তত্ত্বের জাঁতাকলে বাংলাদেশ…চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম

রাজনৈতিক সংকট কাটুক না কাটুক, নির্বাচন নিয়ে দুর্ভাবনা দূর হোক বা না হোক, বাহারি ইঙ্গিতপূর্ণ আর ঝকমারি তত্ত্বের উর্বর ক্ষেত্র এখন বাংলাদেশ। আর রাজনীতিবিদদের এসব বাচাল বোলচাল আর তত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় মাঝেমধ্যেই দেশে একটা শোরগোল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে স্ব-উৎসাহে শুরু হয় বিতর্কের ফুলঝুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-টুইটার উপচে পড়ে মজাদার সব স্ট্যাটাস আর মন্তব্যে। নানামুখী সমস্যায় আকীর্ণ এই দেশে এ এক উৎপাত- তার পরও উপভোগ্য। কারণ তিতিবিরক্ত জনগণ এ নিয়ে সরস আলোচনার একটা উপলক্ষ পায়। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ব্যাপারও ঘটে। রাজনীতিবিদদের অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা আর অবিবেচক মনোভাবের প্রমাণ জমা পড়ে জনগণের মনের ভাঁড়ারে। দিনে দিনে সেই ভাঁড়ার পূর্ণ হয়। এতে রাজনীতিকরা দিনে দিনে খেলো হন, আর জনগণ বিরক্ত।
রানা প্লাজা ধসে পড়ল। হাজারের ওপর মানুষ প্রাণ হারাল। বিরাট দুর্ঘটনা। অসংখ্য বীভৎস মৃত্যুদৃশ্য দেখে দেখে জনগণ যখন বিচলিত, তখন বাঙালির জ্ঞানভাণ্ডার আরো খানিকটা ঋদ্ধ হলো ‘আড়াআড়ি-নাড়ানাড়ি’ তত্ত্বে।
এর উদ্ভাবক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তত্ত্বের অভিনবত্বে জনগণ নড়েচড়ে বসল। বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হলো, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি-বিবেচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহেব কার সমতুল্য আইনস্টাইন না নিউটনের। নাকি তাঁদেরকেও ছাড়িয়ে। কারণ এই তত্ত্বে ভার্টিক্যাল ও হরাইজেন্টাল এই দুই কাঠামোর বিস্ময়কর সিমুলেশন আছে। দুর্বল খাড়া খাম্বা আর তাতে কুচক্রীদের আড়াআড়ি ধাক্কাধাক্কি। ফল হুড়মুড় দুর্ঘটনা। কিছুদিন এ নিয়ে গরম গণমাধ্যম-সামাজিক নেটওয়ার্ক। মানুষ চমৎকৃত, হতবাক।
এরপর জনগণের জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন সংযোজন ‘তেঁতুলতত্ত্ব’। এই ফর্মুলার ভেষজ সংশ্লেষণে দেশের অর্ধেক মানুষ তেঁতুলে রূপান্তরিত। আর বাকি অর্ধেককে লালাসিক্ত হওয়ার প্রবল তাগিদ দিলেন হেফাজত আমির। তা না হলে বিরাট সর্বনাশ। তখন ছুটতে হবে হারবাল দাওয়াখানায় নিজেকে ফিট করার জন্য। এই একবিংশ শতকে তেঁতুলসদৃশ্য নারীসকল ঘরের বাইরে বের হবেন, কাজকর্ম করবেন- এ কী অসম্ভব কথা। তাদের দেখে লালা ঝরা শুরু হলে পুরুষরা অফিস-আদালত ফেলে অন্য কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাহলে দেশ এগোবে কী করে! অতএব হে নারী তোমরা ঘরে থাকো। আল্লামা শফী সাহেবের ভেষজতত্ত্বে জাতি লা-জবাব।
এরপর বাঙালির জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে এলো চুলতত্ত্ব। রাজনৈতিক ঘূর্ণিবাতাস উঠলে দুই নেত্রীর মধ্যে কার চুল আগে উড়ে যাবে, এ নিয়ে শুরু হলো প্রবল আঁচ-অনুমান। দুই নেত্রীর এ-সংক্রান্ত বাহাসে কোরাস ধরলেন অন্য নেতারাও। ফল এখনো অমীমাংসিত। এরই মধ্যে এসে গেছে চোখ আর কানতত্ত্ব। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেত্রীকে দ্রুত চোখের চিকিৎসা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। বিরোধী দলও বা বসে থাকবে কেন? দলটির নেতারা শেখ হাসিনার শ্রবণ শক্তি নিয়ে প্রবল সন্দিহান। তাঁরা অবিলম্বে তাঁকে কান বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়ার দাওয়াই দিয়েছেন। বাহাস চলমান। জনগণ অপেক্ষায়, তত্ত্বচর্চা আরো কতটা গড়ায়।
এবার বাঙালির দুয়ারে হাজির নতুন আরেক তত্ত্ব। এর উপজীব্য মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড খাড়া থাকাই সুস্থতার লক্ষণ। জাতির মেরুদণ্ড কতখানি খাড়া আছে সে বিতর্ক থাক, নির্বাচন কমিশনের যে তা নেই সে বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। ইদানীং তিনি বিভিন্ন জনসভায় নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন বলে অভিযুক্ত করছেন। যদিও সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচন বিশেষ করে পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করে ইসি বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। কেন? কারণ পাঁচটিতেই বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী। অবশ্য সরকারি দল পরাজিত হলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ, এ মাপকাঠি বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিযুক্ত নয় সব ক্ষেত্রে। সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থী বিজয়ী হলে তাঁকে তো কারচুপির দায়ে অভিযুক্ত করা সমীচীন নয়। তবে সিটি নির্বাচনগুলোয় ভালো ফল পেলেও খালেদা জিয়া কিন্তু ইদানীং ইসিকে কড়া ভাষায়ই মেরুদণ্ডহীন বলে চলেছেন। অর্থাৎ জেলিফিশ। এতে বেশ চটেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সবাই মেরুদণ্ডী প্রাণী, তারপরও জেলিফিশের সঙ্গে তুলনা? সে জন্যই ১৮ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী সাংবাদিকদের দেখিয়েছেন তাঁদের মেরুদণ্ড সোজাই আছে। ভিজ্যুয়ালি তাঁর এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে বিরোধী দল তা মানবে বলে মালুম হয় না। এরপর হয়তো তারা সব ইসি কর্মকর্তার মেরুদণ্ডের এক্স-রে রিপোর্ট চেয়ে বসতে পারে। এই খাড়া মেরুদণ্ডবিষয়ক বিতর্ক এখন বেশ জমজমাট। কয়েক দিন আগে এ-সংক্রান্ত বিতর্ক চলার সময় টিভি টক শো ছেড়ে রেগেমেগে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে এক সিনিয়র সাংবাদিককে। তাঁকে একজন প্রশ্ন করেছিলেন জাতি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াক তা কি তিনি চান না? তাহলে কেন ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ নিচ্ছেন?
নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন বলার পেছনে খালেদা জিয়ার কাছে একটা যুক্তি অবশ্য আছে। তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ বিএনএফ নামে একটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়ার উদ্যোগ বিষয়ে। বলা হচ্ছে, এই দলটি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার মতাদর্শের অনুসারী। বিএনএফ তাদের পোস্টারে বিএনপির প্রতীক, জিয়ার ছবি ও ১৯ দফাও ব্যবহার করছে। একটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন পেতে হলে কমপক্ষে ৫৯টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় তাদের কার্যালয় ও কমিটি দেখাতে হয়। কিন্তু দলটি তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিএনএফ নিবন্ধন পাচ্ছে না এ রকম একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বশেষ খবর হলো ৫৯ নয়, এখন ১২টি উপজেলা বা থানায় কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারলেই চলবে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সংবিধানসম্মত নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। এই শর্ত পূরণ করলে বিএনএফও নিবন্ধন পেতে পারে। এ নিয়ে কারো আপত্তি ধোপে টেকার কথা নয়, পাত্তা দেওয়াও উচিত নয়। তবে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, এই নিবন্ধন দেওয়ার উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে। উদ্দেশ্য যদি হয় বিএনপির একটি বি-টিম সরকারি উদ্যোগে দাঁড় করানো, সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া উষ্মা প্রকাশ করতেই পারেন। সরকারের তল্পিবাহক নয় আরপিওর সব নীতি-ধারা অনুসরণ করেই বিএনএফ সম্পর্কে ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে যত সবল-সতেজ মেরুদণ্ডই থাক না কেন, অনেকেই কিন্তু ইসিকে জেলিফিশই ভাববে।