তাজরীনের মালিক দেলোয়ারের আরেক কাণ্ড

গোপনে পোশাক কারখানার সব যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়েছেন। পাওনা প্রদান ছাড়াই ছাঁটাই করতে চেয়েছেন শ্রমিকদের। আর ঈদের ঠিক আগেই কাণ্ডটি করেছেন তুবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেন।

আর এসব অভিযোগে ও বেতন-বোনাস প্রদানসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল শনিবার সকাল থেকে দেলোয়ার হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন তাঁরই কারখানার পোশাকশ্রমিকেরা। সকাল আটটা থেকে উত্তর বাড্ডায় হোসেন মার্কেটের পোশাক কারখানায় তাঁকে আটকে রাখা হয়। গতকাল রাত ১২টার দিকে শেষ খবর নেওয়া পর্যন্ত তিনি অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।

এই তুবা গ্রুপেরই প্রতিষ্ঠান ছিল আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। গত নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগে মারা যান ১১২ জন শ্রমিক।

আহত ব্যক্তিদের অনেকে এখনো কর্মক্ষমহীন অবস্থায় আছেন। আর এই তুবা গ্রুপের মালিকই হচ্ছেন অবরুদ্ধ হয়ে থাকা দেলোয়ার হোসেন। মালিকের অবহেলায় তাজরীনের শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হলেও দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। তাঁর পক্ষে সাফাই গেয়েছে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সেই দেলোয়ার হোসেনই আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে ঘটালেন নতুন এ কাণ্ড।

দেলোয়ার হোসেন যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বোনাস দেওয়ার জন্য যন্ত্রপাতি বিক্রি করেছি, চাকরিচ্যুতির জন্য নয়।’ বিক্ষোভের আশঙ্কায় যন্ত্রপাতি বিক্রির কথা তিনি শ্রমিকদের জানাননি।

গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উত্তর বাড্ডার হোসেন মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, চারতলার দুটি কলাপসিবল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকেরা। দুই শতাধিক শ্রমিক ভেতরে অবস্থান করছেন। বাইরেও সমপরিমাণ শ্রমিক। চারতলার একটি ছোট কক্ষে বসে ছিলেন দেলোয়ার হোসেন। কিছুক্ষণ পরপর কক্ষে ঢুকে শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তাঁর কাছে পাওনা আদায়ের দাবি জানাচ্ছেন।

দেখা গেছে, হোসেন মার্কেটের চতুর্থ তলা থেকে ১২ তলা পর্যন্ত দেলোয়ারের মালিকানাধীন তিনটি পোশাক কারখানা। সেগুলো হলো তাইফ ডিজাইনস, মিতা ডিজাইনস ও তুবা টেক্সটাইল লিমিটেড। এ তিন কারখানায় অন্তত এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন।

শ্রমিকেরা প্রথম আলোকে বলেন, গত শুক্রবার তাঁরা কারখানায় বেলা তিনটা পর্যন্ত কাজ করেছেন। তিনটার পর ছুটি দিয়ে বলা হয়, শনিবার বেতন দেওয়া হবে। এর আগে ১০ অক্টোবর এক দফা বেতন দেওয়া হলেও অনেকেই তা পাননি। বাকিদের বেতন দেওয়ার কথা ছিল কাল। কিন্তু সকাল আটটার দিকে শ্রমিকেরা কারখানায় গিয়ে দেখেন, চারতলা ও ছয়তলায় থাকা সব যন্ত্রপাতি উধাও। সাড়ে আটটার দিকে মালিক দেলোয়ার হোসেন চারতলায় এলে তাঁর কাছে কারণ জানতে চাওয়া হয়। তখন দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিক্রি করে দিয়েছি। আমার কিছু করার নাই। তোমরা চাকরি খোঁজো।’ বেতন-বোনাসের কথা বললে তা দিতেও অস্বীকৃতি জানান তিনি।

তাইফ ডিজাইনসের একজন নারী শ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, মালিকের মুখে এ কথা শোনার পর সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। মালিক তখন পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার, রাস্তায় নামলে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার হুমকি দেন। এরপরই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা মালিককে রুমের ভেতরে আটকে রাখেন।

শ্রমিকেরা আরও জানান, শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করলে কৌশলে কারখানায় আগুন লাগার সংকেত দেন মালিকপক্ষের লোকজন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে হুড়াহুড়ির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে দেলোয়ার হোসেন তাঁদের হুমকি দেন, নিজেই নিজের কারখানায় আগুন লাগিয়ে শ্রমিকদের ফাঁসিয়ে দেবেন। শ্রমিকেরা বলেন, মালিক যদি কোনো শ্রমিক না চান, সমস্যা নেই। কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী সব পাওনা পরিশোধ ও ক্ষতিপূরণ দিলেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। না হলে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হবে।

ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে কয়েকজনকে নিয়ে বসে আছেন দেলোয়ার হোসেন। সাংবাদিক পরিচয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবরুদ্ধ আছি ভাই।’ যন্ত্রপাতি বিক্রির ব্যাপারে জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেনের দাবি, ‘বোনাস দেওয়ার জন্য বিক্রি করেছি। এ ছাড়া চারতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত কারখানা আমরা সাততলা থেকে ওপরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কাউকে চাকরিচ্যুত করব না।’

শ্রমিকদের না জানিয়ে বিক্রি করলেন কেন—এ প্রশ্ন করলে দেলোয়ার বলেন, ‘হাউকাউ করবে, তাই বলিনি।’ ‘সমাধান কী?’ দেলোয়ার হোসেনের উত্তর, ‘সবার বেতন দিয়েছি। কয়েকজনের বাকি আছে। আজ বোনাস দেওয়ার কথা ছিল না। যেহেতু আন্দোলন করছে, সে জন্য আজ (গতকাল) বোনাস দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ তবে মুখে বললেও গতকাল রাতে বোনাস দেওয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

দেলোয়ার হোসেনের এমন উত্তরের পরপরই ওই কক্ষে ঢোকেন জনা বিশেক শ্রমিক। তাঁরা দেলোয়ার হোসেনকে বলেন, ‘শুধু বোনাস দিলে হবে না, সব পাওনা দিতে হবে।’

‘খাওয়া-দাওয়া করতে পেরেছেন?’ জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকেরাই খাবার এনে দিয়েছেন। এ রকম করলে জানলে খাবার খেতাম না।’ কক্ষের বাইরে একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘আমরা শ্রমিক। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারি। উনি মনিব। জ্বালা সহ্য করতে পারবেন না বলে খাবার সরবরাহ করেছি। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় নাই। শুধু বোনাস দিয়ে পার পাওয়া যাবে না।’

এ সময় কয়েকজন শ্রমিকনেতাও উপস্থিত ছিলেন। গতকাল রাত ১২টার দিকে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে দুই তলার যন্ত্রপাতি বিক্রি করা হয়েছে, দু-এক দিনের মধ্যে সেখানে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে শ্রমিকদের আবার কাজের ব্যবস্থা করা হবে। নইলে আইন অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে তিনি অবরুদ্ধই থাকবেন।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করার জন্য দেলোয়ার হোসেনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আর হঠাৎ করে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতি করাও আইনসংগত নয়। চাকরিচ্যুতি করতে হলে আইন অনুযায়ীই করতে হবে।’