জালিয়াতি করে শতকোটি টাকার ওষুধ আমদানি

আবু কাওসার/শহিদুল আলম
জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ওষুধ আমদানির চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বেআইনিভাবে এসব পণ্য আমদানি করেছে। স্বাক্ষর জাল ও ভুয়া চালান দাখিল করে গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ’ মানহীন এসব পণ্য খালাস হয়েছে। এর সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের এক তদন্তে জালিয়াতির এ ঘটনা ধরা পড়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
জব্দ করে প্রমাণ পেয়েছেন, গত দুই বছরে ৫৯৮টি চালান খালাস হয়েছে, যার সব ক’টি ভুয়া। যেসব পণ্য আনা হয়েছে, তার নাম ‘ইনফিউশসন সেট’। এর সঙ্গে ক্যাথেডার, সুইচ, সিরিঞ্জ, ডিসপোজাল, ক্যানুলা ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি রয়েছে। এগুলো রোগীদের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। নিয়মানুযায়ী, যে কোনো ধরনের ওষুধ, ওষুধের কাঁচামাল, ওষুধসামগ্রী আমদানিতে সরকারের ‘বাধ্যতামূলক’ অনুমোদন বা ছাড়পত্র লাগে। এর জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর ছাড়পত্র দেয়। কিন্তু আলোচ্য ওষুধের চালানগুলো আমদানিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর জাল করে, ভুয়া ছাড়পত্র দাখিল করে এগুলো খালাস করা হয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউস, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, কমলাপুর আইসিডি, বেনাপোল কাস্টম হাউসসহ দেশের সব শুল্ক বন্দর দিয়ে এসব পণ্য খালাস করা হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ রকম ১৫৮টি আমদানিকারকের নাম খুঁজে পেয়েছেন, যারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর নকল করে অতি প্রয়োজনীয় এসব ওষুধপণ্য দেশে এনেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে ইনফিউশন সেটের ৫৯৮টি চালান খালাস হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মানহীন এসব পণ্য আনা হয়েছে ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে।
যোগাযোগ করা হলে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মইনুল খান সমকালকে বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে এ-সংক্রান্ত অভিযোগ আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে এক সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এসব ওষুধ আমদানিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছিল না। ফলে এগুলো কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই বেআইনিভাবে দেশে এনে বাজারজাত করা হয়েছে। ওষুধপণ্যগুলো মানবদেহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুল্ক গোয়েন্দা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইনফিউশন সেটের মতো এ রকম অসংখ্য ওষুধ, কাঁচামাল বেআইনিভাবে আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে তদন্ত করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এ অবস্থায় ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানা গেছে, এ ঘটনার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মলি্লক গত ২৯ সেপ্টেম্বর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খানের কাছে একটি চিঠি লেখেন। এক পৃষ্ঠার লিখিত চিঠিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের ডিজি উল্লেখ করেন, যেসব চালানের মাধ্যমে উলি্লখিত ওষুধ আমদানি করা হয়েছে, তার জন্য এ অফিস থেকে কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তিনি চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, তার স্বাক্ষর জাল করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, ওষুধের কাঁচামালসহ ওষুধসামগ্রী আমদানি করছে। সরকারিভাবে অনুমোদন না থাকায় ‘স্পর্শকাতর’ এসব পণ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর জন্য শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন তিনি। জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মলি্লক কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাল ছাড়পত্রের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট অফিসের কিছু অসাধু স্টাফের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।