টাকা কামাতে অস্থায়ী নিয়োগ

নিয়োগবিধি চূড়ান্ত না করেই অ্যাডহক (অস্থায়ী) ভিত্তিতে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের তোড়জোড় চলছে। যুক্তি দেখানো হচ্ছে, স্কুলগুলোতে অনেক শিক্ষকপদ খালি থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, তাই জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্যই এই প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করার কাজে ইচ্ছা করে সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অ্যাডহক ভিত্তিতে এবং কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ‘অসাধু বাণিজ্যের’ চক্রান্ত।
জানা গেছে, দেড় বছর আগে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের পদটি তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করে সরকার। এর পরই খসড়া নিয়োগবিধি তৈরি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। খসড়াটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে চলে যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেই থেকে এটি সেখানেই পড়ে আছে। এরই মধ্যে স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সংকট কাটাতে কিভাবে নিয়োগ দেওয়া যায় সে বিষয়েই আজ রবিবার আলোচনা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় শ্রেণীর হওয়ার পর এসব পদে সরাসরি মাউশি নিয়োগ দিতে পারবে না, নিয়োগের এখতিয়ার পেয়ে যাবে সরকারি কর্মকমিশন বা পিএসসি। তবে তার আগে বিধিটি চূড়ান্ত হতে হবে। এ অবস্থায় দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে মাউশির কর্মকর্তারা অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন কিছুদিন আগে। অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ বলে কোনো লিখিত পরীক্ষা হবে না। সরাসরি নিয়োগ হবে এবং পিএসসির মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে চাকরি নিয়মিতকরণ হবে।
দেড় বছরেও বিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষক নেতারা বলছেন, আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্যই এখন অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া চলছে। আর নিয়োগ পরীক্ষা হবে না বলে অযোগ্য লোকজনও আর্থিক লেনদেন বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে যাবেন বলেও শিক্ষক নেতারা অভিযোগ করছেন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. মুজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়োগবিধি চূড়ান্ত না করে শিক্ষক নিয়োগের তোড়জোড় শুরু করা হয়েছে। অথচ দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের চেয়ে কিভাবে দ্রুত নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করা যায় সে বিষয়টিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অ্যাডহক নিয়োগ দিয়ে টাকা কামানোর জন্য নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করা হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে মাউশির কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত। তারা শেষ সময়ে সরকারকে ঝামেলায় ফেলতে চায়। তড়িঘড়ি করে অ্যাডহক ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে প্রকৃত মেধাবীরা নিয়োগ পাবে না। অযোগ্যদের নিয়োগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা চলছে।’ দেড় বছরেও কেন নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করা হলো না তা অনুসন্ধান করারও দাবি জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক সজল কান্তি মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার বিষয়। শিক্ষক না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ দিতে হলে অ্যাডহক ভিত্তিতেই দিতে হবে।’ অ্যাডহক পদ্ধতিতে যোগ্য প্রার্থীর চাকরি নিশ্চিত হবে কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো নিশ্চয়ই একটা যোগ্যতার মাপকাঠি ধরেই নিয়োগ দেব।’
শিক্ষকদের দীর্ঘদিন আন্দোলনের পর গত বছরের ১৫ মে সরকারি হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়। দেশের ৩১৭টি সরকারি হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষকের পদ আছে ৯ হাজার ৯৩৬টি। আর এক হাজার ৫৩২টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদেই জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কারণ শিক্ষকদের অভাবে নিয়মিত শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
এত দিনেও কেন বিধিটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হলো না জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের হাতে শত শত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি রয়েছে। এসব নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এ কারণে যেসব প্রতিষ্ঠানের জরুরি প্রয়োজন তাদের নিয়োগবিধি দ্রুত করে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার যোগাযোগ প্রয়োজন।’
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করতে অযথাই কালক্ষেপণ করা হয়েছে। এখনো ইচ্ছা থাকলে এটি দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে মন্ত্রণালয় এবং মাউশির বেশ কিছু কর্মকর্তা তাঁদের পকেট ভারী করার চেষ্টা করছেন। অ্যাডহকে নিয়োগ হলে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। শিক্ষকদের আশঙ্কা, যথাযথ পরীক্ষা না হলে নিয়োগ পাবে অযোগ্যরা।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে জানতে চাওয়া হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের শিক্ষক দরকার। আমরা উপায় বের করতে বলেছি কিভাবে নিয়োগ দেওয়া যায়। যদি কোনো উপায়ই না থাকে তাহলে অ্যাডহকের প্রশ্ন আসতে পারে।’
একইভাবে শিক্ষাসচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি স্কুলের শিক্ষক বিধিমালা এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। যেহেতু এটা দ্বিতীয় শ্রেণীর পদ, পিএসসির নিয়োগ দেওয়ার কথা। আবার পিএসসিও দিতে পারছে না। তাই শিক্ষক সংকট কাটাতে কিভাবে নিয়োগ দেওয়া যায় সে বিষয়েই ২৯ সেপ্টেম্বর আলোচনা হবে।’
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। অ্যাডহক ভিত্তিতেই জরুরি নিয়োগ দেওয়া সম্ভব।’
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকসহ প্রতিটি এক শিফটের স্কুলে ২৬ জন এবং ডবল শিফটের স্কুলে ৫৩ জন শিক্ষক থাকতে হবে। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ সরকারি হাই স্কুলে এ হিসাবে নির্ধারিত শিক্ষক-শিক্ষিকা। কোনো কোনো স্কুলে প্রয়োজনের তুলনায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক দিয়েই চলছে পাঠদান। পদশূন্যতা সামাল দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকরা মানবিকের শিক্ষক দিয়ে বিজ্ঞানেরও ক্লাস করাচ্ছেন। বাংলা বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি কিংবা গণিতের মতো বিষয়েও পাঠদান করছেন।’
জানা যায়, শুধু সহকারী শিক্ষকই নয়, সারা দেশের ৩১৭টি সরকারি হাই স্কুলের ২১৪টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। এই শূন্যতা চলছে প্রায় দশ বছর ধরে। আর সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই ১২১টি স্কুলে। নিয়োগবিধির জটিলতার কারণে এখানেও নিয়োগ দিতে পারছে না পিএসসি।
মাউশির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শূন্য থাকা এক হাজার ৫৩২টি সহকারী শিক্ষক পদের মধ্যে রয়েছে- বাংলার শিক্ষক ২৩০, ইংরেজি ২১০, গণিত ১১৫, ভৌত বিজ্ঞান ১৬৩, সামাজিক বিজ্ঞান ৯৮, জীববিজ্ঞান ১৫০, ব্যবসায় শিক্ষা ১২০, ভূগোল ৯৫, ইসলাম শিক্ষা ১২০, কৃষি শিক্ষা ৬১, শারীরিক শিক্ষা ৮০ এবং চারু ও কারুকলা বিষয়ে ৯০টি।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ২০১০-এর সদস্য অধ্যাপক কাজী ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যদি বিকল্প কোনো পথ খোলা না থাকে তাহলে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের আগে থেকেই আছে। যেহেতু এটা গেজেটেড পদ তাই পিএসসির নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতি অনুযায়ীই নিয়োগ দিতে হবে। স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনা মুখ্য হওয়া চলবে না। তাহলে বিতর্ক হবে। শিক্ষাকে দলীয় বিবেচনা ও স্বার্থের উর্ধ্বে রাখতে হবে।’