জামায়াত-শিবিরের হাতে নতুন অস্ত্র!

সাতকানিয়ায় পুলিশের ওপর হামলা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াত-শিবিরের হামলায় আহত পুলিশ কনস্টেবল ইকবাল হোসেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়েছে। ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁর। চিকিৎসকরা তাঁর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পেয়েছেন। যদিও হামলায় আহত হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, তাঁকে গুলি করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর এ ধারণা সঠিক না হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। ইকবালের ওপর কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, এখন সে সন্ধান করছেন তাঁরা। গুরুতর আহত পুলিশের এ সদস্যকে গতকাল সন্ধ্যায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়েছে। স্বজন ও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অস্ত্রোপচারের পরও আশঙ্কামুক্ত নন ইকবাল।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ইকবাল হোসেনকে দেখতে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে যান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকার। আইজি তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বুধবার রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ সদস্য ইকবালকে এ হাসপাতালে আনা হয়। রাতেই জরুরি মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে তাঁর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়। রাত ৩টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চলে। তবে তাঁর শরীরে কোনো গুলি বা গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁকে ধারালো অস্ত্র (চিকন চাকু জাতীয়) দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। এতে তাঁর ফুসফুস ও পাকস্থলী ব্যাপক জখম হয়েছে।
ডা. জাকির বলেন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাঁর শারীরিক সম্পর্কে যে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি আহত হয়েছেন। ঢাকায় আনার পর এখানকার চিকিৎসকরাও এমন ধারণাই করেন। কিন্তু অপারেশনের পর তাঁরা বলেন, এটা ছুরি জাতীয় কোনো কিছুর আঘাত। যে অস্ত্র দিয়ে তাঁর শরীরে আঘাত করা হয়েছে তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। অপারেশনের পর তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তবে যেকোনো সময় তাঁর অবস্থার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম হাফিজ আক্তার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পরই চট্টগ্রামে তাণ্ডব শুরু করে জামায়াত-শিবির। ৪৮ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন বুধবার সাতকানিয়ার জোটপুকুরিয়া বাজারে দায়িত্বরত পুলিশের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। তাৎক্ষণিকভাবে দেখে ধারণা হয়েছিল, কনস্টেবল ইকবালের বুকে গুলি বিদ্ধ হয়ে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তবে নতুন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইকবালকে প্রথমে সাতকানিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে গুলির আঘাতের কথা জানান। এরপর রাতেই তাঁকে ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে অপারেশনের পর চিকিৎসকরা জানান, তাঁকে ‘ছুরিকাঘাত’ করা হয়েছে।
এসপি হাফিজ আরো বলেন, ঘটনার সময় ইকবালের সঙ্গে আরো আটজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। ঘটনার পর তাঁদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, জামায়াত-শিবিরের ‘গুলি’তেই ইকবাল আহত হয়েছেন।
গতকাল দুপুরে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনরা ভিড় করে আছেন। কথা হয় ইকবালের স্বজন আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ইকবালের বাবার নাম আজিবর হক। মা সাহেরা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম ঝর্ণা বেগম। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার মাইজদিতে।
ইকবালের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। তাঁর যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমরা কী করব, কোথায় যাব? দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন তাঁর জীবন যাওয়ার উপক্রম। আমার স্বামীর ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
অস্ত্রোপচারের পর আঘাতের ধরন ও চিকিৎসকদের মতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে এসপি হাফিজ বলেন, “সূক্ষ্ম ছুরি জাতীয় কিছু নিক্ষেপ করা যায় এমন অত্যাধুনিক অস্ত্র হতে পারে। বেশির ভাগ অস্ত্রের গুলি সোজা (ঘূর্ণন-ছাড়া) যায়। আর রাইফেলের গুলি ঘুরতে ঘুরতে যায়। যদি রাইফেল দিয়ে তাঁকে গুলি করা হয়ে থাকত তা হলে আঘাতের ধরন অন্য রকম হওয়ার কথা। অস্ত্রোপচারের পর ‘ছুরিকাঘাতের বিষয়টি’ নিশ্চিত হওয়ায় আমরা অস্ত্রের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবছি।”
সাতকানিয়া থানার ওসি আবদুল লতিফ বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে সাতকানিয়ার কাঞ্চনা জোটপুকুরিয়া এলাকা থেকে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পুলিশের ওপর হামলার দায়ে সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাফায়াত বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলায় ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাত পরিচয় দেখিয়ে আসামি করা হয়েছে।