জটিলতার ফাঁদে ‘হাইটেক পার্ক’

রাশেদ মেহেদী
প্রকল্প বাছাই আর টেন্ডার জটিলতায় পার হয়ে গেল সাড়ে চার বছর। স্বপ্নের চিলেকোঠা থেকে সবুজ ভূমিতে প্রতিষ্ঠা হলো না ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে বর্তমান সরকারের সর্ববৃহৎ প্রকল্প হাইটেক পার্ক। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্কের বিশাল জমি সুদৃশ্য ফটকের ভেতরে বিরান ভূমি হয়ে পড়ে রয়েছে। শুধু হাইটেক পার্ক নয়, টেন্ডার জটিলতায় কারওয়ান বাজারের জনতা টাওয়ারে গত আড়াই বছর ধরে ঝুলে আছে সফটওয়্যার পার্কের নির্মাণকাজও। সম্প্রতি কালিয়াকৈরে দেশের বৃহত্তম হাইটেক পার্ক নির্মাণের জন্য এক বছর আগে টেন্ডারে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে অনুমতি চেয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত

মন্ত্রিসভা কমিটিকে চিঠি দেয়। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘গাজীপুর হাইটেক পার্ক’ প্রকল্পটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ফেরত পাঠায়। ফলে সরকারের শেষ মেয়াদে এসে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ল এই পার্ক নির্মাণ প্রকল্প।
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম সমকালকে বলেন, গাজীপুর হাইটেক পার্ক প্রকল্প সম্পর্কে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত পাওয়ার আগে এ প্রকল্প নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো কিছুই করার নেই। টেন্ডার বিষয়ক মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার পার্ক নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
গাজীপুর হাইটেক পার্ক নিয়ে যা চলছে :নথিপত্র অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ বোর্ডের সভায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দেশের বৃহত্তম হাইটেক পার্ক নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। এ জন্য তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা ২৩২ একর জায়গা নির্বাচিত করা হয়। ২০০৬ সালে এখানে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়। এরপর সেখানে নির্মিত হয় সুদৃশ্য ফটক, প্রশাসনিক ভবন, অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য কয়েকটি সড়ক এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র। নির্মিত হয়নি শুধু আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিপূর্ণ অবকাঠামো সেই হাইটেক পার্ক।
২০০৯ সালের জুন মাস থেকে শুরু করে ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হাইটেক প্রকল্পের নথি দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে দরপত্র আহ্বান করা হয়। গঠন করা হয় হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। টেন্ডারে অংশ নেয় ১৫টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান কুলিম টেকনোলজি পার্ক করপোরেশন (কেটিপিসি)। তারা দর দেয় ৮০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট ও সিঙ্গাপুরের এপিজি সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম। তারা দর দেয় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। টেকনিক্যাল কমিটির মূল্যায়নে অভিজ্ঞতা, প্রকল্প প্রস্তাবের বিস্তৃতি সব মিলিয়ে কেটিপিসি পায় ৮৯ দশমিক ২৯ পয়েন্ট। আর সামিট ও এপিজি কনসোর্টিয়াম পায় ৭৭ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট। স্বাভাবিকভাবে কেটিপিসি পার্ক নির্মাণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়ার আগে হঠাৎ পার্কের পাঁচটি ব্লক নতুন করে বিন্যাস করে তিনটি ব্লক কেটিপিসি, একটি সামিট ও একটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেন্ডারের পর হঠাৎ ব্লক পুনর্নির্ধারণে আপত্তি জানায় কেটিপিসি। শুরু হয় জটিলতা। আবেদন-পাল্টা আবেদন, ফাইল চলে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। এ ফাইল চালাচালি এখনও চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। এরপর টেন্ডারে অংশ নিয়ে বাদ পড়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভা কমিটিকে চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, কেটিপিসি কনসোর্টিয়ামের স্থানীয় অংশীদার খান সন্স হোল্ডিংস লিমিটেড ঋণখেলাপি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চিঠি পাঠায় মন্ত্রিসভা কমিটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হয়, খান সন্স হোল্ডিংস ঋণখেলাপি নয়, তবে খান সন্স গ্রুপের অপর একটি প্রতিষ্ঠান খান সন্স টেক্সটাইল ঋণখেলাপি, যার একজন পরিচালক খান সন্স হোল্ডিংস লিমিটেডেরও পরিচালক। সর্বশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ‘গাজীপুর হাইটেক পার্ক’ নির্মাণ প্রকল্প আবারও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ আগের টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
টেন্ডার জটিলতা সফটওয়্যার পার্কেও :দেশের সফটওয়্যার উন্নয়ন ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ছাদের নিচে নিয়ে এসে সফটওয়্যার শিল্পকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে কারওয়ান বাজারের জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার পার্ক গড়ে তোলার প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১০ সালে। কথা ছিল, ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই যাত্রা শুরু করবে সফটওয়্যার পার্ক। সে লক্ষ্যে ২০১১ সালে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বান করা হয়। এতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। টেকনিক্যাল কমিটির প্রাক-যোগ্যতা মূল্যায়নে কেএসএম ইনফোসিটি কনসোর্টিয়াম যোগ্য বিবেচিত হলেও কাজ পায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা টেকনো বিডি ও গ্রিন টেক (ইউকে) কনসোর্টিয়াম। পরে সরকারের সঙ্গে টেকনো বিডি ও গ্রিন টেক ইউকে কনসোর্টিয়ামের সম্পাদিত চুক্তি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে কেএসএম ইনফোসিটিসহ ইওআইতে অংশ নেওয়া অপর চারটি প্রতিষ্ঠান। এ মামলা এখনও বিচারাধীন। ফলে ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে এখন পর্যন্ত থেমে আছে জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার পার্কের নির্মাণকাজ।