ছোট্ট নুসরাত কী করে ভুলবে এই ভয়ংকর দৃশ্য

নুসরাত সামিয়া (৫) কথা বলছে না। তার স্কুলপড়ুয়া দুই ভাই কাঁদছে অঝোর ধারায়। কিন্তু নুসরাত স্তব্ধ। গতকাল অন্য দিনের মতোই স্কুল থেকে মায়ের সঙ্গে রিকশায় ফিরছিল সে। মা আর ফেরেননি তার সঙ্গে। ফিরেছেন লাশবাহী গাড়িতে। এখন শুয়ে আছেন বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে।
নুসরাতকে স্তব্ধ করেছে এক ভয়াবহ স্মৃতি। রিকশা থেকে বাসের ধাক্কায় ছিটকে পড়ল মা আর সে। মা পড়ে গেলেন বাসের চাকার নিচে। অনেক রক্ত। চিৎকার। ভিড়। তারপর ফুটপাতে শুইয়ে রাখা হলো মাকে। রক্তভেজা। নীরব।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কমলাপুরে নুসরাত সামিয়া নামের শিশুটি চোখের সামনে তার মা রোকসানা বেগম লায়লাকে (৩৭) মিনিবাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে যেতে দেখেছে। নুসরাতের দুই ভাই তখনো স্কুলে। আর তাদের বাবা সাইফুল্লাহ খান পুরান ঢাকায় তাঁর ওষুধের দোকানে।
লোকজনের ভিড় দেখে মোটরসাইকেল রেখে জটলার মধ্যে ঢোকেন ব্যবসায়ী আমানত উল্লাহ।
দেখেন, রক্তে মিনিবাসের চাকার নিচের সড়ক সয়লাব। ‘মা’ ‘মা’ বলে কাঁদতে থাকা শিশুটিকে তিনি কোলে তুলে নেন।
জড়ো হওয়া লোকজন ততক্ষণে চাকার নিচ থেকে শিশুটির রক্তাক্ত মাকে টেনে বের করে আনেন। তাঁকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছালে চিকিৎসকেরা বলেন, মা অনেক আগেই মারা গেছেন।
আমানত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, নুসরাতের মাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও ডান হাঁটুতে সামান্য আঘাত পাওয়া নুসরাত তার কাছেই ছিল। নুসরাতের কাছ থেকে শুনেই তাকে নিয়ে তিনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে তার দুই ভাইয়ের কাছে যান। তাদের কাছ থেকে মুঠোফোন নম্বর নিয়ে তিনি তাদের বাবাকে ঘটনার কথা জানান। এরপর কয়েকজন স্বজন এসে নুসরাত ও দুই ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
নুসরাত রাজধানীর শান্তিনগরে ‘লিটন এনজেলস’ নামের একটি স্কুলের নার্সারি ক্লাসে পড়ে। ছুটির পর গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মা রোকসানা রিকশায় করে তাকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর উত্তর রায়েরবাগের বাসায় যাচ্ছিলেন। রিকশার ডান পাশে বসেছিলেন রোকসানা, বাঁ পাশে নুসরাত। কমলাপুরে আইসিডি ভবনসংলগ্ন এলাকায় সায়েদাবাদগামী আনন্দ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী মিনিবাস রিকশাটির ডান পাশে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে রিকশার চাকা দুমড়েমুচড়ে যায়। রাস্তায় ছিটকে পড়েন মা রোকসানা। মেয়ে নুসরাতও একটু দূরে ছিটকে পড়ে। মিনিবাসটি ঝড়ের গতিতে এসে রোকসানার ওপর উঠে যায়।
শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউজ্জামান বলেন, ঘটনার পর চালক ও চালকের সহযোগী পলাতক। তবে মিনিবাসটি আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রোকসানার স্বজনেরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করছিলেন।
সবার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল ছোট্ট নুসরাত। অনেকেই তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। কিন্তু সে ছিল নিথর, নিশ্চুপ। কিছুক্ষণ পর বাবা সাইফুল্লাহ এসে তাকে কোলে তুলে নেন। এবার বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকে মেয়েটি।
নুসরাতের চাচা আনিসুর রহমান কান্নাভেজা কণ্ঠে প্রথম আলোকে বলেন, মাতুয়াইলের উত্তর রায়েরবাগে তাঁদের তিন ভাইয়ের পরিবার পাশাপাশি বাসায় থাকে। রোকসানাদের তিন সন্তানের মধ্যে নুসরাত সবার ছোট। বড় ছেলে রাফিউর রহমান অষ্টম শ্রেণী ও মেজো ছেলে মেহেদী হাসান চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। গতকাল সকালে রোকসানার স্বামী সাইফুল্লাহ ছেলে রাফিউর ও মেয়ে নুসরাতকে এ গাড়ি করে স্কুলে নামিয়ে দেন। বেলা ১১টার দিকে আনিসুর একই গাড়িতে করে রোকসানা ও তাঁর ছেলে মেহেদীকে নিয়ে বের হন। মেহেদীকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে ও রোকসানাকে শান্তিনগরে নুসরাতের স্কুলের সামনে নামিয়ে দিয়ে তিনি গাড়ি নিয়ে কাজে চলে যান।
বিকেলের দিকে পরিবারের আবেদন অনুযায়ী ময়নাতদন্ত ছাড়াই পুলিশ রোকসানার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
নুসরাতের চাচা আনিসুর জানান, দুই ভাই অঝোরে কাঁদলেও দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছোট্ট মেয়েটি একেবারেই চুপ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, লাশ বারডেমের হিমঘরে রাখা হচ্ছে। আজ বুধবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে লাশ মাতুয়াইল কবরস্থানে দাফন করা হবে।
এদিকে ২০১১ সালে মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার পর অভিযুক্ত চালকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা করার দাবি জোরদার হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে ১৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা সংগঠনটির সভাপতি ও নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে এ দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন সিদ্ধান্ত হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে যথারীতি ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
জানতে চাইলে শাহজাহানপুর থানার ওসি জিয়াউজ্জামান বলেন, রোকসানা নিহত হওয়ার ঘটনায় ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা হবে।