জরিপ এবং আগামী নির্বাচন…আসিফ নজরুল

ক্ষমতাসীন দল শেষ বছরগুলোতে এসে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। উন্নয়নশীল বহু দেশের মতো বাংলাদেশেরও এটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। এবার আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তা তারা ঠিক আসলে কতটা হারিয়েছে, তা পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ভালোমতো বোঝা যায়নি। এসব নির্বাচনে, বিশেষ করে গাজীপুরে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়ে তার জনপ্রিয়তা যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। প্রথম আলোর ২০১৩ সালের সর্বশেষ জরিপের ফলাফল তাই অনেককে হয়তো অবাক করেনি।
প্রথম আলোর জরিপ অনুসারে এই মূহূর্তে ভোট হলে ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ বিএনপিকে আর ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। বিএনপির মিত্র জামায়াতকে নিয়ে সমর্থনের এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ২ শতাংশে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেইস অনুসারে ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিএনপি-জামায়াত দুই-তৃতীয়াংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থক দলগুলো ভোট পেয়েছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, তবে আসন পেয়েছিল চার-পঞ্চমাংশের বেশি। তার মানে সাদামাটা হিসাবে প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেলে বিএনপি ও তার মিত্রদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপির এই পুনরুত্থানে দলটির ইতিবাচক কর্মসূচি ও চিন্তাচেতনার অবদান থাকলে আমরা খুশি হতাম। প্রথম আলোর জরিপে বিএনপির পক্ষে সমর্থন বাড়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে জরিপ অনুসারে দেশ পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সরকারের ব্যর্থতা ফুটে ওঠায় এটি ধারণা করা যায় যে বিএনপির সমর্থন বৃদ্ধি আসলে আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ থেকে।
জরিপে আওয়ামী লীগের পক্ষে সমর্থন ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ (গত বছর ৩৪ দশমিক ৮), জাতীয় পার্টি তাদের সঙ্গে থাকলে একত্রে এটি গিয়ে দাঁড়াবে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশে। ক্ষমতার শেষ বছরে এসে জনসমর্থন বৃদ্ধি বিরল একটি ঘটনা, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের তুলনায় তা কিছুটা হলেও বেড়েছে। অথচ জরিপের ফলাফল অনুসারে দেশ পরিচালনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সরকারের পারফরম্যান্স প্রায় সব ক্ষেত্রে আরও খারাপ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও দুর্নীতি, দলীয়করণ, বিরোধী দলের প্রতি আচরণ এবং সরকার পরিচালনার ধরনের ক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতি তাহলে মানুষের জনসমর্থন সামান্য হলেও বাড়ল কেন? এর উত্তর জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা গত বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ (১১ দশমিক ৮ থেকে ৭ শতাংশ) নেমে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে। কাজেই এটি আওয়ামী লীগের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে না, জাতীয় পার্টির জন্য তো নয়ই। বিভিন্ন আদর্শিক, নৈতিক এমনকি কৌশলগত প্রশ্নে এরশাদের দোদুল্যমান অবস্থান হয়তো জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা এতটা হ্রাসের কারণ।
আমার ধারণা, আওয়ামী লীগ জরিপের এই ফলাফল বিভিন্ন ধরনের নিন্দার মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যান করবে। আগামী নির্বাচনে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত এই আশঙ্কা করে আওয়ামী লীগ আরও গোঁয়ারভাবে একতরফা নির্বাচনের চেষ্টাও করতে পারে। বিএনএফকে নিবন্ধন প্রদানের নিরন্তর চেষ্টা, নির্বাচনী আসনের একতরফা পুনর্বিন্যাস, সরকারি প্রচারমাধ্যমে একতরফা প্রচার এবং বিভিন্ন কালো আইন ও নীতিমালা পাস করার মাধ্যমে বিরোধীদের কোণঠাসা করার মাধ্যমে সরকার বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে বলে একটি ধারণা সমাজে রয়েছে। বিরোধী দল এই নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করলে সরকার ও বিরোধী দলের সংঘাতের কারণে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনাও ব্যাহত হতে পারে।
আমার ধারণা, প্রথম আলোর জরিপে নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে কি না জিজ্ঞেস করা হলে এমন আশঙ্কা যে জনমনে আছে তা বোঝা যেত। আওয়ামী লীগ যদি জরিপের ফলাফল উন্নত গণতান্ত্রিক চেতনায় গ্রহণ করে, তাহলে অবশ্য ভালো কিছু ঘটতে পারে দেশে। সে ক্ষেত্রে তাদের বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন করার পরিকল্পনা থাকলে তা বাদ দিতে হবে। প্রথম আলোর জরিপে ৮২ শতাংশ মানুষ নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে মতামত দিয়েছে, ৯৩ শতাংশ মানুষ বলেছে বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, ৭৩ শতাংশ মানুষ বলেছে নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। এসব বিবেচনায় নিলে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনাক্রমে একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। জরিপে ৮৯ শতাংশ মানুষ আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন আছে বলেছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সামর্থ্য সম্পর্কে ৫১ শতাংশ মানুষ নেতিবাচক মত দিয়েছে। আগামী নির্বাচন প্রশ্নে এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
জরিপে জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে আগ্রহব্যঞ্জক ফলাফল এসেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির পক্ষে যেখানে সমাজের ৮০ শতাংশ মানুষ, সেখানে ৫৯ শতাংশ মানুষই মনে করে যে এই বিচার ঠিকমতো চলছে না। ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করে বিচারপ্রক্রিয়া ঠিকভাবে চলছে, যেখানে ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৭ শতাংশ। গত তিন বছরে এই সংখ্যা ক্রমাগতভাবে নেমে আসায় এটি ধারণা করা যায় যে বিচারপ্রক্রিয়ার সুষ্ঠুতা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনার সঙ্গে বহু সাধারণ মানুষও একমত পোষণ করছে।
যুদ্ধাপরাধীদের রায় নিয়ে বিএনপির নীরবতার সমালোচনা করেছে ৫৫ শতাংশ মানুষ, আর রায়-পরবর্তী জামায়াতের ধ্বংসযজ্ঞের সমালোচনা করেছে ৮৬ শতাংশ মানুষ। জামায়াতের কর্মকাণ্ডে এত মানুষ সমালোচনামুখর হলেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ। আমার ধারণা, জামায়াতকে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করার চেয়ে তাকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে পরাজিত করার পক্ষেই বেশি মানুষের সমর্থন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বস্তিকর একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নিষিদ্ধ না হলেও গত দুই বছরে জামায়াতের সমর্থন ক্রমাগতভাবে কমে এসেছে। ২০১১ সালে জামায়াতকে সমর্থনকারী মানুষ ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১২ সালে ৩ দশমকি ২ শতাংশ এবং এ বছর মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
জরিপে রাজনীতির বাইরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন ছিল নোবেলজয়ী ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ে। গত বছর বিভিন্নভাবে সারা বিশ্বে সম্মানিত হয়েছেন ড. ইউনূস। অথচ এ সময়েও ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সরকারের অপপ্রচার বেড়েছে। তাদের সম্পর্কে সরকারের অপপ্রচার যে আসলে মানুষকে তেমন প্রভাবান্বিত করে না, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবারের জরিপে। সরকারের এসব ভূমিকা ২০১২ সালের (৬০) চেয়েও ২০১৩ সালে (৬৯) বেশি নিন্দনীয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সমর্থন করছে মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ।
জরিপ নিয়ে অপর একটি প্রশ্নে উত্তরাধিকারের রাজনীতি নিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ যে ক্রমান্বয়ে উত্তরাধিকারের রাজনীতিকে অপছন্দ করা শুরু করেছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখানে। দেশের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে ৩৯ শতাংশ মানুষ খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানকে ভালো নয় বলেছেন। শেখ হাসিনার উত্তরসূরি সজীব ওয়াজেদ জয়কে ভালো নেতা মনে করেন না আরও বেশি অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে ৫৯ শতাংশ মানুষ দেশে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তারেকের পক্ষে মত দিয়েছে, জয়ের পক্ষে মত দিয়েছে ৫৩ শতাংশ মানুষ।
সার্বিকভাবে জরিপের ফলাফল বাংলাদেশের মানুষের পরিণত চিন্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণবাহী। যেমন আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে এমন বহু মানুষ বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না বা ড. ইউনূসকে নিয়ে সরকার ঠিক করছে না বলে মতামত দিয়েছে। আবার বিএনপিকে পছন্দ করে এমন অনেক মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে দলটির নীরবতাকে অপছন্দ করছে। সবচেয়ে যা উল্লেযোগ্য, আগামী নির্বাচন কোন ধরনের সরকারের অধীনে হওয়া উচিত এই প্রশ্নে দলনিরপক্ষভাবে অধিকাংশ মানুষ মতামত দিয়েছে। মানুষের এসব ভাবনা রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে সরকার বুঝতে পারবে কি?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।