স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ

চট্টগ্রামের ৫০ আসামি রেহাই পাচ্ছেন!

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় চট্টগ্রামের ১০ খুনসহ ২০টি আলোচিত মামলার অর্ধশতাধিক আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী মাছ কাদেরের বিরুদ্ধে চারটি খুনের মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ-সংবলিত চিঠি চট্টগ্রামে পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ২২ আগস্ট রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠকে এসব মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আবার বৈঠক ছাড়াই দুটি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।
এ নিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে সাত হাজার ১৭৩টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হলো। ৩১তম বৈঠকে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় আলোচিত ১১৪টি খুনের মামলাসহ প্রায় ২৭৭টি মামলা ও মামলা থেকে আসামিদের নাম প্রত্যাহারের বিষয় উত্থাপন করা হয়।
যোগাযোগ করা হলে মামলা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মামলা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত জেলা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের এসব মামলার বেশির ভাগ প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটি সুপারিশ করেনি। এই কমিটির কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী, জেলা কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো মামলাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে উত্থাপন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সাংসদদের চাপে জেলা কমিটির সুপারিশ ছাড়াই বিভিন্ন মামলা বৈঠকে উত্থাপন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের র‌্যাব-পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরের বিরুদ্ধে আলোচিত চারটি খুনের মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কামাল উদ্দিন আহাম্মদের হাতে পৌঁছেছে।
মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত চারটি চিঠি গত ১৫ সেপ্টেম্বর পিপি পেয়েছেন। সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে থাকা এ মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য তিনি এখন আদালতে আবেদন করবেন।
খুনের চারটি মামলা হলো— পাঁচলাইশ থানার পলিটেকনিকের ছাত্র আবদুল কাদের হত্যা মামলা, ডবলমুরিং থানার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের, আজাদ ও আহাম্মদ আলী হত্যা মামলা। আসামি মাছ কাদের বর্তমানে জামিনে আছেন।

র‌্যাব ও পুলিশের নথি অনুযায়ী, মাছ কাদেরের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, অপহরণের অভিযোগে প্রায় ২৯টি মামলা ছিল। সাক্ষীরা ভয়ে সাক্ষ্য না দেওয়ায় ২৩টি মামলায় খালাস পান কাদের। এখন চারটি মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। একসময় মাছ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেন বলে তাঁকে মাছ কাদের বলা হয়।

২০০০ সালের ১ এপ্রিল গ্রেপ্তার হন কাদের। নয় বছর পর ২০০৯ সালের ১৮ এপ্রিল কারগার থেকে মুক্তি পান। এর আগে মামলাগুলো থেকে জামিন ও খালাস পেলেও ‘প্রোটেকশন ওয়ারেন্ট’ নিয়ে কারাগারে থেকে যান। মূলত এক-এগারোর সময় ধরপাকড় ও র‌্যাব-পুলিশের ক্রসফায়ার থেকে রক্ষা পেতে তিনি এ কৌশল নেন।

পিপি কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো আদালতে প্রত্যাহারের আবেদন করিনি। সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমাকে আদেশ তো শুনতে হবে। কাগজপত্র তৈরি করে কয়েকদিনের মধ্যে আবেদন করব।’

শীর্ষ সন্ত্রাসীর মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এনামুল হক। তাঁর মতে, সন্ত্রাসীদের মামলা প্রত্যাহার করা হলে সমাজে অপরাধীরা উৎসাহিত হবে। ন্যায়বিচার পাবে না ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

কাদের হত্যা মামলা: অভিযোগ আছে, চাঁদা না পেয়ে নগরীর ডবলমুরিং ক্রাউন কোম্পানির বাড়ির সামনে ব্যবসায়ী আবদুল কাদেরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন মাছ কাদেরের সহযোগীরা। ১৯৯৮ সালের ৭ অক্টোবরের এ ঘটনায় নিহতের বড়ভাই নুরুল ইসলাম মামলা করেন। পুলিশ মাছ কাদেরসহ তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে পরের বছর ৩১ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট অভিযোগ গঠন করে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন। বাদীসহ পাঁচ সাক্ষী এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দিনে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

আজাদ হত্যা মামলা: মামলার নথিতে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ৩০ মে ডবলমুরিং এলাকার মোগলটুলীর বাসা থেকে আজাদকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে মাছ কাদের ও তাঁর লোকজন। ২০০০ সালের ২৪ মে অভিযোগ গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

মামলাটি প্রত্যাহারের সুপারিশ করায় নিহতের স্বজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রথম আলোকে তাঁরা বলেন, বিচার তো হলো না। উল্টো আসামিদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

আহাম্মদ আলী হত্যা মামলা: ২০০০ সালের ৯ জানুয়ারি ঈদের দিন ডবলমুরিং মোগলটুলী এলাকায় আহাম্মদ আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা জবর আলী মামলা করলে পরের বছরের ২২ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এ মামলায় ১৬ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিল নিহতের বড় ভাই আবদুল মান্নান সাক্ষ্য দেন। মামলার বাদী এখন আর বেঁচে নেই। দেখে যেতে পারেননি ছেলে হত্যার বিচার।

পলিটেকনিক ছাত্র কাদের হত্যা মামলা: অস্ত্র সজ্জিত হয়ে সন্ত্রাসী মাছ কাদের ও তাঁর সহযোগীরা ১৯৯৯ সালের ২ মার্চ পলিটেকনিক ছাত্র আবদুল কাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, পাঁচলাইশ পলিটেকনিক এলাকার ফারজানা হোটেল থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। পরের বছরের ১৬ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। ২০০২ সালের ১৬ নভেম্বর মাছ কাদেরসহ তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এ মামলায় ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য্য থাকলেও সাক্ষী না আসায় আদালত আগামী ২০ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য্য করেন।

আসামির নাম প্রত্যাহার: এ ছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের দুলাল চন্দ্র দে, রুহুল আমিন, নুরুচ্ছাপা, সোহেল চৌধুরী, শাহজাহান, বিজয় চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম বাহার ও আনোয়ার হোসেন; রাউজানের সাইফুল হাসান; পটিয়ার এহসান উল; রাঙ্গুনিয়ার আবু তাহের, মোক্তার হোসেন; ডাবলমুরিং থানার আবদুল কাদের, আলী আকবর ওরফে ছেড়া আকবর; ফটিকছড়ির ওমর ফারুক; বোয়ালখালীর সৈয়দ নূর মিয়াজী, মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, ইলিয়াস আলি, বাচা মিয়া; কোতোয়ালি থানার সুরঞ্জিত বড়ুয়া লাবু, হেলাল আকবর এবং সাতকানিয়ার ১৮ জন আসামির নাম মামলা থেকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এঁরা সবাই খুনের মামলার আসামি।

মহাজোট সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে হয়রানির উদ্দেশে করা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ প্রণয়নে এই কমিটি গঠন করা হয়।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বলে পাঁচ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেয়। এ প্রক্রিয়ায় মোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন অভিযুক্ত খালাস পান। এর মধ্যে অনেক খুন, ডাকাতি, ধর্ষণের মামলাও ছিল।