হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদন

টানা দুবার বাতিল হলো আদালত অবমাননা আইন

দু-দুবার বাতিল হলো আদালত অবমাননা আইন। প্রথমবার অধ্যাদেশ জারির তিন মাসের মাথায়, এবার আইন পাসের সাত মাসের মাথায়।

দুটি ক্ষেত্রেই অধ্যাদেশ ও আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই দুজন করে আইনজীবী রিট করেছেন, দ্বৈত বিচারপতির বেঞ্চে চূড়ান্ত শুনানি হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই একে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

১৯২৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের সময়ে আদালত অবমাননা আইন প্রণীত হয়। ৮৭ বছরের এই পুরোনো আইনই এখন বলবৎ থাকছে।

আদালত অবমাননা আইন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এ আবেদনের ওপর ৩ অক্টোবর আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হবে। হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ না দিয়ে গতকাল রোববার চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিষয়টি ওই দিন শুনানির জন্য নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আদালত অবমাননা আইন অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে রায় দেন। এর ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব আবেদনটি করেন।

আদালত সূত্র জানায়, বেলা দেড়টার দিকে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন উত্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাওয়া যায়নি। কয়েকটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে ওই রিটটি করা হয়। কিন্তু পুরো আইনটি বাতিল করা হয়েছে। এ অবস্থায় রায় হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তা স্থগিতের আরজি জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।

এর বিরোধিতা করে রিটকারীদের আইনজীবী বলেন, রায় স্থগিত করা হলে প্ররোক্ষভাবে সংবিধানের ১০৮ ও ১১২ অকার্যকর হয়ে যাবে।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান মামলা পরিচালনা করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংসদ ওই আইনটি পাস করেছিল। একটা আইন পুরো বাতিল করাকে হালাকাভাবে দেখলে চলবে না। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে দেখব কী কী কারণে বাতিল করা হয়েছে।’

২০১৩ সালের আইনের ৪ ধারায় নির্দোষ প্রকাশনা বা বিতরণ অবমাননা নয়, ৫ ধারায় পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়, ৬ ধারায় অধস্তন আদালতের সভাপতিত্বকারী বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত অবমাননা নয়, ৭ ধারায় কিছু ক্ষেত্র ছাড়া বিচারকের খাসকামরায় বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ আদালত অবমাননা নয় বলে আইনে ব্যাখ্যাসহ বলা হয়েছে।

আইনের ৯ ধারায় আদালত অবমাননার পরিধি বিস্তৃত না হওয়া অর্থাৎ এই আইনে শাস্তিযোগ্য নয়, এমন কোনো কাজ আদালত অবমাননা বলে গণ্য হবে না।

আইনের ১০ ধারায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কথা বলা হয়েছে। ১০(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রচলিত আইন, বিধিমালা, সরকারি নীতিমালা, পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন, স্মারক ইত্যাদি যথাযথভাবে অনুসরণ করে জনস্বার্থে ও সরল বিশ্বাসে কাজ করলে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না।

১০(২) ধারায় বলা হয়েছে, উপধারা (১)-এর অধীনে করা কাজের বিষয়ে আদালতের আদেশ-নির্দেশ যথাযথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করা অসম্ভব হলে তার জন্য আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা যাবে না।

আর আইনের ১৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপিলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে এবং আদালত তাতে সন্তুষ্ট হলে তাকে ক্ষমা করে দণ্ড মাফ বা কমাতে পারবেন।

আদালত ধারাগুলোকে সংবিধানের ২৭, ১০৮ ও ১১২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রায় দিয়েছেন।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং ১০৮ অনুচ্ছেদে ‘কোর্ট অব রেকর্ড’রূপে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা বর্ণনা করা হয়েছে। আর ১১২ অনুচ্ছেদে সবাই সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে।

আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, দুই দিক থেকে বিষয়টি দেখা যায়। ওই আইনের মতো একটি অধ্যাদেশ আদালত এর আগে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্বাচিত সংসদ ওই অধ্যাদেশের মতোই আরেকটি আইন প্রণয়ন করেছে। অন্যদিকে অধ্যাদেশের মতো আইনটিকেও আদালত অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দুই অঙ্গ অর্থাৎ বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ আদালত অবমাননার ব্যাপারে একটা পরস্পর বিপরীত অবস্থান গ্রহণের দিকে গেছে। এটা কাম্য নয়।

অধ্যাদেশ: ২০০৮ সালের ২৫ মে ১৯২৬ সালের আইন রহিত করে অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তা অবৈধ ঘোষিত হয় ওই বছরের ২৪ জুলাই। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন আইন করা হয়। এবারও ১৯২৬ সালের আইনটি রহিত করে সরকার। এবারও হাইকোর্ট তা অবৈধ বলে রায় দেন।

২০০৮ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই দেওয়া রায়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো. আবু তারিক বলেছিলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে বা কী পরিস্থিতিতে আদালত অবমাননা হবে বা হবে না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। এটা কোনো আইন দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

১৯২৬ সালের আদালত অবমাননার আইনের সংজ্ঞা নির্ধারণ ও আদালত অবমাননার বিষয়ে আদালতের ক্ষমতা ও কার্যপদ্ধতি যথাযথভাবে নির্ধারণে বিধান করতে অধ্যাদেশটি করা হয় বলে অধ্যাদেশের শুরুতে বলা হয়েছিল।

অধ্যাদেশ ও আইন দুটিতেই গণমাধ্যম ও জনপ্রশাসনের কোন কোন কাজ আদালত অবমাননা নয়, তা নির্দিষ্ট করে বলা ছিল।