জাতিগঠন ও দেশের ভাবমূর্তি একই সূত্রে গাঁথা…জি এম কামরুল ইসলাম

একেকটা সময় একেকটা বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। বিষয়টি দেশি কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হতে পারে। আবার একই বিষয় বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে। একটা দেশের কিংবা একটা জাতির ভাবমূর্তি তেমনি একটি বিষয়, যা বারবার আলোচিত হয়ে থাকে। সম্প্রতি (২৪ এপ্রিল ২০১৩) সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর সে রকমই একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, অস্থির ও অপরাজনীতি ইত্যাদিসহ দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও টক শো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে ড. ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদসহ দেশি-বিদেশি অনেক রথী-মহারথী তখন বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং পোশাকশিল্পের ভবিষ্যতের ওপর সৃষ্ট ক্ষত প্রশমন কিংবা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
সমাজব্যবস্থা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উপাদানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সমাজব্যবস্থার অনবরত পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও বিয়োজন হয়ে থাকে। কালের পরিক্রমায় সমাজব্যবস্থা একটি স্তর থেকে অন্য একটি স্তরে উন্নীত হয় কিংবা অবনমন করে। সমাজের এই চলমান কার্যক্রমকে কেউ শ্রেণী-সংগ্রাম, কেউ দ্বান্দ্বিকতা বা কেউ বিবর্তন ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। অর্থাৎ প্রাকৃতিক নিয়মেই একটা সমাজব্যবস্থা কখনো সামনের দিকে, আবার কখনো পেছনের দিকে যায়। এই চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যেই একটা দেশ বা সমাজ সম্পর্কে অন্যদের একটা ধারণার সৃষ্টি হয়ে থাকে, যাকে মোদ্দা কথায় ওই সময়ের সেই সমাজের ভাবমূর্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। যেসব দেশি ও আন্তর্জাতিক উপাদান একটি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে, তা চিহ্নিত করতে পারলে ভাবমূর্তি গড়ার উপাদানগুলোকেও নির্দিষ্ট করা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন হলো জাতি হিসেবে নিজেদের কাছে কিংবা অপরের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি কেমন? আমাদের প্রেক্ষাপটে আগে উল্লিখিত উপাদানগুলো একটি একটি করে বিশ্লেষণ করলে আমরা আমাদের ভাবমূর্তির একটা চিত্র পেতে পারি। আবার আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেও বিষয়টির ওপর একটা মূল্যায়ন উপস্থাপন করা যায়। তবে এত কিছুর মধ্যে না গিয়েও বলা যায়, জাতি হিসেবে আমাদের ভাবমূর্তি নিজেদের কাছে কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খুব একটা ভালো নয়। ব্যক্তি হিসেবে অনেককে গ্রহণ করলেও জাতি হিসেবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই আমরা আজও অনাকাঙ্ক্ষিত। সবুজ পাসপোর্ট দেখলে কিংবা বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় পেলেই বিভিন্ন দেশে আমাদের নানা ধরনের হয়রানি ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়। অথচ অনেক দেশের উন্নয়ন ও বিনির্মাণে আমাদের শ্রম ও মেধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিজস্ব সমাজেও আমরা নিজেদের আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। নিজেদের মধ্যে স্বার্থপরতা, হানাহানি, অন্তঃকলহ, অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যকে ঠকানোর প্রবণতা ইত্যাদি খারাপ অভ্যাস ও আচার-আচরণের উপস্থিতি প্রবলভাবে দেখা যায়। অথচ অনেক সম্ভাবনা নিয়ে একটা সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং রক্তাক্ত স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। আমরা একটা সংগ্রামী, চিন্তাশীল, মেধাবী ও কর্মঠ এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জাতি। জনশক্তিতে আমরা বিশ্বে সপ্তম এবং ১০০ শতাংশ লোকের নৃতাত্তি্বক পরিচয় প্রায় এক। এমনকি ধর্ম ও কৃষ্টিতেও আমরা সবাই প্রায় একই ধারার মানুষ। এমন একটি সুগ্রন্থিত (Homogeneous) জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে বিরল। এত সব অন্তর্নিহিত শক্তি থাকার পরও আমাদের ভাবমূর্তি সংকট কেন? সহজ ও সোজাভাবে বলা যায়, আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য কিন্তু দায়ী আমরাই। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের কিছু ভুল এবং সার্বিক কর্মকাণ্ড আমাদের বর্তমান ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছে।
আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য প্রথম এবং অন্যতম ব্যর্থতা হলো স্বাধীনতার পর দেশের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়াকে দ্রুত সম্পন্ন করতে না পারা। স্বাধীনতাযুদ্ধকালে এবং যুদ্ধের পর আমাদের কিছু কিছু মানুষের মধ্যে নানামুখী তৎপরতা, রাতারাতি সম্পদশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অসুস্থ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের কঠোর ও যথাযথ ভূমিকা পালনের ব্যর্থতা, তথাকথিত সুবিধাপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও সুবিধাবাদী প্রতিক্রিয়াশীলচক্রের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির মধ্যে ক্ষুদ্র স্বার্থ উদ্ধারের অনৈতিক ও প্রবল ইচ্ছা (এমনকি স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কারো কারো মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা যায়), ইতিহাস পরিবর্তনের হীন প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন কারণ আমাদের জাতিগঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের ত্যাগ ও অবদানের কথা আমাদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতে হবে। এখানে সমাজের বাস্তব অবস্থার বর্ণনা প্রসঙ্গে তাদের একটা ক্ষুদ্র অংশের কর্মকাণ্ডকে উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে মাত্র।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বড় নিষ্ঠুর। একটা দেশ আরেকটা দেশকে সাহায্য-সহযোগিতা করে বটে, তবে তা নিঃস্বার্থভাবে নয়। তাই সংগ্রাম বা স্বাধীনতার পর কিংবা অন্য কোনো পর্যায়ে যখন কোনো দেশের শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন ছলে, বলে, কলে, কৌশলে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, তাদের ঐক্যের প্রতীকী মূল নেতৃত্বকে হত্যা কিংবা ব্যর্থ করে জাতিকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পেট্রিস লুমম্বা, মিয়ানমারের ক্ষেত্রে নে উইন আর বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর মতো হাজারো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দেশের ষড়যন্ত্রও আমাদের জাতিগঠন ও জাতীয় ঐক্য গঠন বাধাগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদী শক্তির কারণে আজ আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ধ্বংস হতে বসেছে।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বংশপরম্পরায় যাতে সুখে ও শান্তিতে থাকতে পারে, এর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নৃতাত্তি্বকসহ ভাষা সংসৃ্কতি এবং ধর্মীয়ভাবে বিশ্বের অন্যতম Homogeneous জাতি হয়েও আমরা আজ প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বিভক্তিতে ভুগছি। আমরা নিজেরা নিজেরা মারামারি ও হানাহানি করে প্রতিনিয়ত শক্তিক্ষয় করছি। তাই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে আমাদের সবাইকে জাতীয় ঐক্যের প্রতি জোর দিতে হবে এবং একে অন্যকে সহ্য ও গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তার অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে আমাদের সবাইকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং অতীতের ভুলভ্রান্তিকে মুক্তমনে স্বীকার করে ভবিষ্যতের জন্য কাজ করতে হবে। স্বাধীনতার প্রতিপক্ষকে তাদের ঐতিহাসিক ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে, বিশেষ করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভালোর জন্য প্রত্যেককেই তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তাই ১৯৭১ সালে যারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। তবে বিচারপ্রক্রিয়া অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনিপ্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিতে হবে। বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যদের ধারণ ও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে হলেও এখনো সময় আছে। জাতীয় ঐক্যের এ প্রক্রিয়া যত তাড়াতাড়ি শুরু হবে, আমাদের ততই মঙ্গল। যেহেতু আমরা একে অন্যকে গ্রহণ করতে পারিনি এবং সহ্যও করতে পারি না, সেহেতু এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য সব পক্ষের যুক্তিবাদী সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, গ্রহণযোগ্য জ্যেষ্ঠ নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে, যারা শুধু জাতিগঠন ও জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির নূ্যনতম বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করার পাশাপাশি কতগুলো মৌলিক বিষয় যথা জাতীয়তা, স্বাধীনতার ইতিহাস ইত্যাদিকে সংজ্ঞায়িত করে দেবে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না।
আমরা যদি শুধু বিভাজন এবং হিংসাত্মক রাজনীতি ও কর্মকাণ্ড পরিহার করতে পারি, তবে প্রস্তাবিত নূ্যনতম জাতীয় ঐক্যই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে সহায়তা করবে। কেননা সময়ের পরিক্রমায় দেশে একদিন ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রত্যক্ষ স্বাধীনতাবিরোধী কেউ আর বেঁচে থাকবেন না। তখন অন্তত এই ভূখণ্ডের জীবিত সব মানুষ যেন বিভেদ ও হিংসা-বিদ্বেষ এবং হানাহানি ভুলে একই মনমানসিকতা নিয়ে সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারে, এর জন্য বর্তমান প্রজন্মের সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনভাবে কাজ করতে হবে। আমি মনে করি বর্তমান সমাজের প্রতিটি মানুষের বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নাগরিক এবং প্রতিটি ক্ষেত্রের নেতৃত্বের এটা করা একটা ঐতিহাসিক দায়িত্বও বটে। যদি আমরা এ দায়িত্ব পালন করতে পারি, তবে জাতিগঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত এবং জাতির ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। আর ব্যর্থ হলে তা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি দেশের রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে সর্বোচ্চ সততা, দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই একটা বড় এবং বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে হবে। জাতির আগামী দিনের কর্ণধার হিসেবে তাদের প্রকৃত মুক্ত ও উদার মনমানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। নিজের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমাদের সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে এখনই যথাযথ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

লেখক : সমাজ সংগঠক ও নিরাপত্তা গবেষক
quamrul_gm@yahoo.com