ঘুষ দুর্নীতি সেই তিমিরেই রাজউক

রাশেদ মেহেদী
বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আর পাঁচ বছর ধরেই রাজউক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ফাইল বিভিন্ন সরকারি দফতরের টেবিলে। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। উল্টো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চালু হওয়া ওয়ান স্টপ সেন্টার বন্ধ করে দিয়ে রাজউককে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সেই পুরনো তিমিরে। ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি, টেন্ডারবাজি কোনো কিছু থেকেই মুক্ত হয়নি রাজউক। সরকারের শেষ বছরে এসে টেন্ডারবাজিতে নাম ওঠে খোদ প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়েরও। সর্বশেষ রাজউকে ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি পূর্বাচলসহ অন্যান্য একাধিক প্রকল্পে প্লটের আকার ও সেক্টর পরিবর্তন। একই সঙ্গে পূর্বাচল প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অ্যাওয়ার্ড জালিয়াতি করে রাজউক ও জেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি জালিয়াত চক্র প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ড্যাপকে কেন্দ্র করেও রাজউকের একটি চক্র নকশা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সেই পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজউকই রেখে যাচ্ছে মহাজোট সরকার।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, আগের চেয়ে রাজউকে অনিয়ম কমেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা দুষ্টচক্রের কবল থেকে রাজউক পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। তিনি বলেন, প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়েছে, তখন অদূর ভবিষ্যতে রাজউক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সফল হবে এবং এটি সত্যিকারের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। অন্যদিকে নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবীব সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকার কারণেই রাজউক পুনর্গঠন
ও ড্যাপ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ড্যাপ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করতেই ভূমিদস্যুদের চাপে সাত মন্ত্রীকে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় রিভিউ কমিটি করা হয় এবং এ কমিটি ড্যাপ বাস্তবায়ন বন্ধ করে দেয়, যার প্রমাণ গত তিন বছরে কমিটির মাত্র দুটি বৈঠক হয়েছে। আর রাজউক পুনর্গঠনের ফাইল তিন বছরে অনুমোদনের জন্য আমলাদের টেবিলে ঘোরার বিষয়টিও প্রমাণ করে, এ কাজে সরকারের সদিচ্ছা ছিল না।
রাজধানীর সবুজবাগের আহম্মদবাগ জায়গাটি ড্যাপে বন্যাপ্লাবিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জায়গায় ভবন নির্মাণের জন্য নকশা চেয়ে আবেদন আসে রাজউকে। রাজউকের ড্যাপ শাখার সহকারী পরিচালক জায়গাটি ড্যাপে বন্যাপ্লাবিত অঞ্চল উল্লেখ করে নথি পাঠান নগর পরিকল্পনা বিভাগে। কয়েক মাস যায়। নগর পরিকল্পনা বিভাগ থেকে একটি প্রতিবেদন আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ড্যাপে জায়গাটি ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল নয়। নকশা অনুমোদন হয়ে যায় অনেকটা গোপনেই। পরে চলতি বছরের শুরুর দিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়লে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ড্যাপ হওয়ার পর এভাবেই ‘ড্যাপ-বাণিজ্য’ ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়। বিশেষ করে রাজধানীর বেরাইদ, বছিলা, গাজীপুর, সাভার ও কেরানীগঞ্জের অপেক্ষাকৃত নিম্নভূমিতে আগে থেকে নির্মিত বাড়িওয়ালাদের কাছে গিয়ে একদল জালিয়াত চক্র ভুয়া চিঠি দিয়ে এসব বাড়ি ভেঙে ফেলার ভয় দেখিয়ে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে। অন্যদিকে ড্যাপে উলি্লখিত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে জালিয়াতির মাধ্যমে অসংখ্য ভবন নির্মাণের নকশা দেওয়া হয়। তবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে নকশা দেওয়া নিয়ে মন্থরগতি শুরু হয়। ফলে গত কয়েক মাসে প্রায় পাঁচ হাজার নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় থেকে নকশাজটের সৃষ্টি হয়েছে বলে নকশা শাখা সূত্র জানায়। রাজউকের বারান্দায় কথা হলো মোহাম্মদপুরের আবুল হোসেন নামের একজনের সঙ্গে। তিনি জানান, আট মাস আগে নকশা জমা দিয়ে ঘুরছেন। অনুমোদন পাচ্ছেন না। বলা হচ্ছে, ড্যাপ নিয়ে জটিলতা আছে, এ কারণে নকশা দিতে দেরি হচ্ছে। তার অভিযোগ, তার পরিচিত একাধিক ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে নকশা নিয়ে গেছেন কয়েক দিনেই। তিনি ঘুষ দিতে পারছেন না বলে নকশা অনুমোদন হচ্ছে না।
রাজউকে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ পূর্বাচল প্রকল্পসহ একাধিক প্রকল্পে প্লটের আকার পরিবর্তন এবং সেক্টর পরিবর্তন নিয়ে। এস্টেট শাখা সূত্র জানায়, প্লটের আকার এবং সেক্টর পরিবর্তনের সূত্রপাত হয় প্রভাবশালীদের চাপ থেকে। প্লট বরাদ্দে লটারির ফল প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই নানা স্তরের প্রভাবশালীর কাছ থেকে প্লটের আকার পরিবর্তন এবং সেক্টর পরিবর্তনের জন্য একের পর এক চাপ, অনুরোধ আসতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই এটা বাণিজ্যে পরিণত হয়। এই বাণিজ্যের কারণে পূর্বাচল প্রকল্পে ২০ থেকে ২৮ নম্বর সেক্টরে যারা প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ এরই মধ্যে সেক্টর পরিবর্তন করে ১ থেকে ২০ নম্বর সেক্টরের মধ্যে চলে এসেছেন। আর আকার পরিবর্তন হওয়া প্লটের সংখ্যা প্রায় পাঁচশ’, যেগুলো তিন কাঠা থেকে পাঁচ কাঠায় উন্নীত করা হয়েছে। প্লটের আকার পরিবর্তনের জন্য প্রায় ৮৪ একর বাড়তি জমি অধিগ্রহণ করতে হয় রাজউককে। আর অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে গাজীপুরের কালীগঞ্জের শালবনের একটি বড় অংশ ধ্বংস করতে হয়েছে রাজউককে। এ ছাড়া পূর্বাচল প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৮০০ ভূমি মালিকের অ্যাওয়ার্ড জালিয়াত চক্র হাতিয়ে নিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নয়, এ টাকার পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অসংখ্য অভিযোগ এখন রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখায়, যারা অ্যাওয়ার্ড হাতে নিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন, তাদের টাকা আগেই তোলা হয়ে গেছে। এসব অভিযোগের কোনো কিনারা করতে পারছে না রাজউক।
রাজউক পুনর্গঠন করার জন্য বর্তমান সরকারের আমলে ২০১০ সালে ড্যাপের গেজেট হওয়ার পরই উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজউকের বর্তমান জনবল কাঠামোর পরিবর্তে প্রায় আড়াই হাজার জনবল নিয়োগের একটি পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো জমা দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে। সেই আবেদন আড়াই বছর ধরে বিভিন্ন টেবিল ঘুরে জলবল সংখ্যা ১ হাজার ৭০০-তে নামিয়ে আনা হয়। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যায় প্রায় আরও আট মাস। সর্বশেষ সরকারের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এ সাংগঠনিক কাঠামো চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। ফলে সরকারের মেয়াদে এ সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না রাজউকের পক্ষে। এ কারণে রাজউককে আটটি অঞ্চলে ভাগ করে ড্যাপ বাস্তবায়ন এবং পরিকল্পিত ঢাকা মহানগরী গড়ে তোলার উদ্যোগও সফল হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে রাজউকে থাকা অপ্রয়োজনীয় এবং ইমারত কিংবা স্থাপত্য নির্মাণ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অশিক্ষিত অধিকাংশ জনবলের সেই রাজউকই রেখে যাচ্ছে মহাজোট সরকার। পুনর্গঠন না হওয়ার কারণে রাজউক ভবনে সংগঠিত টেন্ডারবাজদের দৌরাত্ম্য থেকেছে ভয়াবহভাবে। সরকারের শেষ বছরে উত্তরায় লেক ব্রিজ নির্মাণ, গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কাজ, পূর্বাচল উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি ভরাট এবং অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের জন্য পাঁচটি টেন্ডার ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত।