে। এর প্রধান কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার বিস্তার। লক্ষ করলে দেখবেন, বাংলাদেশে এ দুটো বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী বাস্তবে সবচেয়ে উদাসীন। মুখে তারা যাই বলুক। শিক্ষকের উদাহরণ যখন দিয়েছি, তখন তাঁদের কথাতেই যাই। সরকার কোটি কোটি টাকার খয়রাতি সাহায্য দেয়। কাবিখা, টেস্ট রিলিফের পেছনে ব্যয় করে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু শিক্ষকদের উচ্চ বেতন দিতে নারাজ। খয়রাতি সাহায্য, কাবিখা, টেস্ট রিলিফের পেছনে থাকে সরাসরি নগদ স্বার্থ। কিন্তু রাস্তায় পুলিশ শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি দমন করে পিঠের চামড়া তুলে। এ দেশকে সভ্য করতে হলে উভয় দলের ফ্যাসিস্ট মানসিকতা ভাঙতে হবে। বাস্তিল দুর্গ ভাঙতে হবে। মহাত্মা কবীর বলেছেন, খেত খায় গদহা, মার খায় জুনহা। আসুন, আমরা আর মার না খেয়ে অন্তত রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা পাল্টে দিতে বাধ্য করি।
লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com