তালাক বললেই হিল্লা বিয়ে, নয়তো গ্রামছাড়া

হিল্লা বিয়ের ‘ফতোয়া’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চকজোড়া গ্রামের মানুষ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদে রাগের মাথায় তালাক শব্দ উচ্চারণ করলেই ওই দম্পতির ওপর নেমে আসছে সমাজপতিদের ‘ফতোয়া’। হিল্লা বিয়েতে রাজি না হলে করা হচ্ছে সমাজচ্যুত। একাধিক দম্পতিকে গ্রামও ছাড়তে হয়েছে।

দক্ষিণ চকজোড়া গ্রামের এই সমাজপতিদের একটি সংগঠনও আছে, নাম ‘একতাবদ্ধ সমাজ’। গ্রামের প্রায় ১০০ ঘরের লোককে ওই সমাজের ‘ফতোয়া’ মানতে হয়। গ্রামের একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, গত ১৭ বছরে মাতবরদের ‘ফতোয়া’র শিকার হয়েছেন অন্তত ২০ দম্পতি।

সর্বশেষ ‘একতাবদ্ধ সমাজের’ হিল্লা বিয়ের ‘ফতোয়া’ না মানায় গ্রামের আখতার হোসেন ও ঝরনা বেগম দম্পতিকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।

হিল্লা বিয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালত-১-এর সরকারি কৌঁসুলি মন্তেজার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ এর ১ ও ২ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি রাগের বশে স্ত্রীকে তালাক দেন এবং পরে তিনি ভুল বুঝতে পারলে সেই তালাক কার্যকর হবে না। আবার আইনে বলা হয়েছে, তালাক দিতে হলে কাজি অফিসের মাধ্যমে স্ত্রীর কাছে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশ নিষ্পত্তি হলে ৯০ দিনের মধ্যে তালাক কার্যকর হবে। এমনকি তালাকের এক মাসের মধ্যে কেউ স্ত্রীকে নিতে চাইলে সে ক্ষেত্রেও হিল্লার প্রয়োজন পড়বে না। তিনি বলেন, হিল্লা বিয়েতে বাধ্য করা হলে এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

মাতবরদের চাপে গ্রামছাড়া: হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় চকজোড়া গ্রাম ছেড়ে পাশের সাজাপুর পশ্চিমপাড়ায় আশ্রয় নিতে হয়েছে শফিকুল ইসলাম ও শাহিনূর বেগম দম্পতিকে। গত বুধবার তাঁদের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ট্রাকচালক শফিকুল বাইরে গেছেন। স্ত্রী শাহিনূর বলেন, ২০০২ সালে ঝগড়ার একপর্যায়ে শফিকুল রাগের বশে তালাক শব্দ উচ্চারণ করে। মাতবরেরা ডেকে তাঁদের হিল্লা বিয়ের কথা বলেন। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের ‘একঘরে’ থাকতে হবে, নয়তো গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে। গ্রামের লোকজন তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, ওঠাবসাসহ সব বন্ধ করে দেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা চকজোড়া গ্রাম ছেড়ে পাশের সাজাপুর গ্রামে চলে আসেন।

একই কারণে গ্রাম ছেড়েছেন আবদুস সামাদ ও জয়নব বেগম দম্পতি। একই রকম ঘটনায় গ্রামের মাতবরেরা ফতোয়া দেন, হিল্লা বিয়ের মাধ্যমে তাঁদের শুদ্ধ হতে হবে। সমাজচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণার একপর্যায়ে তাঁরা গ্রাম ছেড়ে উপজেলা সদরে এসে আশ্রয় নেন। কিন্তু মাতবরেরা সামাদের কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। প্রায় ছয় বিঘা জমি অনাবাদি হয়ে যায়। পরে তাতে গাছ লাগান সামাদ।

‘হিল্লায় বুকটা ফেটে যায়’: ১৯৯০ সালের দিকে কৃষক আবদুল মান্নান (৪০) ও বেলী বেগমের (৩২) বিয়ে হয়। এক বছরের মাথায় একটি ছেলে হয়। ছেলের বয়স যখন প্রায় পাঁচ বছর, ঠিক তখনই ঘটে চরম বিপত্তি। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে দুই চোখ ছলছল করে ওঠে মান্নানের। তিনি বলেন, ‘একদিন দুপুরে খেত থ্যাকে বাড়িত অ্যাসে দেকি বউ থালত ভাত বাড়েনি। রাগের মাথাত বউকে গালাগালি করি। বউও জবাব দেয়। হামার মাথাত রক্ত ওঠে যায়। বলি, বউকে ‘তালাক’ দিবো। কেমন করে সেই কথা লোকজনের কানে যায়। মাতবর আবদুল হামিদ, সামাদ মিয়া অনেকেই ফতোয়া দেন। শুনে হামার মাথায় বাজ পড়ে। বগুড়া শহরের এক মাওলানার কাছে যাই। তিনি বলেন, “রাগের মাথায় তালাক দিলে ধর্মীয় মতে তালাক হয় না, সমাজ মেনে নিলে বউকে নিয়ে ঘর করতে বাধা নাই।’’ মাওলানা সাহেবের কথা গ্রামে এসে মাতবরদের বলি। কিন্তু তাঁরা মানে না। বাধ্য হয়ে অন্যের সাথে হিল্লার পর বউকে ঘরে তুলি। সে কথা মনে হলে এখনো রাগে-ক্ষোভে বুকটা ফেটে যায়।’

এবার একঘরে আখতার-ঝরনা দম্পতি: আট বছর আগে চকজোড়া গ্রামের দরিদ্র আখতার হোসেনের সঙ্গে পাশের সাবরুল ইউনিয়নের বাগনাপাড়া গ্রামের ঝরনা বেগমের বিয়ে হয়। আখতারের মা আসমা বেওয়া বলেন, গত ১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঝগড়ার একপর্যায়ে বউকে তালাক দেয় আখতার। বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে দুজনে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। ঝরনা বাপের বাড়ি যাবে না, আখতারও ওকে ছাড়বে না।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু মাতবরেরা হিল্লার ফতোয়া দেন। হিল্লাতে রাজি না হওয়ায় বর্তমানে দুই ছেলেসহ আমাকে একঘরে করে রেখেছে মাতবরেরা।’

আখতার হোসেন বলেন, ‘মাতবর আবদুল হামিদ, বেলাল হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, রাজ্জাকসহ অনেকের কাছে মাসের পর মাস ধরনা দিচি। সগলির এক কথা, ‘‘তোর বউ তালাক হচে’’। কোনো উপায় না পেয়ে চাচা ও পাড়ার মসজিদের ইমাম শহীদুল ইসলামের কাছে ছুটে গেছি। চাচা মাতবরদের সাথে সুর মিলিয়ে বলেছেন, ‘‘হিল্লা বিয়্যা লাগবে না—এই ব্যাপারে তুই কোনো মাওলানার কাছ থেকে লিখিত কাগজ লিয়ে আয়, কিন্তু কেউ লিখিত কাগজ দেয় না।’’’

আখতার বলেন, ‘সামাজিকভাবে হামাগরক নিষিদ্ধ করায় ভয়ে আছি। কারণ, মায়ের বয়স হয়েছে। মৃত্যুর পর কেউ তো জানাজাও পড়বে না। এই ভয়ে গ্রামের মাতবর, ইমাম, মেম্বার-চিয়ারম্যান সবার কাছে গেছি। কোনো উপায় না পেয়ে শেষে ব্র্যাককে জানিয়েছি।’

জানতে চাইলে ‘একতাবদ্ধ সমাজের’ প্রধান আবদুল হামিদ বলেন, সমাজের ১০ জন যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই মেনে চলতে হবে। আখতার সমাজের নির্দেশ মানেননি, তাই তাঁকে আলাদা থাকতে বলা হয়েছে।

ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির বগুড়া জেলা ব্যবস্থাপক বিপুল সিংহ বলেন, গত আট মাসে শুধু শাজাহানপুর উপজেলাতেই চারটি ফতোয়া ও হিল্লা বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। আখতার-ঝরনা দম্পতির অভিযোগ প্রশাসন আমলে না নিলে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আদালতে মামলা দেওয়া হবে।

যোগাযোগ করা হলে শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল আলম বলেন, বৃহস্পতিবার আবদুল হামিদসহ অন্যান্য মাতবর ও ফতোয়ার শিকার আখতার হোসেনকে থানায় ডেকে আনা হয়। মাতবরেরা থানায় মুচলেকা দিয়েছেন যে তাঁরা আর ভবিষ্যতে এ রকম হিল্লা বিয়ের ফতোয়া দেবেন না।