তিন বাধা দূর হলে একক নির্বাচন

আগামী সংসদ নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোটগ্রহণ, আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায় করাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এখন একমাত্র লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পারলেই নির্বাচনে সার্বিক সাফল্য অর্জন সম্ভব বলে দলটি মনে করছে। সে ক্ষেত্রে কে নির্বাচনে এলো আর কে এলো না, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হবে না। এ নিয়ে জোর চেষ্টাতদবির ও প্রস্তুতি চলছে দলটিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। আর এ মাসের মধ্যেই এ তিনটি বিষয়ে সুফল মিলবে বলে মনে করছেন শাসকদলের নেতারা।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আগামী নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করতে হবে। ভোটার উপস্থিতি কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে একটি জরিপকাজও চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ভোটারদের কিভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, এর পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলেন, একতরফা নির্বাচন হোক আর বিএনপিকে সঙ্গে নিয়েই নির্বাচন হোক, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটারদের যথেষ্ট উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে আমাদের কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী কমিটি করার কাজ চলছে। এদের একমাত্র কাজই হবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা।’
সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে সেই নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটিগুলোকে। তাই নির্বাচনের আগে এসব কমিটি গঠন শেষ করতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা। সভাপতিমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, ৫৫ ভাগ ভোটার ভোট দিলেই ওই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে অবশ্যই সমর্থ হবে। তাই ভোটার উপস্থিতি কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
জানা গেছে, নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক পাঠাবে না ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল- এমন একটি অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। তাদের এ অবস্থান থেকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এই কুটনীতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত আছেন বলে দলের কয়েকজন নেতা নিশ্চিত করেছেন। ই-মেইল ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব যোগাযোগ চলছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচন হলে সচরাচর পর্যবেক্ষক পাঠায়- এমন দেশগুলোকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বোঝানো হচ্ছে যে বর্তমান সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে এ নির্বাচনকে অর্থবহ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা আশা করছে সরকার।
সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের সর্বশেষ অধিবেশনে সরকারপ্রধান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হসিনা বিশ্ব নেতাদের কাছে অঙ্গীকার করেছেন যে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে তাঁর সরকার অনমনীয়। এ ক্ষেত্রে যা যা করণীয়, তার সবই সরকার করবে। সূত্র জানায়, তাঁর এ দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ অন্য দেশগুলোও সমর্থন জানিয়েছে। তবে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গুরুত্বারোপ করেছে আন্তর্জাতিক মহল। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চায় সরকার।
শেখ হাসিনার সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র সফর ফলপ্রসূ হয়েছে দাবি করে শেখ হাসিনার সঙ্গে ওই সফরে ছিলেন এমন এক নেতা বলেন, ‘এর ফলে বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন শেখ হাসিনা। তাই বিএনপি নির্বাচনে না এলেও যেকোনো মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ। দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, বিএনপির সর্বশেষ অবস্থান যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বহালের দাবিই থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ সেই দাবি মেনে নেবে না। আর সেই দাবি যেহেতু মানা হবে না, তাই বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন হবে।’
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। কে এলো আর কে এলো না, তার জন্য নির্বাচন বন্ধ থাকবে না।
‘বক্তৃতা-বিবৃতিতেও দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা একই রকম সুরে কথা বলছেন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে আওয়ামী লীগ একাই নির্বাচন করবে।’ গত ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে যুবলীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে বাধ্য হচ্ছি, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’