ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড

পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। বিএনপির নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ হয়েছে  ২৫৬ জনের। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ২৭৭ জন।

হত্যা মামলার বিচারে গঠিত বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান আজ মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণা উপলক্ষে পুরান ঢাকার বকশিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালত ঘিরে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। সকাল ১০টায় বিচারকার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়।

রায় ঘোষণার সময় একাধিকবার বিচারককে থামতে হয়েছে।দণ্ডপ্রাপ্তরা কখনও চিত্কার করে বলেছেন তাঁরা নির্দোষ, কখনও তাঁরা বিচারকের কাছে কিছু বলার সুযোগ চেয়েছেন।কেউ কেউ ক্ষোভে চিত্কার করতে থাকলে বিচারক রায় ঘোষণা থামিয়ে পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।কাউকে আবার উচ্চস্বরে কাঁদতে দেখা গেছে।প্রিজনভ্যানে তোলার সময় দণ্ডপ্রাপ্তদের কেউ কেউ সাংবাদিকদের বিষোদ্গারও করেছেন, নিজেদের পরিণতির জন্য দায়ী করেছেন সাংবাদিকদের।

সাজার পরিসংখ্যান

হত্যা মামলায় মোট আসামি ছিলেন ৮৫০ জন। বিচার চলার সময় চারজন মারা গেছেন। আজ ৮৪৬ জন আসামির ব্যাপারে রায় ঘোষণা করা হয়।

আদালত ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। বিএনপির নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ হয়েছে ২৫৬ জনের। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ২৭৭ জন।

আদালত পিন্টু ও তোরাব আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেন; অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন। ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে অবৈধভাবে অস্ত্র লুণ্ঠনের দায়ে আরও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

২৫৬ জনের মধ্যে ২০৭ জনকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের আরেকটি অভিযোগে আরও তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়। এ নিয়ে মোট ১৩ বছর কারাভোগ করতে হবে। বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিদের চিৎকার

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণার পর এজলাসে চিত্কার শুরু করেন আসামিরা। কেউ বলেন, ‘আল্লাহর দরবারে বিচার হবে।’ আবার কেউ বলেন, ‘এ দেশে কোনো বিচার নাই।’

এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম মাইক্রোফোনে এই ১৬১ জনের উদ্দেশে অনুরোধ করে বলেন, ‘আপনারা কেউ কথা বলবেন না। আমি আপনাদের হয়ে লড়েছি। আপনাদের ওপর আমার অধিকার আছে। এর পর আরও আদালত আছে। আমরা সেখানে আপিল করব। দয়া করে কেউ কথা বলবেন না।’ কিন্তু তাঁর কথা কানে না তুলে তাঁরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে চিত্কার করতে থাকেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

আদালতের কার্যক্রম দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয়। নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা পর আদালতের কার্যক্রম শুরু করায় বিচারক মো. আখতারুজ্জামান শুরুতেই দুঃখপ্রকাশ করেন। এরপর তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ দেওয়া শুরু করেন।

ঘটনার ব্যাপারে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচি একটি বড় কারণ।কোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী বা আধা সামরিক বাহিনী বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অপারেশন ডাল-ভাতের মতো কাজে যুক্ত রাখা উচিত নয়।

পিলখানার ভেতরে স্কুলগুলোতে বিডিআর জওয়ানদের সন্তানদের ভর্তি করতে পারার বিষয়ে আরও ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।প্রয়োজনে আরও স্কুল তৈরি করা যায় কি না, তা কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত।

সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠানো যায় কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ভেবে দেখতে পারেন।

এ ছাড়া সেনাসদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে বিডিআর সদস্যরা দেশের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আছেন।এ জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতো ২০ শতাংশ ভাতা তাঁদের পাওয়া উচিত।তাঁদের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া দেওয়া যায় কি না, তাও দেখা উচিত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের কারণ হিসেবে সামরিক নিরাপত্তা-সম্পর্কিত কারণ থাকতে পারে; যাতে আমাদের সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা যায়।কূটনৈতিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বহির্বিশ্বে আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীকে উচ্ছশৃঙ্খল দেখানো, যাতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দেশে গন্ডগোল থাকলে বাহিনীর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা থাকবে।এতে বিনিয়োগ হবে না।অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল করার জন্য হতে পারে।সামাজিক কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে  নিরুত্সাহিত করার জন্য।

আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, আমাকে রায় দিতে হবে। আমার বিবেচনায় যা মনে হয়েছে তা-ই দিয়েছি। আসামিরা উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন।

নিরাপত্তাবলয়

রায় ঘোষণার জন্য সকাল থেকে আদালতের প্রস্তুতি শুরু হয়। আসামিদের ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশ, র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা চারদিক দিয়ে আদালত এলাকা ঘিরে রাখেন। বকশিবাজার ও উর্দু রোড দিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্বজনদের উপস্থিতি

রায় ঘোষণা উপলক্ষে নিহত ১০ সেনা কর্মকর্তা কর্নেল মুজিব, কর্নেল আনিস, কর্নেল শামসুল আরেফিন, কর্নেল কাজী এমদাদুল হক, লে. কর্নেল ইমসাদ ইবনে আমিন, লে. কর্নেল শামসুল আজম, লে. কর্নেল আবু মুসা মো. আইয়ূব কায়সার, মেজর মোসাদ্দেক ও মেজর সালেহর পরিবারের সদস্যরা আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। তবে আসামির স্বজনদের আদালত চত্বরে দেখা যায়নি।

মামলার সারসংক্ষেপ

পিলখানার ঘটনায় তিন মামলা২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। বিদ্রোহের মামলার আসামি ছয় হাজার ৪৬ জন। হত্যা মামলার আসামি ৮৫০ জন। বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার আসামি ৭৮৭ জন।

লাশ উদ্ধারহাসপাতালের হিমঘর থেকে নয়টি, গণকবর থেকে ৪৮টি, ডিজির বাংলো থেকে দুটি ও অন্যান্য জায়গা থেকে বাকি লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত ৭৪ জনের মধ্যে সেনা কর্মকর্তা ছিলেন ৫৭ জন ও বিডিআর সদস্য ছিলেন ১০ জন। দরবার হল ও আশপাশে হত্যা করা হয় ৪৫ জনকে।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের দিনের চিত্রপিলখানার মোট আয়তন চার বর্গকিলোমিটার। ঘটনার সময় পুরো পিলখানায় বিডিআরের সদস্য ছিলেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। দরবার হলে ৯৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের মোট দুই হাজার ৪৮৩ জন উপস্থিত ছিলেন।

এ ঘটনায় দুই হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি করা হয়েছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি সাব মেশিন গান, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি।

ফিরে দেখা পিলখানা হত্যাকাণ্ড

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহের নামে পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটেছিল এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। বিচারের মুখোমুখি করা হয় ৮৫০ বিডিআর জওয়ানকে। আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল সুসজ্জিত দরবার হল থেকে। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিডিআরের তত্কালীন মহাপরিচালক শাকিল আহমেদের বক্তব্যের সময় দুজন সিপাহি অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করেন। এরপর জওয়ানেরা দুই দিন ধরে বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৭৪ জনকে হত্যা করেন। কর্মকর্তাদের বাড়িঘরে লুটপাট ও ভাঙচুর চালান। সরকারি নথিপত্রেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিদ্রোহ শুরুর ৩৩ ঘণ্টা পর শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়।

এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবোজ্যোতি খীসা একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন ২০০ কর্মকর্তা। ৫০০ দিন তদন্তের পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই এ আদালতে হত্যা এবং অস্ত্র-বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্তে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে বর্ধিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সব মিলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০।

এই মামলায় নথির সংখ্যা ৮৭ হাজার পৃষ্ঠা। আসামিদের মধ্যে বিডিআর জওয়ান আছেন ৭৮২, বেসামরিক সদস্য ২৩ জন। এর মধ্যে ২০ জন এখনো পলাতক। বিচার চলার সময় চারজন মারা গেছেন, জামিনে আছেন ১৩ জন। জামিনে থাকা ১৩ জনের মধ্যে ১০ জন আজ আদালতে হাজির হন। বাকি তিনজন জোহরা খাতুন, আব্দুস সালাম ও লোনা আক্তার হাজির হতে পারেননি।

২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মামলার বিচার শুরু হয়। চার বছর আট মাসে মামলাটি ২৩২ কার্যদিবস অতিক্রম করে। আজ রায় ঘোষণার মধ্যে শেষ হলো এ মামলার সব কার্যক্রম।