ঘরের শত্রুই বড় শত্রু?…বিশ্বজিৎ চৌধুরী

গত মাসের শেষ দিকে চট্টগ্রামের প্যারেড কর্নার এলাকায় জনসভার আয়োজন করেছিল চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। টানটান উত্তেজনা ছিল এ সমাবেশ নিয়ে। কেননা, জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মসূচি ঘোষণা করলে জামায়াতও একই স্থানে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। পরে জামায়াত তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছে বটে, সাধারণ মানুষের মন থেকে উৎকণ্ঠা দূর হয়নি। সাংবাদিক যাঁরা এ সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়েছিল দুটি বিষয়ে। এক. জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা সমাবেশ পণ্ড করতে চোরাগোপ্তা হামলা চালান কি না, দুই. নিজেদের অন্তঃকোন্দলে সৃষ্ট কোনো সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা আওয়ামী লীগ জামায়াতের ওপর চাপায় কি না। শেষ পর্যন্ত দুই আশঙ্কার কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। সমাবেশে প্রচুর জনসমাগম স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীদের উদ্দীপ্ত করেছে।
নিজেরা যে ঐক্যবদ্ধ—এ ঘোষণা নেতারা বারবার সমাবেশ থেকে দিয়েছেন, তাতে অন্তত নবীন কর্মীরা আশ্বস্ত হয়েছেন। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম বিএসসি তিক্ততা ভুলে হাসিমুখে কথা বলছেন, এমন একটি দৃশ্য আশাবাদীও করে তোলে তাঁদের। কিন্তু সে আশাবাদ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারল না। ১৪ সেপ্টেম্বর মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেননি চট্টগ্রাম নগর আসন থেকে নির্বাচিত চারজন সাংসদের কেউই। তাঁদের একজন মঈন উদ্দীন খান বাদল অবশ্য আওয়ামী লীগের নন, তিনি জাসদের, মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের বাকি তিন সাংসদ এ সভায় যোগ না দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে এ সভা যেখানে আয়োজন করা হয়েছে, তা দলের প্রার্থী বাছাইয়ের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ কি না।
বোঝা যাচ্ছে, প্রার্থী বাছাইয়ের মতো একটি বিষয়ে নগরের নেতা-কর্মীদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজন পছন্দ হয়নি গতবারের নির্বাচিত সাংসদদের। তাঁদের ধারণা, এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবেই সিদ্ধান্ত হবে। এমনকি সাংসদ ও মন্ত্রী আফছারুল আমীন পত্রিকান্তরে বলেছেন, এ বিষয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনার কিছু নেই। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে নগর আওয়ামী লীগের এ সভা এক দিক থেকে বিবেচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আমাদের। এতে বিভিন্ন আসনে যাঁরা মনোনয়ন পেতে আগ্রহী, তাঁরা খোলাখুলিভাবে তাঁদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বর্তমান সাংসদেরা এ সভায় উপস্থিত থাকলে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মনোভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারতেন।
এ সভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা। এর আগে আগামী মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তখন অনেকেরই ধারণা হয়েছিল, এই ঘোষণার মধ্যে আছে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হবেন না জানিয়ে সংশয় নিরসন করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘অনেকে ভয় পাচ্ছেন, আমি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হব। ভয়ের কোনো কারণ নেই। মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রার্থিতার প্রয়োজন নেই, জনগণের ভালোবাসা নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চাই।’ কিন্তু সংশয় কি আদৌ নিরসন হয়েছে? পতেঙ্গা আসনের বর্তমান সাংসদ এম এ লতিফ পত্রিকান্তরে বলেছেন, ‘তিনি (মহিউদ্দিন) অনেক প্রবীণ নেতা। কখন কী মন্তব্য করে তিনি কিসের ইঙ্গিত দেন, তা বুঝতে হলে আমাদেরও প্রবীণ হতে হবে।’ অর্থাৎ যে ঐক্যের কথা নেতাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে বারবার, আগামী নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নকে ঘিরে সেটা দুলছে অবিশ্বাস-সন্দেহের দোলাচলে।
এদিকে চট্টগ্রামে বিএনপির সংকট আরও তীব্র। নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেনের মতবিরোধ দীর্ঘদিন চাপা থাকলেও ছাত্রদলের নগর কমিটি ঘোষণার পর থেকে তা প্রকাশ্যে এসেছে। নগর ছাত্রদলের কমিটিতে যাঁরা স্থান পেয়েছেন, তাঁরা সবাই শাহাদাতের অনুসারী বলে দাবি করে পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ মিছিল, দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, এমনকি শাহাদাতের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত করেছেন।
বিরোধের কারণে এবার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্মদিনে কোনো অনুষ্ঠান করা থেকে বিরত ছিল নগর কমিটি। এর কিছুদিন পর শহীদ মিনারে যুবদলের বিরাট এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এ সমাবেশ কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে তো পারেইনি, বরং বিরোধের নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। এই দিন সমাবেশ শেষে যুবদলের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সব কটি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ ওয়ার্ড কমিটিগুলো যুবদলের বর্তমান কমিটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ বলে দাবি করে তাদের সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকার করে।
বিএনপির বিরোধ শুধু নগর কমিটিতে নয়, বরং উত্তর ও দক্ষিণ জেলাসহ থানা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে চাঙা করার জন্য দেশের প্রতিটি জেলা ইউনিটে কর্মিসভা করার উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় কমিটি। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করা হয়েছিল এ লক্ষ্যে। কিন্তু কেন্দ্রীয় এ কর্মসূচি ঘিরে চট্টগ্রামে বিএনপির তিনটি ইউনিটের মধ্যেই কোন্দল তীব্র হয়ে ওঠে। ছাত্রদল নিয়ে বিরোধের কারণে নগর কমিটির কর্মিসভা হতে পারেনি। উত্তর জেলার কর্মিসভায় শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে বাগিবতণ্ডা শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের কর্মীদের সংঘাত-সংঘর্ষে গিয়ে পৌঁছেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে দক্ষিণ জেলা বিএনপি কর্মিসভা না করে নির্বাহী কমিটির সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি সেখানেও। যুবদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পণ্ড হয়ে যায় নির্বাহী কমিটির সভা। দলের এ ভজকট অবস্থার মধ্যেও নেতারা কিন্তু সংবাদমাধ্যমের সামনে ‘বড় দলে এ রকম হয়েই থাকে, আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি’ ধরনের বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছেন। তাঁদের এ বক্তব্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে কিন্তু বিশেষ অসুবিধা নেই কারোরই। সমস্যাটি আসলে তৈরি হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে। এতে দলের মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতা থেকেই আসলে যাবতীয় বিরোধ ও মেরুকরণের সূত্রপাত। মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের এ বিরোধ ও মেরুকরণ থেকেই সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক পর্যন্ত।
দেখা যাচ্ছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের বিএনপির নেতারা রাজপথে উপস্থিত থেকে নিজেদের আপসহীন সংগ্রামী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন যুগপৎ কর্মী-সমর্থক ও হাইকমান্ডের কাছে, ঠিক একইভাবে আওয়ামী লীগের নেতারাও সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার জন্য রাজপথে রয়েছেন। কিন্তু উভয় দলের নেতাদের মূল সমস্যাটি আসলে ঘরে। ঘর সামলাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন তাঁরা। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে আগামী নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে গিয়ে একই আসনের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতার মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব। কর্মী-সমর্থকেরাও জড়িয়ে পড়ছেন সেই দ্বন্দ্বে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, পথের শত্রু তো মোকাবিলা করা যায়, ঘরের শত্রু মোকাবিলা হবে কী করে?
নির্বাচন হবে কি না, হলে কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠা তো আছেই। অনেকেরই ধারণা, শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো ফর্মুলায় মতৈক্যে পৌঁছাবে বড় দুটি দল। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে, ঘরের এ বিরোধ ততই বাড়তে থাকবে। বড় দল দুটি সেই বিরোধ কী করে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com