চালাকি করে নেতা হওয়া যায় না…যতীন সরকার

‘নেতা হইতে যাইও না, সেবা কর। নেতৃত্বের এই পাশব প্রবৃত্তি জীবনসমুদ্রের অনেক বড় বড় জাহাজ ডুবাইয়াছে। এই বিষয়ে সতর্ক হও অর্থাৎ মৃত্যুকে পর্যন্ত তুচ্ছ করিয়া নিঃস্বার্থ হও এবং কাজ কর।’
কথাগুলো বলেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২)। ২০১৩ সালে বিবেকানন্দের সার্ধশততম (১৫০ বছর পূর্তি) জন্মবার্ষিকী পালিত হলো। কিন্তু আমাদের এই বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে তেমন একটা সচেতনতা নেই। স্বামী বিবেকানন্দ কেবল একজন হিন্দু সন্ন্যাসীরূপেই অনেকের কাছে পরিচিত। কিন্তু এটি তো নিতান্তই তাঁর খণ্ডিত পরিচয়। উনিশ শতকেই ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে বিবেকানন্দ যেসব ভাবনা ভেবেছেন, সেসব ভাবনা এই একুশ শতকেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।
বিবেকানন্দের সব ভাবনা নিয়ে নয়, নেতা ও নেতৃত্ব সম্পর্কে উনিশ শতকে তিনি যা ভেবেছেন কেবল সেই বিষয়টিই স্মরণে আনছি। তাঁর সেকালের ভাবনা ও উপদেশ আমাদের একালের জন্যও অবশ্যই ভাবনীয় ও মাননীয়।
ইংরেজি তথা পাশ্চাত্য শিক্ষা লাভের সুযোগে বিশেষ সুবিধাভোগী কিছু মানুষ সে সময় দেশের নেতার আসন দখল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। বিবেকানন্দ লক্ষ করেছিলেন যে তাঁদের অনেকের মধ্যেই স্বার্থপরতা অত্যন্ত প্রবল। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেই আবেদন-নিবেদনের ডালা হাতে নিয়ে তাঁরা বিদেশি শাসকদের করুণা ভিক্ষা করতেন, জনস্বার্থ রক্ষার সামান্য গরজও তাঁদের ছিল না। এ রকম মতলববাজ নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের প্রতিই বিবেকানন্দের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল ‘খরখড়্গসম’ নিন্দাবাণী। নেতা হওয়ার প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে সবাইকে তিনি জনসেবক হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
‘নেতা’ কথাটির মূলে আছে সংস্কৃত ‘নী’ ধাতু। ‘নী’-এর অর্থ ‘নিয়ে যাওয়া’। জনতাকে যাঁরা মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সঙ্গে নিয়ে যান, জনতার প্রভু হওয়ার চিন্তাকে মনের এক কোণেও ঠাঁই না দিয়ে কেবলই সেবা করে যান যাঁরা, জনতা তাঁদেরই নেতৃপদে অধিষ্ঠিত করে। নেতা হওয়ার তীব্র অভীপ্সা পোষণ করেন যিনি, জনতার কল্যাণ সাধনের বদলে জনতাকেই নিজের কল্যাণে লাগাতে চান যিনি, তেমন মানুষ কখনো প্রকৃত নেতা হতে পারেন না।
নেতা হওয়ার বাসনায় বশীভূত না হয়ে সর্বান্তঃকরণে ‘যাঁরা মানবজাতিকে কোনো প্রকার সাহায্য করতে চান’ তাঁরাই হন নেতা। সে রকম নেতা, স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়- “সব সুখ, দুঃখ, নাম, যশ আর যত প্রকার স্বার্থ আছে, সেগুলি একটা পুঁটলি বেঁধে সমুদ্রে ফেলে দেন। এ রকম নিঃস্বার্থ মানবব্রতী যাঁরা, নিজেরা নেতা হতে না চাইলেও জনতা যখন তাঁদের নেতার আসনে বসিয়ে দেয়, তখন তাঁদের পক্ষে জনতাকে সঙ্গে ‘নিয়ে যাওয়া’ ছাড়া কোনো উপায়ান্তর থাকে না, অর্থাৎ নেতা হয়েই যেতে হয়। এভাবে জনতার নেতৃপদে অভিষিক্ত হন যাঁরা, তাঁদের জীবনের মালিকও হয়ে যান জনতাই। নিজের জন্য কোনো কিছু কামনা না করে পুরোপুরি ‘নিঃস্বার্থ’ হয়ে ‘মৃত্যুকে পর্যন্ত তুচ্ছ’ করতে হয় তাঁদের।”
বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে এ রকম প্রকৃত নেতার অভ্যুদয় ঘটেছে বলেই তো জনতার রথচক্র সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আবার এর বিপরীতে সব দেশেই কখনো কখনো অনেক কপট নেতা জনতার সেই রথচক্রকে খানাখন্দেও ফেলে দিয়েছে। যুগে যুগেই অনেক ধূর্ত নেতৃত্বাভিলাষী ধূর্ততা ও কপটতার জাল বিস্তার করে জনতাকে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে গেছে। কখনো কখনো এ রকম বিভ্রান্তি একান্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে মানবসভ্যতাকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ফ্যাসিবাদের উত্থানই এর বড় প্রমাণ। সে সময় ইতালির মুসোলিনি, জার্মানির হিটলার ও জাপানের তোজো জনতাকে বিভ্রান্ত ও মোহগ্রস্ত করেই নেতা হয়ে বসে এবং সারা পৃথিবীতে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
কিন্তু পৃথিবীর বিপুল জনতাকে ভ্রান্তির জালে দীর্ঘকাল ধরে আটকে রাখা যায় না, ফ্যাসিবাদও তেমনটি পারেনি। জাগ্রত জনতার সম্মিলিত শক্তিই ফ্যাসিবাদ ও তার তথাকথিত নেতাদের ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থাকেন তাঁরাই, যাঁরা প্রগতির আলোকোদ্ভাসিত পথে জনতাকে সঙ্গে নিয়ে পশ্চাৎপদতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্ধকারকে দূর করে চলেন।
বিশ্ব পরিসরে ফ্যাসিবাদের প্রবক্তাদের চরম প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনার অন্ধকারের বিরুদ্ধে যেমন আলোকাভিসারী প্রকৃত নেতৃত্বের অভ্যুদয় ঘটেছিল, তেমনটিই ঘটেছিল ভিন্ন ভিন্ন দেশের ক্ষেত্রেও। ঘটেছিল আমাদের দেশেও।
বিশ শতকের চল্লিশের দশকে বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের তাণ্ডব চলার সময়ই আমাদের দেশে প্রসার ঘটেছিল যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির, সেটিও ফ্যাসিবাদের চেয়ে কম বিপজ্জনক ছিল না। সে সময় এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘পাকিস্তান’ নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জজবায় গা ঢেলে দেয়। এ রকম জজবা তৈরি হয় যাঁদের প্ররোচনায়, তাঁদের অগ্রভাগে এসে দাঁড়ান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামক ধুরন্ধর ও সুচতুর এক ব্যক্তি। মহাধুরন্ধর সেই ব্যক্তিটিই নানা কায়দায় বিপুলসংখ্যক জনতাকে বিভ্রান্তির কানাগলিতে নিয়ে যান এবং হয়ে ওঠেন সেই বিভ্রান্ত জনতার শ্রেষ্ঠ নেতা বা ‘কায়েদে আজম’। হাজার মাইলের ব্যবধানে দুই অংশে বিভক্ত পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের স্রষ্টা তিনি হয়েছিলেন বটে, কিন্তু সৃষ্টির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে রাষ্ট্রের পূর্ব অংশের জনগণের দৃষ্টিতে তাঁর স্বরূপটি ধরা পড়ে গেল। একপর্যায়ে এ অঞ্চলের মানুষ তাঁর কায়েদে আজমত্বকেই শুধু প্রত্যাখ্যান করল না, তাঁর সৃষ্ট পাকিস্তানের খাঁচা ভেঙেই বেরিয়ে এলো। কৃত্রিমভাবে জনতার নেতা হয়ে বসা সবার জন্যই নির্ধারিত হয়ে আছে এই ঐতিহাসিক নিয়তি।
এ রকম ঐতিহাসিক নিয়তির অনুবর্তিতাতেই আমাদের দেশেরও জনতা স্বার্থান্ধ কৃত্রিম নেতাদের যেমন প্রত্যাখ্যান করে, তেমনি নিঃস্বার্থ পরহিতব্রতী মানুষদের নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে তাঁদের অনুসারী ও অনুবর্তী হয়। বাংলাদেশে এ রকম নেতৃত্বেরই অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের ক্ষুদ্রস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ সাধনের উদ্দেশ্যে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ তুচ্ছ করতে পেরেছিলেন বলেই টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিব পুরো দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’রূপে জন্ম দেন একটি নতুন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের, জাতি তাঁকে অধিষ্ঠিত করে ‘জাতির পিতা’র আসনে। তবে প্রায় সব জাতির ভেতরেই অবস্থান করে কিছু কিছু পিতৃদ্রোহী কুলাঙ্গার সন্তান। বাংলাদেশে সে রকম কুলাঙ্গাররাই হয় পিতৃঘাতী। পিতৃহত্যা করে তারা চায় জাতির নেতা হতে। নেতার আসন দখলের প্রতিযোগিতায় তাদের নিজেদের মধ্যেই চলে খেয়োখেয়ি ও রক্তারক্তি কাণ্ড। দেশটি দখল করে বসে জঙ্গবাহাদুররা। এক বাহাদুরের বদলে আরেক বাহাদুরের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে দেশটিতে কায়েম হয়ে যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জঙ্গিরাজ। এরাই সহযোগীরূপে কাছে টেনে নেয় বিভিন্ন নামের ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীকে। জনগণের প্রকৃত নেতাদের আড়ালে ঠেলে দিয়ে ক্রমাগত তাঁদের নামে নানা কুৎসা প্রচার করতে থাকে ওরা। ধমক দিয়ে ও লোভ দেখিয়ে ওরা দেশের ও জনগণের নেতা হয়ে চায়। ধমকে ভয় পেয়ে অথবা লোভের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে কেউ কেউ ওদের নেতা বলে মেনেও নেয়।
কিন্তু এভাবে কৃত্রিম পন্থায় বেশ কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দখল করে রাখতে পারলেও জনগণের হৃদয়াসনে তারা নিজেদের স্থান করে নিতে পারে না, গণচিত্তে বঙ্গবন্ধুই আসীন থাকেন জাতির জনকের আসনে।
তবে দুঃখ এই, রাজনীতিতে যাঁরা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী বলে পরিচিত এবং একপর্যাযে যাঁরা বিপুল জনসমর্থন পেয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন, তাঁরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ভেজালমুক্ত রাখতে পারলেন না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি এক পতিত জঙ্গবাহাদুর প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্মকেও সংবিধানে সংযোজিত করে রাখলেন। এ রকম গোঁজামিলকে বলা হলো ‘রাজনৈতিক কৌশল’। কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে নাকি রাজনীতি করা যায় না!
হ্যাঁ, নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল শুধু রাজনীতিতে নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই নিতে হয়। কিন্তু কৌশল যখন নীতিকে জলাঞ্জলি দেয়, তখন সেটি কৌশলের বদলে চালাকিতে পরিণত হয়। আর তখনই মনে পড়ে স্বামী বিবেকানন্দের সেই বজ্রবাণী-
‘চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কার্য সাধিত হয় না; প্রেম, সত্যানুরাগ ও মহাবীর্যের সহায়তায় সকল কার্য সম্পন্ন হয়।’
রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করতে হলে এই মুহূর্তেই সব ধরনের চালাকির বিরুদ্ধে গণরোষের সৃষ্টি করতে হবে। গরিষ্ঠসংখ্যক জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ রকম গণরোষের সৃষ্টি করতে পারবেন যাঁরা, তাঁদের মধ্য থেকেই অভ্যুদয় ঘটবে আগামী দিনের নেতৃত্বের, সেই নেতৃত্বই জাতির জনকসহ সব মহান নেতার প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করতে পারবেন। সেদিনটি কি খুব বেশি দূরে?
লেখক : শিক্ষাবিদ