মা ন ব তা বি রো ধী অ প রা ধে র বি চা র

ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে

একের পর এক ঘটে যাওয়া অঘটনের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একইভাবে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত আছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত নিষ্ঠা নিয়েও।

সর্বশেষ বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায়ের খসড়া ফাঁস এবং এই নজিরবিহীন ঘটনার সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের একাধিক কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের প্রশাসনিক পরিচালন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিচার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কাজে নিয়োজিত ট্রাইব্যুনালের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, নজরদারি ও তত্ত্বাবধানে শুরু থেকেই শৈথিল্য দেখানো হয়েছে। ঢিলেমির পরিচয় পাওয়া গেছে এর আগে ঘটা ঘটনাগুলোর কোনো সুরাহা না করার উদাহরণ থেকেও।

বিচারপতির স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসের মতো বড় ধরনের কেলেঙ্কারির পরও ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ড তদারকিরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাও কার্যকরভাবে ঢেলে সাজানো হয়নি।

এ অবস্থায় স্পর্শকাতর এই বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি করে বলে মনে করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। পুরোনো হাইকোর্ট ভবন, যেখানে ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে, তার বাইরের নিরাপত্তা দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে ভবনের ভেতরের নিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব কার, তা নির্দিষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয় মূলত ভেতরকার প্রশাসন চালায়। তবে নজরদারির জন্য ভেতরে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো আছে। কিন্তু এগুলো সার্বক্ষণিক দেখার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো লোক নেই। রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার তাঁদের দপ্তরে বসে হাজার কাজের ফাঁকে সিসি ক্যামেরায় ধরা ছবি কম্পিউটারের মনিটরে দেখেন।

সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে নিরাপত্তার কাজে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে, সেখানে অবশ্যই একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থাকতে হবে। তার দায়িত্বে থাকবেন একজন প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তিনি সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

বাইরের নিরাপত্তাব্যবস্থা: ট্রাইব্যুনাল চত্বরে ঢোকার জন্য হাইকোর্ট মাজার (উত্তর) ও শিশু একাডেমীর (দক্ষিণ) দিকে দুটি ফটক আছে। দক্ষিণের ফটক দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসা-যাওয়া করেন এবং আসামি আনা-নেওয়া করা হয়। উত্তরের ফটক দিয়ে বিচারক, আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকেরা প্রবেশ করেন। এখানে চোখে পড়ার মতো নিরাপত্তাব্যবস্থা হলো, একটি রেজিস্টার খাতায় নাম, পরিচয় ও ফোন নম্বর লেখা। এরপর অস্থায়ী অনুমতিপত্র (গেটপাস) নিয়ে চত্বরে ঢোকা। তারপর একটি আর্চওয়ের ভেতর দিয়ে ভবনের মূল প্রবেশপথে সামনে যেতে হয়।

ভবনে ঢোকার জন্য চারটি প্রবেশপথ আছে। দুটি প্রবেশপথ দিয়ে দুই ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা প্রবেশ করেন। পেছনের প্রবেশপথ দিয়ে আসামি আনা-নেওয়া করা হয়। মূল প্রবেশপথ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনজীবী, পর্যবেক্ষকসহ সাধারণের প্রবেশের জন্য ব্যবহূত হয়। এই পথ দিয়ে ঢোকার সময় আরেকটি আর্চওয়ে পেরোনোর পর মুঠোফোন জমা দিতে হয়। ট্রাইব্যুনালের দুই ফটকের কাছে ও চত্বরে চারটি, মূল প্রবেশপথের সামনে দুটি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসানো রয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই নিরাপত্তাব্যবস্থায়ও গলদ আছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপক্ষের এক কৌঁসুলি রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে বিচারকাজ দেখতে যাওয়া বিদেশি পর্যবেক্ষকদের তালিকা চেয়েছিলেন। প্রায় নিয়মিতই বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা ট্রাইব্যুনালে গেলেও রেজিস্ট্রারের কার্যালয় তাঁদের তালিকা দিতে ব্যর্থ হয়।

মুঠোফোন জমা রাখার ক্ষেত্রেও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কারণ বিচারকাজ চলাকালে, এমনকি রায় ঘোষণার সময়ও এজলাসের ভেতরে মুঠোফোন বাজতে শোনা গেছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের মুঠোফোন বেজে ওঠার ঘটনা বেশি ঘটেছে।

পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে দর্শনার্থীদের ঢুকতে দেওয়ার ঘটনা ট্রাইব্যুনালে আগেও ঘটেছে। ২০১২ সালের ২৪ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিচারকাজ চলার সময় ট্রাইব্যুনালে ১৪ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক যান। বেলজিয়ামের একজন ও তুরস্কের ১৩ জন দর্শনার্থী নিজেদের মানবাধিকারকর্মী পরিচয় দিয়ে এজলাসে ঢুকে বিচারকাজ দেখেন। পরে জানা যায়, তাঁরা তুরস্কের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য।

অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অনেকেই ওই সময় বলেছিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে তাঁরা ট্রাইব্যুনালে এসেছিলেন। তখনো ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় ঢিলেমি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্টসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। বিশেষ প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল থেকে যদি অতিরিক্ত ফোর্স চাওয়া হয়, তবে তা দেওয়া হয়।

পুলিশ নিজে থেকে নিরাপত্তা তদারকি করে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রায়ের দিন বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমরা নিজে থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করি।’

 ভেতরের নিরাপত্তা: ট্রাইব্যুনালের নিচতলায় মূল প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে ডান দিকে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ ও রেজিস্ট্রারের কার্যালয়। বাঁ দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তর। দুই থেকে তিনজন সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ভবনের ভেতরের সিঁড়ি, হাজতখানা, এজলাস সিসি ক্যামেরার আওতায়।

দুই পাশের করিডরের শেষ মাথায় প্রক্ষালন কক্ষের পাশে একটি করে কক্ষ রয়েছে, যেখানে ট্রাইব্যুনালের প্রায় ১০ জন নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারী রাতে থাকতেন। তবে গত বৃহস্পতিবার থেকে তাঁদের রাতে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না।

ট্রাইব্যুনালের সূত্রগুলো জানায়, বিচারকদের কক্ষের মতো সংবেদনশীল স্থানেও অবাধ যাতায়াত ছিল ট্রাইব্যুনালের উচ্চ ও নিম্ন পর্যায়ের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর। বিচারকদের কক্ষ ও এজলাস রক্ষণাবেক্ষণ, খোলা ও তালা দেওয়া প্রভৃতি কাজ জমাদার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রমুখ নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা করলেও তাঁদের কাজের ওপর কারও কোনো প্রত্যক্ষ তদারকি ছিল না। ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব নৈশপ্রহরী নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাইব্যুনালের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত। বিকেল পাঁচটার দিকে সাধারণত বিচারকেরা চলে যান। এরপর ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাফেরা, কর্মকাণ্ড দেখার আর কেউ থাকে না। দাপ্তরিক সময়ের পর টেলিফোন ও কম্পিউটার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার কথাও বলেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, রায়ের খসড়া ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ট্রাইব্যুনালের অস্থায়ী কর্মী নয়ন আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার চামা গ্রামে। প্রায় দুই বছর আগে তিনি দৈনিক ১২০ টাকা মজুরির ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পান। কম্পিউটারে কম্পোজ করতে পারেন বলে এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে কম্পিউটারে ছোটখাটো দাপ্তরিক চিঠিপত্র লেখানোর কাজও করানো হতো। ১০ জন নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীর সঙ্গে তিনিও ট্রাইব্যুনাল ভবনের নিচে থাকতেন।

ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, বিচারকেরা চলে যাওয়ার পরও তাঁদের কক্ষে কর্মচারীদের ঢুকতে পারা, ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের কক্ষে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অবাধ যাতায়াত, রাতে ট্রাইব্যুনাল ভবনে কর্মচারীদের থাকতে দেওয়া প্রভৃতি বিষয় ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

জানতে চাইলে গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ও মুখপাত্র এ কে এম নাসিরউদ্দীন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে নিরাপত্তা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিচতলায় যারা থাকত, বৃহস্পতিবার বিকেলে তাদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের চাবিগুলো আপাতত আমাদের কাছে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ভবিষ্যতের জন্য আরও কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।