দিল্লির চোখে ঢাকা…সোহরাব হাসান

বুধবার রাতে (১৮ সেপ্টেস্বর) বিমানযোগে দিল্লি থেকে বেঙ্গালুরু যাচ্ছিলাম। সব আসনের সামনে হিন্দি পত্রিকা দেওয়া হয়েছে। পত্রিকার ভেতরের পাতায় পাঁচ কলামজুড়ে কাদের মোল্লার সচিত্র খবর। হিন্দি পড়তে পারি না। তাই পাশের আসনে বসা ভদ্রমহিলার শরণাপন্ন হলাম। তিনি পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। জিজ্ঞেস করলাম, শিরোনামে কী লেখা আছে? তিনি বললেন, ‘জামায়াত কা নেতা মৌয়াত কা সাজা’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘জামায়াতের নেতার মৃত্যুদণ্ড।’
খবরটি অবশ্য আগের দিন সকালেই আমাদের জানিয়েছিলেন দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার ইনাম আহমেদ চৌধুরী। ভারতের প্রায় সব পত্রিকাই কাদের মোল্লার ফাঁসির খবরটি বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। এর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে সই হওয়া সীমান্ত চুক্তি রাজ্যসভায় উত্থাপিত না হওয়ার খবরও এখানকার পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো ফলাও করে প্রচার করেছে। অনেকে তৃণমূল, অসম গণপরিষদ ও বিজেপির সমালোচনা করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। সীমান্ত চুক্তি সংসদে উত্থাপনের বিষয়টি সামনে রেখে পত্রিকাটির সম্পাদক শেখর গুপ্ত বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদিকে একটি খোলা চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সই হওয়া সীমান্ত চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদনের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন এভাবে, ‘… কারণ এই ইস্যু এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলাদেশকে আপনার পার্টি ও আরএসএস দেখে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত হিসেবে। কিন্তু এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও ইতিহাস বদলে দেওয়ার একটি সুযোগ এসেছে। আপনার পার্টি কখনোই সীমান্ত চুক্তির বিপক্ষে কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি। আপনাকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি বাংলা ভাষাভাষী আফ-পাক, না একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বাংলাদেশ চান? শেখর গুপ্ত এ কথাটি লিখতেও ভোলেন না যে এই চিঠি আপনাকে এ কারণে লিখছি যে দলের প্রবীণ নেতা এল কে আদভানি ও সুষমা স্বরাজ কখনোই অন্যের কথা শোনেন না, যদি সেই কথা তাঁদের মতের বিরোধী হয়। আর অরুণ জেটলি ও দলপ্রধান শুনলেও কোনো ফায়দা হবে না।’
(৩১, আগস্ট, ২০১৩ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
শেখর গুপ্তের শব্দচয়নের সঙ্গে আমরা একমত না হতে পারি। যেমন তিনি উদার ও সেক্যুলার বাংলাদেশের কিন্তু বাংলাদেশের বিপরীতে আফ-পাক শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ভারতের একটি শীর্ষ দৈনিকের সম্পাদক যে ভাষায় বাংলাদেশের স্বার্থের সমর্থনে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তার তারিফ অবশ্যই করতে হবে।
ওই পত্রিকায়ই ১৪ সেপ্টেম্বর আরেকটি খবর করেছে, ‘বাংলাদেশ ও ভারত অভিন্ন নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধির কাজের অগ্রগতি’ শিরোনামে। এ প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ইছামতী নদীতে গত দুই বছরে ২০ কিলোমিটার এলাকায় খননকাজের ফলে নাব্যতা বেড়েছে বলে জানায়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে খননের অভাবে পদ্মায় চড়া পড়ায় প্রায়ই ফেরি পারাপার বন্ধ থাকে। সেসব নিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী মাথা ঘামান না।
হিন্দু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে লিখেছে, ‘বিদ্যুৎ-সংযোগ ভারতের পক্ষ থেকে দুটি বড় প্রতিশ্রুতি (তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্ত চুক্তি) রক্ষায় বিলম্বের আংশিক ক্ষতিপূরণ হিসেবেই দেখা যেতে পারে, যেখানে শেখ হাসিনার প্রশাসন বাংলাদেশের ভারতনীতি আমূল বদলে দিয়েছে।
কেবল এই দুটি পত্রিকাই নয়, দিল্লির অধিকাংশ গণমাধ্যম যে আগের নাকউঁচু ভাব থেকে অনেকটা সরে এসেছে, তার প্রমাণ পেলাম মঙ্গলবার দুপুরে সফররত বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নয়াদিল্লির বুদ্ধিজীবী, কূটনীতিক, গবেষক ও সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায়। আলোচনায় তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্ত চুক্তি প্রাধান্য পেয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সবাই দৃঢ়কণ্ঠে বললেন যে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে কোনোভাবেই পেছনে নিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। এ কারণে বাংলাদেশ ও ভারতকে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত যেমন সম্প্রসারিত করতে হবে, তেমনি বকেয়া সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের বিষয়টির প্রতিও তীক্ষ নজর রাখতে হবে।
ভারতের সাংবাদিক বন্ধুরা বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, তিস্তার পানি বণ্টন কিংবা সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে এখানকার গণমাধ্যম অত্যন্ত ইতিবাচক ও জোরালো ভূমিকা রেখে চলেছে। তারা সীমান্তে বিএসএফের আগ্রাসী ভূমিকা তথা গুলিবর্ষণের নিন্দা করেছে। তবে এ কথাও স্বীকার করলেন যে দুই দেশের মানুষের মধ্যে এখনো ভুল-বোঝাবুঝি রয়েছে এবং তা অপনোদনের জন্য চাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ, মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানো।
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখার্জি বললেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই না হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অভিন্ন নদীগুলোর পানির প্রবাহ বাড়াতে আঞ্চলিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত দুই বছরে ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি দ্বিগুণ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আরেক সাবেক হাইকমিশনার পিনাক চক্রবর্তী বললেন, ‘আমাদের সবকিছু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে যত মানুষ উপকৃত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও কানেকটিভিটিতে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ লাভবান হবে।’
টাইমস নাউ-এর ন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সম্পাদক সিরিঞ্জয় চৌধুরী একটি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বললেন, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে তিনি বাংলাদেশের ভিসা চেয়ে পাননি। বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনারের মুখের ওপর তিনি বলে দিয়েছিলেন, ‘আমার বাবা একাত্তরে বাংলাদেশের জন্য যা করেছে, তার সিকি ভাগও আপনি করেননি।’ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সিরিঞ্জয় চৌধুরী প্রখ্যাত অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর ছেলে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দিকেই এই আবেগের বিষয়টি জাগরূক আছে। বাংলাদেশে যেমন বিএনপি-জামায়াত তেমনি ভারতে বিজেপি এই আবেগকে বরাবর উপেক্ষা করে চলেছে। অধুনা যোগ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নেতিবাচক ধারণা যে আমূল বদলে গেছে, তার সাক্ষ্য হাজির করলেন আরেকজন কূটনীতিক সাম্প্রতিক হিন্দুতে প্রকাশিত এক জরিপের উদাহরণ টেনে। সিএনএন-আইবিএন দ্য হিন্দু ইলেকশন ট্রেকার সার্ভে শিরোনামে প্রকাশিত এই জরিপে ভারতের তরুণ প্রজন্ম মনে করে, ভারতের সবচেয়ে আস্থার দেশটি হলো বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব রাজীব সিক্রিও সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী।’
ভারতের সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিয়মিত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে জনমত জরিপ করে থাকে, যার কোনোটি সরকার বা বিরোধী দলের বিপক্ষে যায়, কিন্তু তারা বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মতো সেই গণমাধ্যমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তারা মনে করে, গণমাধ্যমের কাজ গণমাধ্যম করেছে, রাজনৈতিক দল তাদের কাজ করবে।
আমরা যখন দিল্লিতে তখন এনডিটিভি জরিপ করে দেখাল আসন্ন চারটি রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তিনটিতেই কংগ্রেস ধরাশায়ী হবে। একটিতে কোনোরকমে জিততে পারে। এই জরিপের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের কোনো নেতা গলা ফাটাননি। এমনকি নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থিতা নিয়েও অনেক পত্রিকা সমালোচনার ঝড় তুলেছে। কিন্তু বিজেপির কোনো নেতা এ নিয়ে মাথা ঘামাননি।
আমাদের রাজনীতিকেরা কথায় কথায় গণমাধ্যমকে অমুকের না হলে তমুকের দালাল বানাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিজেদের কাজটি ঠিকমতো করেন না।
এখানেই দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।
বেঙ্গালুরু থেকে, ২০ সেপ্টেম্বর
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net