ঘুষ দিলেই চাকরি!

অরুণ কর্মকার

খাদ্য অধিদপ্তরে ১০টি শ্রেণীর (ক্যাটাগরি) এক হাজার ৫৫৩টি পদে লোক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখন মৌখিক পরীক্ষা চলছে। এতে চাকরি নিশ্চিত করার মতো নম্বর পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সূত্রগুলো জানায়, যাঁরা ঘুষ দিয়েছেন বা দেবেন, তাঁদের চাকরি নিশ্চিত। খাদ্য পরিদর্শক পদে ঘুষের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত হলে আট লাখ।
৩২৮টি পরিদর্শক পদে প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। যাঁরা নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ দিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে পরীক্ষা শুরুর আগে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের নামের তালিকা পৌঁছে গেছে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে।
মহাপরিচালক সেই তালিকা পাঠিয়েছেন মৌখিক পরীক্ষার জন্য গঠিত পাঁচটি বোর্ডের পাঁচ প্রধানের কাছে। নির্দেশনা হচ্ছে, তালিকায় যাঁদের নাম আছে, তাঁদের প্রত্যেককে ৩০-এর মধ্যে কমপক্ষে ২৫ নম্বর দিতে হবে। আর যাঁরা তালিকাভুক্ত নন, তাঁদের প্রত্যেকে পাবেন সর্বোচ্চ ১০।
এই নিয়োগের জন্য মৌখিক পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ২০ নম্বর। কিন্তু ২০ নম্বর বণ্টনের মাধ্যমে কারসাজি করে ঘুষ দেওয়া প্রার্থীদের জন্য চাকরি নিশ্চিত করতে সমস্যা হতে পারে বিবেচনা করে খাদ্য মন্ত্রণালয় তা ৩০ করার জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেয়। এখন ৩০ নম্বরের মধ্যে পরীক্ষা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত রোববার থেকে শুরু হয়েছে উপখাদ্য পরিদর্শকের ১৭৫টি পদের জন্য মৌখিক পরীক্ষা। এই পদে ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে আট লাখ। মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত হলে ছয় লাখ। এই পদের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা শুরুর আগে মন্ত্রণালয় থেকে ডিজির কাছে তালিকা এসেছে। তিনি তা আগের মতোই পাঁচ বোর্ডের প্রধানদের কাছে পাঠাচ্ছেন এবং নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নম্বর দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক গত সোমবার সচিবালয়ে তাঁর অফিস কক্ষে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তালিকা নয়। তবে তদবির তো কিছু থাকতেই পারে। আবার সব তদবিরেই চাকরি হবে, এমনও না। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকার নেতা-কর্মীরা এসে কিছু দাবিদাওয়া বা তদবির করেন। সেগুলোর কিছু তো রাখতেই হয়।’
মন্ত্রী এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনাদেরও (সাংবাদিকদের) তো তদবির আছে। সবারই কিছু তদবির থাকে।’
অবশ্য খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাঁরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাঁরা সরকারি দলের হিসেবে হননি। হয়েছেন ঘুষ দিয়ে। আর তালিকার মধ্যে যাঁদের সরকারি দলের পরিচয় আছে, তাঁদেরও প্রায় সবাইকে টাকা দিতে হয়েছে। আর কোনো কোনো সাংবাদিকের তদবিরে যাঁরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাঁদেরও টাকা দিতে হয়েছে।
জানতে চাইলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহমদ হোসেন খান বলেন, অর্ধেক প্রার্থীর চাকরি তদবির ছাড়াই হবে। কারণ, কোনো কোনো জেলার প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তদবির বেশি থাকলেও অনেক জেলার ক্ষেত্রে তদবির নেই। তা ছাড়া এতিম ও প্রতিবন্ধী কোটায় ১০ শতাংশের তো তদবির ছাড়াই চাকরি হবে।
মন্ত্রণালয় থেকে আসা তালিকার ওপর নিজ হাতে একেকটি বোর্ডের প্রধানের নাম লিখে তা পাঠানোর বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘এগুলো মনে থাকার জন্য। তদবির এল এবং যেগুলোর চাকরি নিশ্চিত করতে হবে, সেগুলো যাতে সংশ্লিষ্ট সবার মনে থাকে, সে জন্য লিখে দেওয়া।’ কোনো কোনো সাংবাদিকের তদবিরের বিষয়টি তিনিও উল্লেখ করেন।
মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ২০ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে সোমবার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষায় যতজনের চাকরি হবে, প্রায় ততজনেরই নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। যেমন গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিদর্শক পদে প্রায় আড়াই হাজার পরীক্ষা দিয়েছেন। চাকরি হবে ৩২৮ জনের। তালিকায় নাম আছে প্রায় ৩০০ জনের। অর্থাৎ যাঁরা তালিকাভুক্ত নন, তাঁদের চাকরির সম্ভাবনা কম।
মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডগুলোতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকমিশনেরও (পিএসসি) প্রতিনিধি থাকেন। তাঁরা বিষয়টি কীভাবে নেন, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রথমত শুরুতেই তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়, এখন যে জেলার প্রার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হবে, সেই জেলার দুজন প্রার্থীর জন্য তদবির রাখতে হবে, তাঁদের তালিকা এই। হয়তো ওই জেলার ২০ জন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বোর্ডের সদস্যরা ভাবেন, ২০ জনের মধ্যে দুজনের জন্য তো তদবির থাকতেই পারে। তাঁরা বিষয়টিকে সেভাবেই নেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না যে, ওই জেলা থেকে চাকরিই পাবেন দুই বা তিনজন। দ্বিতীয়ত তাঁদেরও কিছু তদবির থাকে, যেগুলো মেনে নেওয়া হয়।
১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে সহকারী উপপরিদর্শকের ৪০৫টি পদের জন্য মৌখিক পরীক্ষা। এই পদের জন্য ঘুষ নির্ধারিত হয়েছে ছয় লাখ টাকা। কোটাভুক্ত হলে দিতে হবে পাঁচ লাখ টাকা। ৩০ সেপ্টেম্বর মৌখিক পরীক্ষা শেষ হবে।
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, চাকরি দেওয়া কিংবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তদবির, ঘুষ প্রভৃতি আগেও ছিল। মোট পদের সর্বোচ্চ ২০-২৫ শতাংশ এভাবে চাকরি পেত। কিন্তু বর্তমানে, বিশেষ করে খাদ্য অধিদপ্তরের এই নিয়োগের ক্ষেত্রে খুব কম পদেও ঘুষ ছাড়া চাকরি হবে। কাজেই এটা তদবির নয়। এটাকে দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে ১০টি শ্রেণীর পদে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে, তার মধ্যে উল্লিখিত তিনটি ছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক পদে ১৩ জন; হিসাবরক্ষক ১৫ জন; ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পাঁচজন; উচ্চমান সহকারী ৫১ জন; নিম্নমান সহকারী ৫০৩ জন; নিরীক্ষক ১৬ জন ও সহকারী অপারেটর পদে ৪১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে।
গত কয়েক দিনে খাদ্য অধিদপ্তরে মৌখিক পরীক্ষা দিতে আসা ২২ জন প্রার্থীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের মধ্যে রংপুরের একজন, বরিশালের একজন ও ময়মনসিংহের দুজন পাওয়া গেছে, যাঁরা ঘুষ দিয়েছেন। পরে তালিকা সংগ্রহ করে দেখা গেছে, তাঁদের নাম তালিকায় আছে।
অন্য প্রার্থীদের কয়েকজন বলেছেন, তাঁরাও ঘুষ দিতে রাজি। কিন্তু কোথায় কীভাবে কাকে দিলে কাজ হবে, তা তাঁরা জানেন না। কয়েকজন বলেছেন, তাঁরা লিখিত পরীক্ষা খুবই ভালো দিয়েছেন। আশা করছেন, মেধার জোরেই তাঁরা চাকরি পাবেন। ঘুষ দিয়ে কিছু লোক সব সময়ই চাকরি পান। কিন্তু কিছু লোক মেধার জোরেও পান। তাঁরা সেই আশায়ই আছেন।
মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডগুলোর কয়েকজন সদস্য বলেন, অনেক মেধাবী ও চৌকস প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের বিপরীতে তালিকাভুক্ত প্রার্থী আছেন। তাই মেধাবীর চাকরি কীভাবে হবে!
খাদ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণীর এই পদগুলোতে নিয়োগ-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। সর্বশেষ দুটি পদে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ২৫ মে। লিখিত পরীক্ষার ফলাফল অল্প দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত করা হলেও মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা এত দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়। একবার নিয়োগ-প্রক্রিয়া বাতিলেরও পথ খোঁজা হয়েছিল।
কিন্তু বাতিল করার দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি না হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষা ‘বিকেন্দ্রীকরণ করার’ কৌশল নেওয়া হয়। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু কমিশনাররা তাতে রাজি হননি। কারণ, সরকারি চাকরির নিয়োগবিধিতে এমন বিধান নেই। নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় এমন পদক্ষেপ নেওয়ার নজিরও বিরল।