দিল্লির চিঠি

চুক্তি রূপায়ণের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন…সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতীয় সংসদের গত বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনের দৃশ্য এখনো চোখে ভাসছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ রাজ্যসভায় সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনে প্রয়োজনীয় ১১৯তম সংবিধান সংশোধন বিলটি পেশ করতে ওঠামাত্র অসম গণপরিষদের (অগপ) দুই সদস্য বীরেন্দ্র বৈশ্য ও কুমার দীপক দাস রে রে রে করে তাঁর দিকে তেড়ে গেলেন এবং অবাঞ্ছিত ঘটনার আশঙ্কা দূর করতে সঙ্গে সঙ্গে সভা মুলতবি করে দেওয়া হলো। সালমান ফালুক-ফুলুক দৃষ্টিতে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। যেন পরাজিত নায়ক। পেছনে বীরদর্পে হেঁটে গেলেন অগপর দুই নেতা। তাঁদের চোখেমুখে যুদ্ধজয়ের আভা। সেটা ছিল মে মাস। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হতে তখনো মাস দুই বাকি। বাংলাদেশের শাসকদলের নেতাদের চোখেমুখে বিস্ময়মাখা প্রশ্ন। তিস্তার ব্যর্থতাকে অন্তত খানিকটা ঢেকে দেবে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন, এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন তাঁরা। তা না হওয়ায় ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক স্তরে চলতে লাগল বিস্তর খোঁজ। অবশেষে ঢাকাকে আশ্বস্ত করা হলো এই বলে যে বিরোধিতা আছে ঠিকই, তবে বর্ষাকালীন অধিবেশনে ঠিক পাস করিয়ে ফেলা হবে। অথচ দিন যত এগোয়, বিরোধিতার বহরও তত বাড়তে থাকে। অগপর পাশে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এত দিন ঝিমিয়ে থাকা বিজেপি। তারা আবার দলবল নিয়ে কোচবিহারের কোনো এক ছিটমহলে গিয়ে ভারতের তেরঙ্গা উড়িয়ে দিয়ে আসে। প্রমাদ গোনে ঢাকা। দীপু মনির দিল্লি আসা তত দিনে মোটামুটি ঠিক। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে বেসরকারি সফর। বিল পাস হলে তাঁর পাগড়িতে রঙিন পালক গোঁজা হবে, বিলক্ষণ জানেন তা। ফলে বাড়তি উদ্যোগী হলেন তিনি। হোক না বেসরকারি সফর। তাতে কী? রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচতে বাধা কোথায়? অতএব তিনি দেখা করার অনুরোধ জানালেন সুষমা স্বরাজ ও অরুণ জেটলিকে। জেটলির সঙ্গে দেখা হলো। কথাও। বিশেষ ভরসা কিন্তু পেলেন না দীপু মনি। হাইকমিশনার তারিক আহমেদ করিমও চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তাঁর মতো করে। মাস খানেক আগে দেখা করেছিলেন বিজেপির বিগত দিনের লৌহপুরুষ লালকৃষ্ণ আদভানির সঙ্গে। এবার উড়ে গেলেন আমেদাবাদে, প্রকৃত লৌহমানব নরেন্দ্র মোদির মন ভেজাতে। যদিও ঢাকা ক্রমেই বুঝতে পারল, চিড়ে বোধ হয় এবারও ভিজবে না। ভিজলও না। অথচ দেরিতে হলেও বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এরই মধ্যে একদিন টানা দেড় ঘণ্টা বৈঠক করলেন লালকৃষ্ণ আদভানি, রাজনাথ সিং, অরুণ জেটলি ও সুষমা স্বরাজের সঙ্গে। বিল পাস না করালেও অন্তত যদি পেশটাও তারা করতে দেয়, তাহলেও মন্দের ভালো। ভারত যে আন্তরিক, ঢাকাকে তা যেমন বোঝানো যাবে, তেমনি লোকসভা ভেঙে গেলেও বিলটা বেঁচে থাকবে রাজ্যসভায় একবার পেশ হয়ে গেলে। সেই চেষ্টাই চালানো হলো। বিজেপির একাংশ থেকে সালমানরা সেই আশ্বাস পেয়েও গেলেন। ইতিমধ্যে জেটলির সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দীপু মনির। বিল পেশের দিন সকালেই দীপু মনি টেক্সট মেসেজ পাঠালেন জেটলিকে। জেটলিও উত্তর দিলেন। সবকিছুই ইতিবাচক। তার ওপর রাজ্যসভায় অগপর সদস্যসংখ্যাও দুই থেকে কমে একে দাঁড়িয়েছে কুমার দীপক দাসের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়। এ রকম একটা গোল হয়-হয় অবস্থায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘটনাটা ঘটল। কোনো এক সোনার কাঠির ছোঁয়ায় গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠে তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যরা ঘিরে ধরলেন সালমানকে। অপ্রত্যাশিত সেই তীব্র জঙ্গিবিরোধিতার মুখে পড়ে হকচকিত সালমানের বোধোদয় হলো, একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রিব দোসর। বিজেপি ও অগপই শুধু নয়, এবার সামলাতে হবে তৃণমূল কংগ্রেসের বায়নাক্কাও, যার ধাক্কায় তিস্তা চুক্তির পাকা ঘুঁটিটা কেঁচে গিয়েছিল। শেষ চেষ্টায় সময় নষ্ট না করে সেদিনই সংসদ ভবন থেকে সালমান ফোন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতার প্রায় পায়ে পড়ার জোগাড়। রাজনীতি মানে দেওয়া আর নেওয়ার যুগলবন্দি। আর্থিক মোরাটোরিয়াম তুমি আমায় এত দিনেও দাওনি, আমি কেন তোমার প্রতিশ্রুতি রাখব? অতএব, ল্যাজে খেলাতে লাগলেন মমতা। মুকুলকে দায়িত্ব দিলেন কথা বলার, অথচ বলে দিলেন এখনই দিল্লি যাওয়ার দরকার নেই। মুকুল কলকাতায় বসে বসে পঞ্চায়েতের বোর্ড গড়তে লাগলেন। মরিয়া সালমান একবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, একবার ডেরেক ও’ব্রায়ানের দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত মুকুলকেই ফোনে ধরলেন। মুকুল জানিয়ে দিলেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো কথাই যখন বলা হয়নি, যত কথা তা হয়েছিল বাম জমানায়, তখন মনমোহনের মান-ইজ্জত রাখার দায় তাঁদের নয়। সালমানরা বুঝে গেলেন, এ যাত্রায়ও ন যযৌ ন তস্থৌ। এ পর্যন্ত সবকিছু মোটামুটি ঠিক। প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকারের চেষ্টায় খামতি ছিল না। দুই দেশের বন্ধুরাও সক্রিয়ভাবে যতটুকু করার ততটুকু চেষ্টা করেছেন। সালমান খুরশিদের আন্তরিকতাও ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, কিছু পেতে হলে কিছু অতিরিক্ত কষ্ট সহ্য করতে হয়, সেই অতিরিক্ত কষ্টটুকু সরকার কি আদৌ স্বীকার করেছে? একটুও বাড়তি উদ্যোগ নেওয়ার নমুনা কি চোখে পড়েছে? আমার তো চোখে পড়ছে না। মনেও হচ্ছে না। আরও মনে হচ্ছে না যখন দেখছি, জোটের শরিক ও বিরোধীদের সঙ্গে তীব্র নীতিগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু বিল সরকার এই অধিবেশনে পাস করিয়ে নিল ওই বাড়তি উদ্যোগ নিয়ে! অথচ পাস না হয় না-ই হলো, সীমান্ত বিলটা পেশ পর্যন্ত করানো গেল না! এবারের এই অধিবেশনের প্রথম পর্যায়টুকু ভণ্ডুল হয়ে গেলেও ক্রমে ক্রমে আমরা দেখলাম, সরকার বিশেষ কতগুলো বিল পাস করাতে ওই ‘এক্সট্রা মাইল’ হাঁটার ঝক্কিটা নিল। অথচ বিরোধিতার কী বিপুল বহর! এই যেমন খাদ্য সুরক্ষা বিল। সবাই বুঝছে যে এটা কংগ্রেসের মাস্টার স্ট্রোক। এটাকে হাতিয়ার করেই কংগ্রেস নির্বাচনে লড়বে। তাই বিরোধিতারও শেষ ছিল না। অথচ সরকার অবলীলায় বাঘ-গরুকে এক ঘাটে জল খাইয়ে ছাড়ল! খাদ্য সুরক্ষা বিল দুই কক্ষেই পাস হয়ে গেল। জমি অধিগ্রহণ বিল। মমতাদের আপত্তি ছিল একেবারে শুরু থেকেই। অথচ সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করেই বিলটি পাস হলো। কিংবা পেনশন বিল। শুধু মমতার দলই নয়, মমতার পরম শত্রু বামপন্থীদেরও আপত্তি ছিল চরম। অথচ তাদের তোয়াক্কা না করে কংগ্রেসের ম্যানেজারেরা স্রেফ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে পেনশন ফান্ড রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বিল পাসের মতো একটা সংস্কার কর্মসূচিকে বাস্তবায়ন করে ফেলল। কোম্পানি বিল, সেবি বিল, ওয়াক্ফ বোর্ড সংশোধন বিল, কিছু না হলেও অন্তত দশ-দশটি বিল সরকার এবারের অধিবেশনে পাস করাল সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে এবং ওই ‘এক্সট্রা মাইল’টুকু হাঁটার তাগিদ দেখিয়ে। আমার কেন যেন মনে হয়, যে তাগিদ সরকার এসব বিল পাসের ক্ষেত্রে দেখাল, তার কিছুটাও যদি সীমান্ত বিলের জন্য দেখাত, বাংলাদেশিদের কাছ থেকে এত গালমন্দ ভারতকে তাহলে সহ্য করতে হতো না। সরকার মানে একটা ধারাবাহিকতা। সালমান কিংবা ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের যাঁরাই কয়েক বছর ধরে সীমান্ত চুক্তির সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সবাই জানেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব রাজ্যের সম্মতিপত্র পাঠানোর আগে মুখ্যমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েছিলেন। এত দিন ধরে সীমান্ত চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, একবারের জন্যও কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তির বিরোধিতায় একটি কথাও বলা হয়নি। সংসদেও একবারের জন্যও আপত্তি জানানো হয়নি। একেবারে শেষবেলায় তৃণমূল তীরে এসে তরি ডোবানোর খেলায় নামল। সালমানকে যেদিন বাধা দেওয়া হলো, তার পরেও টানা ১১ দিন সংসদ চলেছে। দুবার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এ সবই ওই অন্য বিলগুলোর স্বার্থে ‘এক্সট্রা মাইল’ হাঁটা। সালমান কি পারতেন না এক বেলার জন্য কলকাতায় গিয়ে মমতার ইগোতে প্রলেপ লাগাতে? প্রধানমন্ত্রী কি পারতেন না ছিটমহলের মানুষের দুর্দশা ঘোচানোর জন্য একবার অন্তত মমতাকে সিদ্ধান্ত বদলের অনুরোধ জানাতে? মমতা যা বলছেন, তা যে সত্য নয়, পারতেন না তা একবার বোঝাতে? তিস্তা চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি হয়ে গেল। মমতার গড়ে দেওয়া কল্যাণ রুদ্র কমিটির রিপোর্ট পেশের পরেও এক বছরের বেশি কেটে গেছে। কোনো বাড়তি উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে? হয়নি। সীমান্ত বিল নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট রাজ্যের দলগুলোর সঙ্গে কথা হয়েছে। চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে বই ছাপানো হয়েছে। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও অহমিয়া ভাষায় তা ছাপিয়ে বিলিও করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও যখন সংশয় কাটছে না, তখন দেশের স্বার্থে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে একবারের জন্যও কি এর প্রয়োজনীয়তা কতখানি বোঝানো যেত না? বাজেট অধিবেশনের পর প্রায় তিন মাস সময় পেয়েছিল সরকার। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে আরও খানিকটা উদ্যোগী হলে ৬৭ বছরের অনাচার, দুর্দশা ও যন্ত্রণার ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অবসান এবারেই ঘটে যেত। হলো না, এ আমাদের দুর্ভাগ্য। এই অধিবেশনেই বিরোধীদের প্রবল হই-হট্টগোলের মধ্যে কপিল সিব্বলকে বিল উত্থাপন করতে দেখা গেছে। এভাবেই সালমান খুরশিদও পারতেন সীমান্ত বিল পেশ করাতে। হোক না হইচই, আসুক না বাধা, বিল পেশ করাটা তো বিরাট কিছু নয়। সেটুকু অন্তত করাই যেত পেনশন ও জমি অধিগ্রহণ বিলের মতো ওই ‘এক্সট্রা মাইল’ হাঁটার তাগিদটুকু সরকারের থাকলে।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লীর প্রতিনিধি।