সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রায়

ঘৃণ্যতম অপরাধ, ফাঁসিই সাজা

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি ঔদ্ধত্যের প্রতিমূর্তি। অন্যের প্রতি অবজ্ঞাই তাঁর আচরণের সারবত্তা। সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই তাঁর আনন্দ। গতকাল মঙ্গলবার তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তবু তাঁর আচরণে কোনো গুণগত পরিবর্তন দেখেননি খোদ আদালত।
একাত্তর সালে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল এ রায় দেন।
চূড়ান্ত আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মানবসভ্যতার সম্মিলিত বিবেককে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছেন আসামি। এ জন্য তাঁকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আদালতে তাঁর আচরণ ভালো ব্যবহারের পরিচয় বহন করে না।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত দুই ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাতটি রায়ের মধ্যে এবারই প্রথম বিএনপির কোনো নেতা দণ্ডপ্রাপ্ত হলেন। এর আগে দণ্ডপ্রাপ্ত বাকি ছয়জন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ও বর্তমান নেতা।
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতনচন্দ্র সিংহকে হত্যা, একই দিনে সুলতানপুর বণিকপাড়া ও উনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা ও ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে সাকা চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রপক্ষের ২৩টি অভিযোগের মধ্যে নয়টি প্রমাণিত হয়েছে। বাকি ১৪টি অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ, ছয়টি অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় সেগুলোও প্রমাণিত হয়নি।
এ ছাড়া একাত্তরের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্য গহিরা হিন্দুপাড়ায় গণহত্যা, একই দিনে জগৎমল্লপাড়ায় গণহত্যা এবং পরদিন ১৪ এপ্রিল রাউজানের সতীশচন্দ্র পালিতকে হত্যার দায়ে সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একাত্তরের ৫ জুলাই নিজামুদ্দিন আহমেদসহ তিনজনকে আটকে রেখে নির্যাতন ও জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে মো. সালেহউদ্দিনকে নির্যাতনের দায়ে তাঁকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে স্থাপিত ট্রাইব্যুনাল ও এর সংলগ্ন এলাকায় ছিল কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। সকাল ১০টার দিকে এমনই কড়া প্রহরায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সোমবার রাতেই তাঁকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সাকা চৌধুরী হাজতখানায় বসেন। আধা ঘণ্টার বেশি সময় পর ১০টা ৪০ মিনিটে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা সাকা চৌধুরীকে এজলাসে আসামির কাঠগড়ায় নিয়ে যান পুলিশের কয়েকজন সদস্য। এ সময় সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মিনিট দুয়েক পর বিচারকের আসন গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর এবং দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় ১৭২ পৃষ্ঠার। এখানে সংক্ষিপ্ত রায় পড়ে শোনানো হবে। বেলা পৌনে ১১টার দিকে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা শুরু হয়।
চার অপরাধে ফাঁসি: অভিযোগ গঠনের আদেশের ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসির রায় হয়েছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।
তৃতীয় অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সকালে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে রাউজানের গহিরা গ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতনচন্দ্র সিংহের বাড়িতে অভিযান চালান। মন্দিরে প্রার্থনারত নূতনচন্দ্রকে টেনেহিঁচড়ে বের করার পর সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের বলেন, ‘একে হত্যার জন্য বাবার (ফজলুল কাদের চৌধুরী) নির্দেশ আছে।’ পাকিস্তানি সেনারা গুলি করলে নূতনচন্দ্র আহত অবস্থায় কাতরাতে থাকেন, তখন সাকা চৌধুরী নিজে গুলি করে নূতনচন্দ্রের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের চতুর্থ সাক্ষী গৌরাঙ্গ সিংহ (নূতনচন্দ্রের ভাতিজা) ও ১৪তম সাক্ষী গোপালচন্দ্র দাস (কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যক্ষ) ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরা সাক্ষ্যে বলেছেন, নূতনচন্দ্র যখন মন্দিরে প্রার্থনা করছিলেন, সাকা চৌধুরী তখন তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনেন। এরপর পাকিস্তানি সেনারা নূতনচন্দ্রকে গুলি করার পর সাকা চৌধুরী নিজেও রিভলবার বা পিস্তল বের করে নূতনচন্দ্রকে গুলি করেন।
১৯৭২ সালের ১৩ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র-এর অষ্টম খণ্ডের ৪৬৫ পৃষ্ঠায়, ১৯৯৭ সালের ৩ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদী ও ২০০৭ সালের ১৩ এপ্রিল ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে।
নূতনচন্দ্র হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯৭২ সালে তাঁর বড় ছেলে সত্যরঞ্জন সিংহ রাউজান থানায় মামলাও করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আরও চারজন সাক্ষী ওই ঘটনাকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন, তবে তাঁরা ঘটনা শুনেছেন। তাঁদের বক্তব্য প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ সিরু বাঙালি, দেবব্রত সরকার এবং নূতনচন্দ্রের ছোট ছেলে প্রফুল্লরঞ্জন সিংহ।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, প্রশ্ন উঠতে পারে নূতনচন্দ্র কেন ফজলুল কাদের চৌধুরীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন? নূতনচন্দ্র সারা দেশে বিশেষত, চট্টগ্রামে খুবই জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি অনেক স্কুল, কলেজ ও নামকরা কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষকসহ অনেকে কুণ্ডেশ্বরীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হিন্দু জনগোষ্ঠীর জন্য তাঁর অবদান তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বা নির্বাচনে হিন্দুদের কাছে তাঁর মতের আলাদা গুরুত্ব ছিল। যার কারণে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরী পরাজিত হন। এর প্রতিশোধ হিসেবেই নূতনচন্দ্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
রায়ে বলা হয়, সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্যের সঙ্গে দালিলিক নথি মিলিয়ে দেখা যায়, রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল দুপুরে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের বণিকপাড়ায় গিয়ে গণহত্যা চালান এবং বাড়িঘরে আগুন দেন।
রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের ২২তম সাক্ষী অনিল বরণ ধর ওই ঘটনার একজন ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর বাবা উপেন্দ্র লাল ধর ওই গণহত্যার একজন শিকার। অনিলকেও অনেকের সঙ্গে সারিতে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করেছিল, তিনিও অন্যদের সঙ্গে পড়ে যান এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তবে পরে আহত অবস্থায় তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সাকা চৌধুরীকে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে দেখেছেন।
বণিকপাড়ার ওই গণহত্যার ঘটনায় অনিল ১৯৭২ সালে সাকা চৌধুরীসহ ১৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন। সিরু বাঙালির সাক্ষ্য ও তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া বাদল বিশ্বাসের জবানবন্দি বণিকপাড়ার ওই হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে বিনাশের উদ্দেশ্যে ওই পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যার ঘটনা রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে।
ষষ্ঠ অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল বিকেলে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে রাউজানের হিন্দু-অধ্যুষিত উনসত্তরপাড়া গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালান। স্থানীয় ক্ষিতিশ মহাজনের বাড়ির পুকুরপাড়ে শান্তিসভার কথা বলে হিন্দুদের জড়ো করার পর সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে সেনারা এলোপাতাড়ি গুলি করে ৬০-৭০ জনকে হত্যা করে।
রায়ে বলা হয়, এ অভিযোগ প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ পাঁচজন সাক্ষীকে (৩, ৭, ৩১, ৩২, ৩৭ নম্বর) পরীক্ষা করেছে এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া জানতী বালা পালের জবানবন্দি দাখিল করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের ৩৭তম সাক্ষী চপলা রানী ওই ঘটনার ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী। উনসত্তরপাড়ার ওই হত্যাকাণ্ড তিনি বিস্তৃতভাবে বলেছেন এবং কীভাবে তাঁদের পুকুরপাড়ে নিয়ে জড়ো করা হয়—তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ওই হত্যাকাণ্ডে তাঁর বাবা সতীশ ও দুই স্বজন মারা যান।
রাষ্ট্রপক্ষের ৩১তম সাক্ষী সুজিত মহাজন ওই ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী এবং তিনিও চপলার অনুরূপ জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দিন খান আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ওই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে ও দালিলিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে এ গণহত্যায় আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে পেরেছে।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অষ্টম অভিযোগ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণ করে হত্যার।
রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগের সমর্থনে চারজন সাক্ষীকে পরীক্ষা করেছে এবং নানা পত্রিকার পাঁচটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সাক্ষীদের মধ্যে উম্মে হাবিবা সুলতানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং শেখ আলমগীরের স্ত্রী। তাঁর সাক্ষ্যে একাত্তরের ১৭ এপ্রিল হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডের তিন মাথা মোড় থেকে মোজাফফর আহমেদ ও শেখ আলমগীরকে অপহরণের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। ওই অপহরণের সময় তিনি উপস্থিত সাকা চৌধুরীকে শনাক্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের ২০তম সাক্ষী মোজাফফর আহমেদের আরেক ছেলে শেখ মোরশেদ আনোয়ারের সাক্ষ্য উম্মে হাবিবার সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলে গেছে। অন্য দুই সাক্ষীর সাক্ষ্য ও দালিলিক নথির বক্তব্য একই ধরনের হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে।
তিন অভিযোগে ৬০ বছর কারাদণ্ড: দ্বিতীয় অভিযোগ মধ্য গহিরা গণহত্যা, চতুর্থ অভিযোগ জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা ও সপ্তম অভিযোগ সতীশচন্দ্র পালিতকে হত্যার দায়ে সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর করে কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সিরু বাঙালি, নির্মলচন্দ্র শর্মা ও সুবলের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে রায়ে বলা হয়, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ছয়টা-সাতটার দিকে সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে রাউজানের মধ্য গহিরা গ্রামের হিন্দুপাড়ায় পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র অভিযান চালান। সেখানে গ্রামবাসীকে আটক করে স্থানীয় চিকিৎসক মাখন লাল শর্মার বাড়ির উঠানে জড়ো করা হয়। তারপর সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনারা এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যাকাণ্ড চালায়।
চতুর্থ অভিযোগ জগৎমল্লপাড়া গণহত্যার দায়েও ২০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন সাকা চৌধুরী। রায়ে বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সাকা চৌধুরী রাউজানের জগৎমল্লপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালান। হিন্দু-অধ্যুষিত এই এলাকায় শান্তিসভার কথা বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় জড়ো করা হয়। এরপর এখানে ৩২ জনকে হত্যা করা হয়।
সপ্তম অভিযোগ সতীশচন্দ্র পালিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হওয়ায় আরও ২০ বছর কারাদণ্ড পেয়েছেন সাকা চৌধুরী। রায়ে বলা হয়, একাত্তরের ১৪ এপ্রিল দুপুরে সাকা চৌধুরীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সতীশচন্দ্র পালিতের বাড়িতে যায়। সাকা চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাদের বলেন, ‘ওই লোকটা ডেঞ্জারাস….ওকে হত্যা করতে হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে সেনারা সতীশচন্দ্রকে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে মৃতদেহের ওপর পাউডার ছিটিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
দুই অভিযোগে ১০ বছর: সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগ নিজামউদ্দিন ও সালেহউদ্দিনকে আটকে রেখে নির্যাতনের। সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হওয়ায় একাত্তরের ৫ জুলাই নিজামুদ্দিন আহমেদসহ তিনজনকে আটকে রেখে নির্যাতনের দায়ে পাঁচ বছর ও একাত্তরে জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে মো. সালেহউদ্দিনকে নির্যাতনের দায়ে সাকা চৌধুরীকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
ছয় অভিযোগে সাক্ষী নেই: সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা ৯, ১৩, ১৫, ১৬, ২১ ও ২২ নম্বর অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ একজন সাক্ষীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে পারেনি। এগুলো থেকে সাকা চৌধুরীকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রমাণে ব্যর্থ আরও আটটি: আরও আটটি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করতে পারলেও তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এগুলো হলো: ১, ১০, ১১, ১২, ১৪, ১৯, ২০ ও ২৩ নম্বর অভিযোগ।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব অভিযোগের সমর্থনে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় এগুলো থেকেও সাকা চৌধুরীকে খালাস দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত আদেশ: রায়ের শেষ পর্যায়ে চূড়ান্ত আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে উল্লিখিত মানবসভ্যতার সম্মিলিত বিবেককে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনের দায়ে আসামিকে প্রতিটি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। এ জন্য তাঁকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে।
তবে ফাঁসির আদেশ দেওয়ায় কারাদণ্ডের সাজা সর্বোচ্চ সাজার সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে।
প্রতিক্রিয়া: রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে সাকা চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের ধন্যবাদ জানান। রায় আগে ফাঁস হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মিথ্যা কথা।
সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি।’ বাঁধাই করা একটি বই দেখিয়ে তিনি বলেন, রায় আগেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই রায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়েছে।
সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলাম বলেন, যথাসময়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
তদন্ত সংস্থার সহ-সমন্বয়ক সানাউল হক বলেন, ‘আমাদের তদন্ত বিফলে যায়নি। এই রায় আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।’