জালিয়াতিতে প্রায় ফতুর সোনালী মোটামুটি ভালো বেসিক ব্যাংক

সোনালী ব্যাংকের অবস্থা মুমূর্ষু রোগীর মতো। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ভগ্নদশায় দিন পার করছে দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। আর্থিক জালিয়াতি, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতাসহ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণের পর তা আদায়ে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠানটিকে এ অবস্থায় টেনে নামিয়েছে। এ অবস্থায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকটি চার হাজার ১০০ কোটি টাকা চেয়ে বারবার অনুনয়-বিনয় করছে সরকারের কাছে। গত ১০ সেপ্টেম্বরও উল্লিখিত পরিমাণ অর্থ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র পাঠিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রদীপ কুমার দত্ত।
ক্যামেলস রেটিংয়েও সোনালী ব্যাংকের মান ভালো নয়। ব্যাংকের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ রেটিংয়ে (মার্চ পর্যন্ত) সোনালী ব্যাংক পেয়েছে পঞ্চম গ্রেড, যার অর্থ অসন্তোষজনক। আর বেসিক ব্যাংক পেয়েছে তৃতীয় গ্রেড, যার অর্থ মোটামুটি ভালো। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে বিশেষায়িত বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের বিভিন্ন সূচক ইতিবাচক বলে প্রতীয়মান হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রতিবেদনে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২০১২ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক কার্যক্ষমতা সূচক (নিরীক্ষিত) অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। ওই সময় ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের এ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫ শতাংশের ১ শতাংশের চেয়েও বেশি। ব্যাংকটির মোট ঋণের ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণ বিতরণ করলে এর মধ্যে ১৬ টাকা ২৭ পয়সাই খেলাপি হয়ে গেছে।
সব সূচকেই পতন সোনালী ব্যাংকের : এক বছরের ব্যবধানে সোনালী ব্যাংকের মন্দ ঋণ বেড়েছে ৯৪ শতাংশ। এ অবস্থাকে অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। অন্য পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ সোনালী ব্যাংকের একার ঘাটতির প্রায় অর্ধেক।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসলাম আলমের কাছে ১০ সেপ্টেম্বর পাঠানো প্রদীপ কুমার দত্তের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ব্যাসেল-২ মোতাবেক বর্তমানে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। মূলধন ঘাটতির কারণে ২০১২ সালের ডিসেম্বরভিত্তিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের হার দশমিক ৯৪ শতাংশ ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। আর গত মার্চ পর্যন্ত সময়ে তা আরো নাজুক পরিস্থিতিতে নেমেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চে সোনালী ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণের হার ৫.২৯ শতাংশ ঋণাত্মক অবস্থানে নেমে গেছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, মূলধন ঘাটতি অপরিহার্য হওয়ায় সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ১:৩ ভিত্তিতে সরকারের অনুকূলে ৩৩ কোটি ৭৫ লাখ রাইট শেয়ারের বিপরীতে তিন হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা পাওয়ার প্রস্তাব করেছে। এ ছাড়া সুদ মওকুফ, ভর্তুকিসহ অন্যান্য কারণে সরকারের কাছে পাওনা ৬৭৯ কোটি টাকাও চেয়েছে সোনালী ব্যাংক।
প্রদীপ কুমার দত্তের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বরভিত্তিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ তিন হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।
দেশের ব্যাংক খাতে ঘটে যাওয়া সর্ববৃহৎ আর্থিক জালিয়াতি (হলমার্ক কেলেঙ্কারি) সোনালী ব্যাংকে এ বিপুল অর্থ খেলাপির নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। আদায়যোগ্য নয়- এমন ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকটি একদিকে যেমন ঘাটতিতে পড়ছে, তেমনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কমতে শুরু করেছে। যার প্রতিফলন হিসেবে কমে যাচ্ছে এর আমানত প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকটির আমানত বাড়ার হার কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
সোনালী ব্যাংকের মুনাফা পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। মার্চ পর্যন্ত সময়ে এটি মাত্র ১৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। তবে প্রভিশন চার্জ করার কারণে ব্যাংকটির নিট ক্ষতি হয়েছে চার হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা।
গত মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের আমানত সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে সবচেয়ে কম; গত মার্চ পর্যন্ত এক বছরে মাত্র ১৩ শতাংশ।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ব্যাংকটির এমডি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে কারণে এত সমালোচনা, সেই খেলাপি ঋণ কমাতে আমরা যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ বছরে আমরা এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছি। এর মধ্যে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা নগদ আদায় হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ইতিহাসে কখনোই এত টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে আমরা এ বছরটিকে ঋণ আদায় বছর ঘোষণা করেছি। আশা করছি, এ বছর আমরা পাঁচ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে পারব।’
ইতিবাচক সূচক বেসিক ব্যাংকের : এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বেসিক ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির আমানত বৃদ্ধির হার এখন রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির হারও এ খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির হার মাত্র ৪.৮৯ শতাংশ। মার্চ পর্যন্ত বিগত এক বছরে বেসিক ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। এই সময়ে ছয়টি ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়লেও সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বেসিক ব্যাংকের, ৫৩.১৯ শতাংশ। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে সোনালীসহ চারটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকলেও বেসিক ব্যাংকের তা নেই। এর বাইরে শুধু জনতা ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে।
বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংকের আয় বেড়েছে ৩৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া মুনাফা বেড়েছে আট কোটি টাকা। আগামী বছর আমাদের মুনাফা ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনামতো আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি এখনো কম। আমাদের ২১ শতাংশ আমানতের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশের নিচে আছে।’
আবদুল হাই বাচ্চু বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের কিছু করপোরেট ডিপোজিটর আছেন, যাঁরা নিয়মিতভাবে ভালো আমানত সরবরাহ করে যাচ্ছেন। তাই ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়েছে। আমরা কলমানিতে ৫০০ কোটি টাকা ধার দিচ্ছি।’ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘পর্ষদ এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জোর প্রচেষ্টায় বিগত সরকারের সময়ে দেওয়া ঋণের যে অংশ খেলাপি হয় (২৭০ কোটি) এর মধ্যে কিছুটা আদায়ে সক্ষম হয়েছি। সে সময় ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। সেগুলোর দায় এখনো টানতে হচ্ছে। সব সূচকেই ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ভালো।’