তবু নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে বিএনএফ

রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রায় অস্তিত্বহীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দফা তদন্তে বিএনএফের প্রয়োজনীয়সংখ্যক জেলা ও উপজেলা কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদন এসেছে। এর ভিত্তিতে দলটিকে নিবন্ধন দিতে ইসি প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর আগে দলটির দেওয়া তালিকা ধরে নির্বাচন কমিশন দুই দফায় তদন্ত করে বেশির ভাগ জেলা-উপজেলায় বিএনএফের কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। এরপর দলটিকে আবার সুযোগ দিতে তৃতীয় দফা তদন্ত করা হয়। তবে এ পর্যায়ে ইসি নিজ কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা রাখেনি। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় সংশ্লিষ্ট জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে। কমিটি গত ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনএফের দেওয়া তালিকা ধরে ২১ জেলায় তদন্ত করে।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, কথিত রাজনৈতিক দলটির নিবন্ধন নিশ্চিত করতে আর মাত্র ১২টি উপজেলায় দলীয় কার্যালয় ও কমিটির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে। ইতিমধ্যে ১৫টি জেলা থেকে তদন্ত প্রতিবেদন ইসিতে পৌঁছেছে, তাতে সাত জেলায় ১২টির বেশি উপজেলা কার্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ইসির তদন্তে বিএনএফের কার্যালয় পাওয়া গেছে—রাজধানী ঢাকাসহ এমন সাত জেলায় প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে কেবল রাজবাড়ীতে কার্যালয়ের হদিস পাওয়া গেছে। ঢাকা, গাজীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বরগুনা ও বান্দরবানে বিএনএফের কার্যালয়ের অস্তিত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রথম আলোর রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ী শহরের পান্না চত্বরে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগমের শ্বশুরবাড়িতে বিএনএফের জেলা ও সদর উপজেলা কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। জাহানারা বেগম বিএনএফের কো-চেয়ারম্যান। গত ১৯ জুন ১০১ সদস্যবিশিষ্ট জেলা কমিটি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এতে সহসভাপতি হিসেবে সঞ্জয় কুমার ভৌমিকের নাম উল্লেখ আছে। সঞ্জয় কুমার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যে সহসভাপতি, তা এই প্রতিবেদকের কাছে প্রথম শুনছেন। তিনি জানতেন যে তাঁর ছোট ভাইকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। তিনি এখন ভাইয়ের নাম কাটানোর চেষ্টা করছেন।

ইসির তৃতীয় দফা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মিরপুর (৬৮০/২ পূর্ব মণিপুর), পল্লবী (৫ আলতাফ সুপার মার্কেট, রোড-৩, মিরপুর-১০) ও কাফরুলে (৪৮১/৪ উত্তর ইব্রাহীমপুর) বিএনএফের কার্যালয় রয়েছে। এই প্রতিবেদক তিনটি ঠিকানায় গিয়ে বিএনএফের কোনো কার্যালয় পাননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার জেলা নির্বাচন অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অযথা খুঁজে লাভ নেই। বাস্তবে বিএনএফের কোনো অফিস খুঁজে পাবেন না।’

বিএনএফের প্রধান সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদের কাছে কার্যালয়ের হদিস জানতে চাইলে বলেন, ‘যেখানে অফিস ছিল, সেখানে এখন আর অফিস খুঁজে পাবেন না। তদন্তের আগে আগে আমরা সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছিলাম, তদন্ত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে ফেলেছি।’ তাঁর দাবি, বিএনএফের সাইনবোর্ড দেখলে বিএনপি হামলা করে, সে জন্য এই কৌশল গ্রহণ করেছেন তাঁরা।

প্রথম আলোর বরগুনার নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, তৃতীয় দফা তদন্ত প্রতিবেদনে বরগুনার সোনাখালী বাজারের একটি ঘরকে বিএনএফের জেলা ও সদর উপজেলা কার্যালয় এবং এ কে স্কুলসংলগ্ন মতিয়ার রহমান নামের এক ব্যক্তির বাড়িকে বিএনএফের আমতলী উপজেলা কার্যালয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে কোনো কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার কাপাসিয়া উপজেলার বরুণ রোডে এবং কালিয়াকৈর উপজেলার রতনপুর তালতলীর মাঠের পাশে মজিবুর রহমান সরকারের মার্কেটে বিএনএফের দপ্তর আছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে উল্লিখিত ঠিকানায় বিএনএফের কোনো কার্যালয় পাওয়া যায়নি।

সিলেট প্রতিনিধি জানান, সিলেট মহানগরের সুরমা মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৪ নম্বর কক্ষকে বিএনএফের জেলা ও মহানগর কার্যালয় এবং বিশ্বনাথের মাদ্রাসা মার্কেটে উপজেলা কার্যালয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু এসব ঠিকানায় বাস্তবে এমন কোনো কার্যালয় পাওয়া যায়নি।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, নির্বাচন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার আলীকদম ও লামায় বিএনএফের অফিস রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিএনএফের লামা উপজেলা কমিটির সভাপতি ফরিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা থেকে টাকা ও আসবাব দেওয়া হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কিছু না দেওয়ায় লামায় কোনো কার্যালয় ও কমিটি করতে পারেননি।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ইসির দেওয়া তথ্যে বিএনএফের সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয় রয়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার মদনপুর গ্রামে। সরেজমিনে দেখা যায়, মদনপুর গ্রামে মহাসড়কের পাশেই আল-হাবিব রাইস ও মসলা মিল। এই চালকলের একটি আধা পাকা ঘরের চালে বিএনএফের জেলা ও সদর উপজেলা কার্যালয় লেখা সাইনবোর্ড রয়েছে।

বিএনএফের সুনামগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক আরশ আলী খান ভাসানী দাবি করেন, ‘আমরা প্রকাশ্যে না থাকলেও তলে তলে কাজ করছি। বিএনপির জ্বালায় জেলা শহরে উঠতে পারছি না। তাই শহরের বাইরে অফিস ভাড়া নিয়েছি।’

ইসির তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রথম আলোর সরেজমিন অনুসন্ধানের এই অমিল সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, এর আগে দুই দফা তদন্ত হয়েছিল। তাতে ইসির কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিএনএফ প্রশ্ন তোলে। সে জন্য এবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা তথ্য কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি করে তদন্ত করা হয়েছে। তাই এই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ কম।

তবে ইসি সূত্র জানায়, বিএনএফকে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকে ইসির ওপর চাপ রয়েছে। সে জন্য কমিশন তৃতীয় দফায় তদন্তের কাজটি নিজেদের কর্মকর্তাদের দিয়ে না করিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের দিয়ে করিয়েছে। যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এভাবে সুযোগ দেওয়ার বিধান নেই।