‘দা-কুড়াল’, ‘গোলন্দাজ বাহিনী’ কার উদ্দেশ্যে?..কাবেরী গায়েন

বাঙালি হিন্দু-মুসলিম এক দিনের ব্যবধানে পালন করল বড় দুই ধর্মীয় উৎসব—শারদীয় দুর্গাপূজা আর পবিত্র ঈদুল আজহা। দুই উৎসবই অন্তরের অসুরকে বিনাশ কিংবা কোরবানি করে ন্যায় আর সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়ে যায়। অথচ এ দুই উৎসবের আগে-পরে সারা দেশের মানুষের মনে ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ সেঁটে দিয়েছে কিছু রাজনৈতিক হুংকার। উৎসবের ভেতরে-বাইরে যেখানেই গেছি, সবার মুখে একই আলোচনা, কী যে হবে ২৫ অক্টোবরের পরে! পরীক্ষার্থীরা আতঙ্কে আছে, পরীক্ষা হবে তো! সীমান্তবর্তী এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভেতরে বাড়তি আতঙ্ক, ‘বাঁচতে পারব তো?’ বিয়েবাড়িতে, হাসপাতালে, দর্জির দোকানে, রিকশাওয়ালার মুখে, বিমানবন্দরে—আতঙ্ক সবখানে। এ কেমন রাজনীতি? সাধারণ মানুষের ভেতরে ত্রাস সৃষ্টি করে কোন রাজনীতি জিতেছে কবে? দুঃখের বিষয় হলো, যাঁরা ত্রাস সৃষ্টি করছেন, তাঁরাও নির্ভয়ে নেই। বিএনপির নেতারা আতঙ্কে আছেন গ্রেপ্তার হওয়ার, আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাদের ভেতরেও ভীতি, ‘কী যে হবে শেষ পর্যন্ত!’
কোন ব্যবস্থায় নির্বাচন হবে, নির্বাচন আদৌ হবে কি না—এ নিয়ে উৎকণ্ঠার শেষ নেই সারা দেশে। বাড়তি যুক্ত হয়েছে বিএনপির ২৫ অক্টোবরের কর্মসূচি ও সরকার পতনের ডাক। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকারের যেকোনো কাজের সমালোচনা করা যেমন বিরোধী দলের হক, তেমনি প্রয়োজনে মিছিল-সমাবেশ-বিক্ষোভ করাও রাজনৈতিক অধিকারেরই অংশ। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় যখন রাজনৈতিক অধিকারের ন্যায্যতার অপপ্রয়োগ ঘটে রাজনৈতিক হুংকারে, ত্রাসের আবহ কায়েমের মধ্যে। রাজনীতির মৃত্যু ঘটে আসলে সেখানেই। সাদেক হোসেন খোকা যে কেবল বিএনপির বড় নেতা তাই-ই নন, তিনি ঢাকা সিটির নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। এই প্রাজ্ঞ নেতার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য এবং আচরণ ব্যথিত করে, যার শুরুটা আমরা দেখেছি ঢাকা শহরে এ বছরের হেফাজতের দ্বিতীয় সমাবেশ থেকে। হেফাজতের নেতা-কর্মীদের আপ্যায়ন প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সেই রাতে নিহত ব্যক্তিদের কাল্পনিক সংখ্যা যেটি তিনি প্রচার করেছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে একবারেই মানানসই নয়। আর এবার তিনি হুংকার দিয়েছেন যে দলীয় কর্মীরা ‘দা-কুড়াল’ নিয়ে ঢাকা শহরের সমাবেশে আসবেন ২৫ অক্টোবর। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার সমাবেশের উল্লেখ করেছেন এই ডাক দেওয়ার সময়।
বিএনপি যে আওয়ামী লীগের ‘লগি-বৈঠা’র সমাবেশকে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছে, এমন প্রমাণ কিন্তু আগে পাওয়া যায়নি বরং বিএনপির নেতাদের বক্তৃতায় লগি-বৈঠার সমাবেশকে তীব্র সমালোচনাই করতে দেখা গেছে। যদি তিনি লগি-বৈঠার পাল্টা হিসেবেই দা-কুড়াল নিয়ে সমাবেশে আসতে বলে থাকেন, তাহলেও কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক ‘নৌকা’। নৌকা চালাতে লগি-বৈঠা প্রয়োজন শুধু নয়, লগি-বৈঠা ছাড়া নৌকা চালানো সম্ভব নয়। কাজেই নৌকা প্রতীকের মানুষদের সমাবেশে লগি-বৈঠা যদি বা প্রাসঙ্গিক (আমি সেই সমাবেশকে একেবারেই সমর্থন করি না), দা-কুড়ালের সঙ্গে বিএনপির কোনো প্রতীকের কোনো সংযোগ দাঁড় করানো যায় কি? তার চেয়ে কী ভালোই না হতো, সাদেক হোসেন খোকা যদি ধানের ছড়া হাতে নিয়ে তাঁর দলীয় কর্মীদের সমাবেশে আসতে বলতেন! সেই অপূর্ব মানবিক দৃশ্যের যে শক্তি, তার বিপরীতে দা-কুড়ালের সমাবেশ কী বীভৎস দৃশ্যই না তৈরি করবে! তৈরি করেছে কী ভয়ংকর স্নায়বিক চাপ সারা দেশের মানুষের ভেতরে!
বিএনপির আরেক নেতা রুহুল কবির রিজভী। মেধাবী ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সংযত ভাষা সম্ভ্রম জোগায়। তিনিও বলে বসলেন, ২৫ অক্টোবরে বাধা দিলে পদাতিক বাহিনী ‘গোলন্দাজ বাহিনী’ হয়ে উঠবে। বিনীতভাবে জানতে ইচ্ছে করে, তো এই গোলন্দাজ বাহিনীর গোলাবারুদ কে সরবরাহ করবে? কার দিকে তাক করা হবে গোলন্দাজ বাহিনীকে? পুলিশের দিকে, নাকি সাধারণ মানুষের দিকে?
তবে সবচেয়ে বেশি হকচকিত হয়েছি প্রথম আলোর তুখোড় কলামিস্ট মিজানুর রহমান খানের লেখায়। তিনি সাদেক হোসেন খোকার দা-কুড়ালের ডাককে তুলনা করেছেন ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হওয়া’র ডাকের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ২৪ বছরের পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ-শাসনের বিপরীতে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পটভূমিতে বলা হয়েছিল, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার ভাইকে হত্যা করা হয়, তবে…।’ উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি শাসকের বুলেটের গুলিতে আত্মরক্ষার ডাক, যার সম্ভাব্য প্রভাব হলো আবার আক্রান্ত হলে এই আত্মরক্ষার আয়োজন প্রয়োজনে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে রূপান্তরিত হবে। এখানে কার বিরুদ্ধে, কী কারণে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার ডাক’ তা সুস্পষ্ট। পক্ষান্তরে, গত প্রায় পাঁচ বছরে অসংখ্য সুযোগ সত্ত্বেও কোনো কার্যকর আন্দোলন করতে ব্যর্থ বিএনপির দুই নেতা যে হুংকারগুলো দিয়েছেন, তার উদ্দেশ্য ত্রাস তৈরি, যার সম্ভাব্য প্রভাব অস্থিতিশীলতার দিকে দেশকে আরও একটু তলিয়ে দেওয়া। পরিষ্কার নয়, কার বিরুদ্ধে ব্যবহূত হবে দা-কুড়াল বা গোলন্দাজ বাহিনী।
আমরা যারা সত্তর-আশির দশকে বেড়ে উঠেছি তারা বড় দুর্ভাগা। ‘হ্যাঁ ভোট’, ‘না ভোট’-এর সেই অবিশ্বাস্য ভোট-কাহিনি থেকে আমাদের স্মৃতির শুরু। এরপর, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বাবা ফিরে এসেছেন, তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে, আর পাশের বাড়ির বড় ভাই ৩৯ বার ভোট দিয়েছেন, সেই স্মৃতি আমাদের কৈশোরের। সেখান থেকে যথেষ্ট স্বচ্ছতায় ভোট দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ’৯১ সাল থেকে, রাজনীতিবিদেরাই করেছেন। নেই নেই করেও আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবয়ব পেতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশন যতটুকু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে এ পর্যন্ত, সেও বড় কম নয়। সিটি নির্বাচনগুলোর ফলাফল তেমন সাক্ষ্যই দিচ্ছে। আর অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমগুলো। নির্বাচনে কারচুপি করে কেউ পার পাবে, এমন দিন শেষ। আবার বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—এ দুই বড় দলের কোনো একটিকে বাদ রেখে নির্বাচন ফলপ্রসূ হবে, সে ভাবনায় কেউ-ই আস্থা রাখে না। আওয়ামী লীগ-বিবর্জিত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নির্বাচন কিংবা ১৯৮৬ সালে বিএনপি-বিবর্জিত এরশাদের নির্বাচন, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও বৈধতা পায়নি। দুই দলের শীর্ষ নেতাই বলছেন সংলাপে সম্মতির কথা। তাহলে সেই সংলাপ না হয়ে কেন দা-কুড়াল আর গোলন্দাজ বাহিনীর ভয়ে জিম্মি থাকতে হচ্ছে আমাদের?
২০১৩ সালে আমরা অনেক রক্তপাত, মৃত্যু, ধ্বংস, ধর্মীয় উপাসনালয়ের অবমাননা, পাহাড়ি জনপদে আক্রমণ দেখেছি, যার প্রতিটিতেই অবমানিত হয়েছে মানবতা, কলঙ্কিত হয়েছে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, পরাস্ত হয়েছে রাজনীতি। রাজনীতি শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকের হাতে থাকুক—এই যদি হয় আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা, তবে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার আগে রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দুই বড় দলকেই নিতে হবে। কোনো উপেক্ষা কিংবা ত্রাস সৃষ্টি এই আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নয়। অন্যথায় মাশুল যে শুধু জনগণকেই দিতে হয় এমন নয়, বড় বড় রাজনীতিবিদকেও দিতে হয়। আর সে ইতিহাসও খুব দূর অতীতের নয়। দা-কুড়াল-গোলন্দাজ বাহিনী নয়, রাজনীতি ফিরে পাক রাজনীতির ভাষা।
এই জনপদের প্রাচীনতম রাজনৈতিক মহাগ্রন্থ মহাভারত-এ ব্যাখ্যাকার শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শান্ত চিত্তে যে সংকল্প নেওয়া হয়,
তা ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে আর কেবল ক্রোধকে প্রশমিত করার জন্য যে সংকল্প, তা ভবিষ্যতের পথে বিষবৃক্ষ রোপণ করে। এখন আমাদের রাজনীতিবিদেরাই সিদ্ধান্ত নিন, তাঁরা কোন পথে যাবেন।
ড. কাবেরী গায়েন: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।