জাতিসংঘকে নির্বাচনে লাগবেই?..কামাল আহমেদ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সবার আগ্রহ একটু বেশিই ছিল। কেননা, আগামী নির্বাচন সম্পর্কে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের আগ্রহ এবং দুই নেত্রীর সঙ্গে তাঁর ফোনালাপ দেশের রাজনৈতিক সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। সুতরাং, মহাসচিবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় নতুন কিছু শোনা যায় কি না, তা নিয়ে সবার একটা আগ্রহ ছিল।
মুখরোচক খবরের ভিড়ে কোনটা ছেড়ে কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা নিয়ে সংবাদ কক্ষগুলোয় যে কিছুটা টানাপোড়েন চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের ঢাকার সংবাদপত্রগুলোর শিরোনামের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। প্রধানমন্ত্রীর শতাধিক সফরসঙ্গীর শপিং করে সময় কাটানো, জাতিসংঘের ভাষণের কপি রাস্তায় পড়ে থাকা এবং তা নিয়ে নিরাপত্তা মহড়া, হাডসন নদীর পারে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদ্যাপন, প্রধানমন্ত্রীপুত্রের ফেসবুক স্ট্যাটাস (মিশেল ওবামা ও মিসেস কেরির সঙ্গে আলাপচারিতা), প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন সাংবাদিকের অননুমোদিত রেকর্ডিংয়ের ক্যাসেট জব্দ ইত্যাদি নানা বিষয়। ‘আপনার ছেলেটা বেশ স্মার্ট’—প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ওবামার এ রকম মন্তব্যও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় খবর হয়েছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৩)। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের এই সার্টিফিকেটকে সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতার বিবেচনায় ‘একজন শিক্ষানবিস নেতার জন্য’ হয়তো খুবই জরুরি মনে হয়েছে। যদিও দলের ভেতরে অনেকেই ইতিমধ্যে তাঁকে নেতা হিসেবে বরণের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। এরপর যোগ হয়েছে তাঁর সাউথ সাউথ পুরস্কার এবং সে কারণে ঢাকায় তাঁর গণসংবর্ধনা।
এত সব খবরের ভিড়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের আলোচনার বিষয়ে যেটুকু জানা গেল তা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে নির্বাচন বিষয়ে তাঁর আগের অবস্থানই ব্যাখ্যা করেছেন এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পাঠাতে মহাসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন ও তা ঘিরে যে রাজনৈতিক বিরোধ এবং সংকট মোচনে দূতিয়ালি করা জাতিসংঘ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কার্যক্রমবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন বলে রাষ্ট্রদূত আবদুল মোমেনকে উদ্ধৃত করেছে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন (সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৩)। অবশ্য রাষ্ট্রদূত মোমেন নিশ্চিত করেছেন যে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর শেখ হাসিনা ও বান কি মুন মিনিট দশেক একান্ত আলোচনা করেছেন। সেই একান্ত আলোচনায় কী কথা হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী ও মহাসচিব কারও পক্ষ থেকেই প্রকাশ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বান কি মুনের আলোচনার গুরুত্ব আলাদা এ কারণে যে নির্বাচনে জাতিসংঘের ভূমিকা রাখার বিষয়ে তাঁর একটি নিজস্ব চিন্তাভাবনার কথা ২০০৬ সালে তিনি প্রকাশ করেছিলেন। উইকিলিকস সূত্রে আমরা এখন জানি যে তিনি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিসকে বলেছিলেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন আয়োজন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা ছিল কেবল মৌখিক আলোচনায়। ৩ অক্টোবর রাতে রাষ্ট্রদূত মোমেনের কাছ থেকে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের কোনো অনুরোধ জানায়নি। আনুষ্ঠানিক অনুরোধের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করতে জাতিসংঘের নির্বাচনী সহায়তা কার্যক্রমের বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
নির্বাচনে সহায়তা দেওয়ার কাজটি জাতিসংঘ করে থাকে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম বিভাগের অধীনে। ওই দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর জন্য কোনো সর্বজনীন মডেল নেই এবং সে কারণে সদস্যদেশের অনুরোধে তাদের চাহিদা অনুযায়ী তারা কর্মসূচি তৈরি করে থাকে। জাতিসংঘের রাজনৈতিক কার্যক্রম বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, সংস্থাটি সাধারণত তিন ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে। প্রথমত, কৌশলগত সহায়তা—যার লক্ষ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশকে নির্বাচন পরিচালনার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বা এক্সপার্টাইজ দিয়ে সহায়তা করা। এগুলো মূলত নির্বাচন পরিকল্পনা, নির্বাচনী আইন পর্যালোচনা ও তা সমৃদ্ধিকরণ, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি, সীমানা চিহ্নিত করা, ভোটার তালিকা তৈরি, নির্বাচনের বাজেট তৈরি, নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ, প্রযুক্তির ব্যবহার, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ভোটার ও নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা এবং দাতাদের সহায়তায় সমন্বয়। এ ধরনের সহায়তা ইউএনডিপির মাধ্যমে বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই পেয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের নির্বাচনে তাদের এই কৌশলগত সহায়তা ছিল খুবই ব্যাপক।
দ্বিতীয় যে ধরনের সহায়তা তারা করে থাকে, সেটি হচ্ছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য মূল্যায়ন। একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা বা শুদ্ধতাকে (ইন্টেগ্রিটি) বৈধতা দেওয়ার জন্য কোনো সদস্যরাষ্ট্রের অনুরোধ পেলে জাতিসংঘ এই ভূমিকা নিয়ে থাকে। তবে ওই দপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ ধরনের কাজের ম্যান্ডেট প্রকৃতিগতভাবে রাজনৈতিক হয়ে থাকে বিধায় সেটা তারা করে থাকে শুধু নিরাপত্তা পরিষদ অথবা সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। এ ধরনের ম্যান্ডেট বিরল উল্লেখ করে জাতিসংঘ জানিয়েছে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জাতীয় চরিত্রগুলোর (অ্যাক্টরসদের) মধ্যে আস্থার ঘাটতি দেখা দিলে এই পদ্ধতি সংকট মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে কার্যকর হতে পারে। (বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই বিবরণটির মিলই সবচেয়ে বেশি।) ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি লাভের সময়ে বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে জাতিসংঘকে অনেকবারই এ ভূমিকাটি নিতে হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে কিছু দেশ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রত্যয়ন বা সার্টিফাই করার অনুরোধও জানিয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোট আকারের নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পাঠানো হয়, যেখানে তারা নির্বাচন পরিচালনার বিষয়ে মহাসচিবের কাছে অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট দিয়ে থাকে।
আর তৃতীয় যে ধরনের সহায়তা জাতিসংঘ দিয়ে থাকে, তা হলো নির্বাচন আয়োজন অথবা তার তদারকি। এগুলো মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোয় শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে করা হয়। যেমনটি হয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, তিমুর লেস্টে, ইরাক, দক্ষিণ সুদান কিংবা আফগানিস্তানে।
সুতরাং, প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে জাতিসংঘের কোন ধরনের ভূমিকার কথা ভেবেছেন বা কোন ধরনের সহায়তা তাদের কাছ থেকে চেয়েছেন, তা অচিরেই তাঁর খোলাসা করা উচিত। প্রথম ও তৃতীয় ধরনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রথম ধারার সাহায্য আমরা বহুদিন ধরেই পেয়ে আসছি এবং এ ধরনের সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন করে কিছু চাওয়ার আছে বলে তো মনে হয় না। আর তৃতীয় যে ধরনের ভূমিকা জাতিসংঘ পালন করে থাকে, তা হয় সাধারণত গৃহযুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোয় যুদ্ধোত্তর শান্তি-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজনীতিকদের পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা চরমে এবং দলীয়করণের দোষে দুষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতি কি এতটাই সংকটাপন্ন যে জাতিসংঘকে আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা পর্যবেক্ষণ ও তার বৈধতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাব?
দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের আবর্তে আটকা পড়া দেশটির নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যদি কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে সে রকম নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যে বিদেশিরা আগ্রহী হবে না, সেটা কারও অজানা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিরা তা ইতিমধ্যেই খোলাসা করে দিয়েছেন। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনগুলো দলভিত্তিক না হলেও অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় ঢাকার যেসব কূটনীতিক সেগুলো দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁরাই সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনগুলো থেকে দূরে থেকেছেন। কারণ, ওই সব উপনির্বাচন একদলীয় নির্বাচনেরই অনুরূপ। তাই সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে জাতিসংঘ অথবা অন্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও তার প্রত্যয়ন (সার্টিফিকেশন) আশা করার কোনো অবকাশ আছে বলে তো মনে হয় না। তাহলে আর জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানানো কেন?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।