তদন্তে দুর্বলতায় শাস্তি পাচ্ছে না অপরাধীরা

নাহিদ তন্ময়
২০০৪ সালের ২৭ জুন। খুলনার শান্তিধাম মোড়ে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালু। হত্যা মামলাটির সাত আসামি এরই মধ্যে খালাস পেয়ে গেছে। একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত করছে সিআইডি। নিহতের বড় ছেলে আসিফ কবীর দাবি করেন, হত্যা মামলায় পুলিশের তদন্তে দুর্বলতার কারণেই আসামিরা খালাস পেয়েছে। 
২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর। গজারিয়ার চরবলাকৈর গ্রামে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলামকে। সম্প্রতি ওই মামলায় ১৩ আসামিকে যাবজ্জীবন
দণ্ডাদেশ দিয়েছেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর এস এম রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্তে দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা প্রত্যাশা অনুযায়ী শাস্তি পায়নি। বাদীপক্ষ দাবি করেছে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে পুলিশ দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। সাক্ষী হিসেবেও পুলিশ ভুল লোকজনকে আদালতে উপস্থাপন করেছিল। এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালু কিংবা রফিকুল ইসলামের পরিবারই শুধু নয়, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতার কারণে প্রতিনিয়ত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্বজনরা। ৯৯ শতাংশ মামলার রায়ের পরই অসন্তোষ প্রকাশ করে বাদীপক্ষ। ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (ভারপ্রাপ্ত) শাহ আলম তালুকদারের মতে, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতার কারণে অধিকাংশ মামলার রায়ে অপরাধীরা শাস্তি পায় না। এদিকে অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়ার জন্য ঢালাওভাবে পুলিশ দায়ী_ এ কথা মানতে নারাজ পুলিশ। পুলিশের দাবি, অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী সংশ্লিষ্ট মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর। আদালতে বিচারকাজ চলাকালে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, পাবলিক প্রসিকিউটররা শক্ত অবস্থানে থাকেন না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতা এবং পাবলিক প্রসিকিউটরদের অদক্ষতায় ৯০ শতাংশ মামলাতেই আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (ভারপ্রাপ্ত) শাহ আলম তালুকদার সমকালকে বলেন, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতা এবং তথ্য-প্রমাণের অভাবে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মামলার আসামি খালাস পেয়ে যায়। বাকি মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অধিকাংশেই বাদীপক্ষের প্রত্যাশা অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তি হয় না। এর অন্যতম কারণ, সব সাক্ষীর আদালতে হাজির না হওয়া। তবে তিনি আদালতে মামলা প্রমাণ করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হলে সব পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে বলে মন্তব্য করেন। এ ক্ষেত্রে মামলার বাদীরও দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। একই সময় তিনি পাবলিক প্রসিকিউটরদের অদক্ষতার কথা অস্বীকার করেন।
পুলিশ দাবি করছে, আসামি খালাস পাওয়ার প্রধান কারণ সাক্ষী না পাওয়া। দেখা গেছে, ঘটনা সঠিক হলেও অনেক মামলায় সাক্ষী না পাওয়ায় আসামি খালাস পেয়ে যায়। মামলা করার সময় সাক্ষী যা বলে, বিচারের সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলে তার উল্টো। আবার যারা সাক্ষী হয়, তাদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। তাই প্রভাবশালী আসামিরা অনেক সময় টাকার বিনিময়ে তাদের পক্ষে নেয়, ভয়ভীতি দেখায়। আবার অনেক সময় সাক্ষী আসতেই চায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্তেও দুর্বলতা থাকে বলে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, মামলার বিবরণ তৈরি করা হয় মৌখিক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে। তদন্তও হয় সেভাবেই। খুব কম ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, দেশের নিম্ন আদালতে ২০১২ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৭০ শতাংশের বেশি ফৌজদারি মামলা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে টেকেনি। তাই অনেক ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর অপরাধ করেও আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কিছু মামলায় সাজা হলেও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে লঘু শাস্তি হচ্ছে আসামিদের। খালাস পেয়ে আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এর বড় উদাহরণ সাক্ষীর অভাবে একাধিক হত্যা মামলা থেকে খালাস পাওয়া পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কুমার বিশ্বাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের তত্ত্বাবধানে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পাঁচটি কোর্টের এক বছরের (২০১১) মামলা নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ হাজার ৩৪৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৮০টিতে আসামিরা শাস্তি পেয়েছে। খালাস পেয়েছে ১ হাজার ৫৪৮টি মামলার আসামি। এ ছাড়া ৪৮৮টি মামলা খারিজ হয়ে গেছে এবং ৩ হাজার ৩০টি মামলা শেষ পর্যন্ত চলেনি।
সমকালের সঙ্গে আলাপকালে শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ৯০ শতাংশ মামলাতেই যে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ পুলিশের তদন্তে দুর্বলতা এবং পাবলিক প্রসিকিউটরদের অদক্ষতা। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের কারণে পাবলিক প্রসিকিউটরদের এ অদক্ষতা আরও প্রকট হয়েছে। তাদের দায়িত্বহীনতা এবং অদক্ষতার কারণেই আসামিরা মামলা থেকে খালাস পেয়ে যায় অথবা তুলনামূলক কম শাস্তি পায়। তিনি বলেন, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষী হিসেবে দুর্বল এবং স্থায়ী ঠিকানাবিহীন লোকজনকে উপস্থাপন; এজাহার ও চার্জশিটে অসঙ্গতি অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়ার পেছনে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। তিনি আরও বলেন, ফৌজদারি মামলার বিচারে এজাহার অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই বিচারকালে এজাহারে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তা আর সাধারণত সংশোধন করা যায় না। এজাহারের ওপর মামলার ভাগ্য অনেকখানি নির্ভর করে। কিন্তু আমরা একটি শক্তিশালী এবং নিরেট এজাহার নিশ্চিত করতে পারছি না।
পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার মনে করেন, নির্দিষ্ট বিধিবিধান মেনে পুলিশ মামলার তদন্ত করে। আমি মনে করি, পুলিশ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করে। তার পরও যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ থাকে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে হবে। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মনে করেন, পুলিশের তদন্তে দুর্বলতা, পাবলিক প্রসিকিউটরদের অদক্ষতা এবং অসচেতনতায় অধিকাংশ মামলায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এলিনা খান বলেন, বর্তমান সময়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় সমঝোতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, টাকা-পয়সার বিনিময়ে আসামিপক্ষ ও বাদীপক্ষ সমঝোতা করে। পরে আদালতে সমঝোতার তথ্য গোপন করে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় সাক্ষীরা। এ কারণে আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। পুলিশ ও প্রসিকিউটররা আসামিপক্ষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়েও অনেক সময় মামলা দুর্বল করে দেন।
রেটিং দিন :