হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জামায়াতের নিবন্ধন বেআইনি ঘোষণা

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া নির্বাচন কমিশনের আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত কাজ বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট তাঁর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন। আদালত বলেছেন, এ নিবন্ধনের আইনগত কার্যকারিতা নেই।
২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে অস্থায়ী নিবন্ধন দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কারণ, দলটি তখনো নিবন্ধনের জন্য পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র জমা দেয়নি। ওই নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ১ আগস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ নিবন্ধন বেআইনি বলে রায় দেন।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ বলে মত দেন। দ্বিমত পোষণ করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন।
গতকাল শনিবার ১৫৮ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশিত হয়। বিকেলেই তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হয়।
রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আইনজীবীরা আদালতের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো হাতে পাননি। রায়ের কপি পেলে আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব এবং এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করব।’
নির্বাচন কমিশনও বলেছে, রায়ের অনুলিপি পেলে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এর আগে সংরক্ষিত রায়ের পরই কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে থাকা নিবন্ধিত দলের তালিকা থেকে জামায়াতের নাম বাদ দিয়েছিল।

পূর্ণাঙ্গ রায়টি লেখা হয়েছে ইংরেজি ও বাংলায়। জামায়াতের নিবন্ধন বেআইনি ঘোষণা করে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের দেওয়া রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। সঙ্গে তিনি তাঁর অভিমতও যুক্ত করেন। বিচারপতিসংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে বলা হয়, জামায়াত ও নির্বাচন কমিশন যুক্তি দেখিয়েছে, ওই নিবন্ধন ছিল সাময়িক। কিন্তু সাময়িক নিবন্ধন দেওয়ার কোনো বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নেই। নিবন্ধন সনদেও সাময়িক নিবন্ধন বলে কোনো বিষয় নেই।

রায়ে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে আইনগত শর্ত পূরণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে এ মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করেনি জামায়াত। সংশ্লিষ্ট বিধিতে সুস্পষ্টভাবে এটা বলেছে, শর্ত পূরণ না করা কোনো গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে কোনো দলকে নিবন্ধন দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই। নির্বাচন কমিশন ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে শর্ত পূরণ করতে জামায়াতকে অনুরোধও করতে পারে না। কারণ, ওই নিবন্ধন প্রথম থেকেই আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত। এ থেকে বলা যায়, এ বিষয়ে জারি করা রুলের সারবত্তা রয়েছে। তাই রুল মঞ্জুর করা হলো। এর ফলে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং এর আইনগত কার্যকারিতা নেই।

রায়ে দ্বিমত পোষণকারী বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন বলেছেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে দলটির নিবন্ধনের বিষয়টি ইসিকে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করা যুক্তিযুক্ত হবে। তাই আইন অনুসারে দ্রুত জামায়াতের নিবন্ধন ইস্যু নিষ্পত্তি করতে ইসিকে নির্দেশনা দেওয়া হলো।

রায়ে দেখা যায়, বিভিন্ন নজির উপস্থাপন করে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেছেন, নিবন্ধনসংক্রান্ত সব কার্যক্রম নবম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের ১২ মাস পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচন কমিশনে বিবেচনাধীন থাকার যে দাবি জামায়াতে ইসলামী করেছে, তার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই তারিখের পর নিবন্ধনসংক্রান্ত সব কার্যক্রমই বেআইনি এবং ক্ষমতাবহির্ভূত ও অশুদ্ধ। বরং আরপিওর ৯০জ(চ) বিধান অনুযায়ী, অস্থায়ী গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে জামায়াতকে দেওয়া নিবন্ধনটি বাতিল না করে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালনে বিরত থেকেছে এবং প্রতিনিয়তই সংবিধান ও আইন ভঙ্গ করে চলেছে। এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কাম্য নয়। ওই নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি অবহিত হয়ে সাংবিধানিক আদালত তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন।

আদালতে দাখিল করা ইসির হলফনামা এবং অন্যান্য প্রতিবাদী (জামায়াত) পক্ষের হলফনামা পর্যালোচনা করে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম রায়ে বলেন, আরপিওর ৯০(ঘ) অনুচ্ছেদ বা আইনটির অন্য কোথাও নির্বাচন কমিশনকে কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন, পরিমার্জন বা সংযোজনের জন্য তাগিদপত্র প্রদানের মাধ্যমে ‘অভিভাবক’ বা ‘পরামর্শদাতার’ ভূমিকা পালনের কোনো ক্ষমতা ও এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম থেকে প্রতীয়মান হয়, প্রতিষ্ঠানটি জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রটি বছরের পর বছর কথিত সংশোধনের সুযোগ প্রদান অব্যাহত রেখে আইনবহির্ভূত কাজ অব্যাহত রেখেছে; যা বেআইনি। এ ধরনের কাজকে আইনের ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘সংবিধি বা আইনের সাথে প্রতারণা’।

তবে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন তাঁর রায়ে রিট আবেদনকারীদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আইনি নয় বরং আবেগপ্রসূত। একই সঙ্গে আবেদনকারীরা তাঁদের আবেদনে এটা উল্লেখ করেননি যে ১, ২ এবং ১৪ নম্বর আবেদনকারী একই ধরনের সাংবিধানিক অযোগ্যতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে নিবন্ধন দৌড়ে অংশ নেন ও নিবন্ধন লাভ করেন। তাঁরা এটাও বলেননি যে জামায়াতের মতোই যোগ্যতা নিয়ে খেলাফত আন্দোলনও নিবন্ধন লাভ করেছে। এতে প্রমাণিত হয়, আবেদনকারীরা পরিষ্কার হাতে আদালতে আসেননি এবং তাঁর উদ্দেশ্য সৎ নয়।

রায়ের এ অংশে আরও বলা হয়, এ মামলার রেকর্ড এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদিতে নিবন্ধনের নতুন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনকে হিমশিম খেতে হয়েছে। তাদের আইন ও নীতির অনুসরণ করতে হয়েছে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য ইসিকে জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিতে হয়েছে। এটা স্বীকার করতে হবে, জামায়াত তখন একটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের অংশ ছিল। এরপর সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়। এরপর নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা শুরু করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনে তাগিদ দেওয়া শুরু করে।

রায়ে বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন বলেন, আবেদনে জামায়াতের ধর্মীয় চরমপন্থা, জঙ্গিবাদ এবং জিহাদের দিকে ইঙ্গিত করেন আবেদনকারীরা। নিঃসন্দেহে এসব বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। জামায়াতের যেসব রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কথা বলা হয়েছে তার সবই পুরোনো। এত বছর পর এ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তিনি রিট নিষ্পত্তি করে বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে করা রিট গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনাপ্রবাহ: রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়া নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালে রিট আবেদনটি করেন তরিকত ফেডারেশনের তৎকালীন মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ জন ব্যক্তি। রিটে বলা হয়, জামায়াতের নিবন্ধন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১)(বি)(২) এবং ৯০সি-এর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও সংবিধানপরিপন্থী।

সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধনীকরণের যোগ্য না হওয়ার বিষয়ে বলা আছে। রিট আবেদন থেকে জানা যায়, ধারাগুলোতে চারটি শর্তের কথা আছে, যেসব কারণে রাজনৈতিক দলটির নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। এক. দলের গঠনতন্ত্র যদি সংবিধান পরিপন্থী হয়; দুই. গঠনতন্ত্রে কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, ভাষা বা লিঙ্গভেদে কোনো বৈষম্য প্রতীয়মান হয়; তিন. নাম, পতাকা, চিহ্ন বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ড দ্বারা সাম্প্রদায়িক ঐক্য বিনষ্ট হওয়া কিংবা দেশকে বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে; চার. দলের গঠনতন্ত্রে দেশের ভৌগোলিক সীমার বাইরে কোনো দপ্তর, শাখা বা কমিটি গঠন এবং পরিচালনার বিধান থাকে।

প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক (সাবেক প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ রুল জারি করেন।

রুলের ওপর গত এপ্রিলে শুনানি শুরু হয়ে ১২ জুন পর্যন্ত নয় কার্যদিবস শুনানি হয়। আদালতে রিটের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী তানিয়া আমীর ও শেখ রফিকুল ইসলাম। জামায়াতের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক, এম বেলায়েত হোসেন ও ফরিদ উদ্দিন খান। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মহসীন রশীদ ও তৌহিদুল ইসলাম। গত ১ আগস্ট আদালত রায় ঘোষণা করেন। গতকাল দেওয়া হয় পূর্ণাঙ্গ রায়।

প্রতিক্রিয়া: জামায়াতের আইনজীবী এম বেলায়েত হোসেন বলেন, হাইকোর্টের রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর পরই আপিল করা হবে। এতে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করার জন্য নতুন একটি আবেদন দাখিল করা হবে। প্রত্যায়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা আছে। তবে দলটির নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে নতুন করে আবেদন করার বিষয়ে জামায়াত আইনজীবীদের এখনো নির্দেশনা দেয়নি বলে জানান তিনি।