দায়িত্বহীন রাজনীতি…এ কে এম শাহনাওয়াজ

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিহীন রাজনীতিতে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা কার্যত জনগণের প্রতি কোনো দায় অনুভব করেন না। তাই চলায়, বলায় ও আচরণে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। মানুষ কী ভাবল না-ভাবল- এসব থোড়াই কেয়ার করেন। নেতা-নেত্রীরা স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্ব হারিয়ে নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিকে বালখিল্যসুলভ করে তোলেন। এর প্রামাণ্য উদাহরণ বাংলাদেশের একালের রাজনীতিতে ভূরি ভূরি মিলবে। কিন্তু জাতির এক ক্রান্তিকালে এবং দম বন্ধ করা উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার সময়ে সমগ্র জাতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকে উপেক্ষা করে ২৫ অক্টোবর দুপুর থেকে অতিক্রান্ত সন্ধ্যা পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর মধ্যে টেলিফোন সংলাপের দুই পর্বের নাটক মঞ্চস্থ হলো।

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তার বন্ধু ১৮ দলের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান ছিল। সংকট সূচনাকারী হচ্ছে শাসকদল। দলের ভেতর ও বাইরের আচরণে গণতন্ত্রের শত অভাব থাকার পরও হঠাৎ অনেক বেশি গণতন্ত্রী হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। ক্ষমতাপ্রিয় দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অগণতান্ত্রিক আচরণ প্রায় একই। লক্ষ্য কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার অধীশ্বর হওয়া। এ কারণে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা, বিবাদ ও অবিশ্বাস প্রচণ্ড। এই অবিশ্বাসের কারণেই একবার আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে অগণতান্ত্রিক সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনাকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করায়। এই ব্যবস্থার আওতায় তিনটি জাতীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও অবিতর্কিত থাকেনি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোতে অমন ব্যবস্থা চিরকালের জন্য রাখা সম্ভব নয়। তবে এটিও সত্য, যে অবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এটি বাতিল করতে হলে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে করাটাই সমীচীন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবক্তা আওয়ামী লীগ সরকার সে পথে হাঁটল না। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। সম্ভবত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই নিরাপদ বোধ করে আওয়ামী লীগ। তাই তারা আদালত ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে আসন্ন নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে বলেই জানিয়ে দেয়। যেহেতু বড় দুই দলের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো প্রবল, তাই বিএনপি ও এর জোটবন্ধুরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে তোলে।

দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতির ময়দানের এই জমাট বরফ গলানো জরুরি ছিল। দেশের নাগরিকসমাজ, বিদেশি রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও আহ্বান ও চাপ আসতে থাকে দুই দলের মধ্যে সংকট নিরসনে সংলাপে বসার জন্য। যদিও সংলাপের অতীত সাফল্য খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না, তবু অগত্যা সাধারণ মানুষ সংলাপের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে ২৫ অক্টোবর রাজধানীতে বিএনপি ও এর জোটবন্ধুদের পক্ষ থেকে জনসভা ডাকা হয়। এর ওপর সর্বাধিক সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রাখে সরকার। কারণ এর মধ্যে দু-দুবার ঢাকা অবরোধ করে সরকার পতনের মহড়া দিয়েছে বিএনপি-জামায়াত। একবার ঢাকা অবরোধের ডাক দিয়ে, আরেকবার হেফাজতে ইসলামের ঘাড়ে চড়ে। অনেক কষ্টে এই দুই অপচেষ্টা সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছিল। তাই আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি সরকার। নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। বিএনপি-জামায়াত জোটও তাদের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। এভাবে সাধারণ মানুষের মনে জমাট বাঁধতে থাকে আশঙ্কার মেঘ। দেশ-বিদেশ থেকে সংলাপের জন্য চাপও বাড়তে থাকে একইভাবে। একপর্যায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে টেলিফোনে কথাবার্তা হয়। একে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অতীত অভিজ্ঞতায় দেশবাসী আশ্বস্ত হতে পারেনি। কারণ যে যত কথাই বলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত দুই দলের একক ক্ষমতাধর দুই নেত্রীর কথা ছাড়া গাছের পাতা নড়বে না- এ সত্য সবার জানা। তাই সংলাপ হতে হবে দুই নেত্রীর মধ্যে। কিন্তু এটি প্রায় অসম্ভবই মনে হয়েছে দুই নেত্রীর জন্য। দীর্ঘ সময় পরস্পরের মধ্যে বাক্যালাপ নেই। একজন আরেকজনের ছায়াও মাড়ান না। বক্তৃতার মঞ্চে একে অন্যের সমালোচনায় মুখর থাকেন। তাহলে এমন দুই নেত্রী মুখোমুখি সংলাপে বসবেন কেমন করে। তার পরও মানুষ দুই নেত্রীর সংলাপের জন্য আশা নিয়ে বসে থাকে।

আশা ছিল, ২৫ অক্টোবরের আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে কথা বলবেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। সংলাপের জন্য আহ্বান জানাবেন। যার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে খালেদা জিয়ার জনসভায়। সাধারণ মানুষ জামায়াত-বিএনপির ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির হাত থেকে রেহাই পাবে। ২৫ অক্টোবর দুপুর থেকে ধারণা পাচ্ছিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় টেলিফোন করবেন। শেষ পর্যন্ত টেলিভিশন চ্যানেলের স্ক্রলে দেখা গেল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আধা ঘণ্টা ধরে লাল টেলিফোনে খালেদা জিয়াকে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু ওপাশ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

দুটি কারণে বিষয়টি নিয়ে মানুষ খুব ধন্দে পড়ল। প্রথমত. আধা ঘণ্টা ধরে কেন কষ্ট করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। টেলিফোন না ধরার কারণ জানা কি খুব কঠিন ছিল? লাল টেলিফোন ছাড়াও তো বিকল্প পথ ছিল। যে পথে সন্ধ্যায় কথা বলেছেন। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিবের বরাত দিয়ে টেলিফোনে না পাওয়ার সংবাদটি বারবার স্ক্রলে দেখানো হচ্ছিল।

জাতির বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাখা প্রস্তাব নিয়ে সংলাপে বসা উচিত ছিল খালেদা জিয়ার। আলোচনার টেবিলে তাঁদের দলীয় দাবিগুলো উত্থাপিত হতে পারত। সংলাপে বসে দরকষাকষি করে একটি ঐকমত্যে পৌঁছার এটাই তরিকা। সে পথে না হেঁটে পাল্টা প্রস্তাব রাখলেন খালেদা জিয়া। বিগত দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে ২০ জন উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাবে পরিসংখ্যান ও বিধিবিধান অনুযায়ী ছিল বিভ্রান্তিতে ভরা।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের উদ্ধৃতি থেকে জানা গেল, আইনের বিধানে সত্তর বছর হয়ে গেলে কেউ উপদেষ্টা হতে পারেন না। তাঁর ভাষায় এই সাবেক উপদেষ্টাদের অনেকেই সত্তর পেরিয়ে গেছেন।

এসব দেখে অতি আশাবাদী আমিও সংলাপের ভরসা পাচ্ছি না। আমার রসিক সহকর্মী সহমত পোষণ করে বললেন, সংলাপ তো হবে না। যা হবে তা হচ্ছে ‘সঙলাপ’।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়