দুই দলই হার্ড লাইনে

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেওয়ার দুই দিনের মাথায় বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, বিএনপি শুধু নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে। এর বাইরে নয়। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না। অন্যদিকে সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনোভাবেই রাজি নন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান রাখার বাইরেও কোনো চিন্তা তাঁদের নেই। এ ছাড়া ওই সরকারে জামায়াতের অংশীদারত্ব না দেওয়ার বিষয়েও কোনো ছাড় দেবে না আওয়ামী লীগ।
ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংঘাত-সংঘর্ষ মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের মতে, এখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যেদিকে নিতে চায়, আওয়ামী লীগ বা সরকার সেদিকেই যাবে। আলোচনার পথে গেলে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হবে, সংঘাতের পথে গেলে থাকবে কঠোর ব্যবস্থা। রাজধানীতে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার সেই বার্তাই দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিএনপির কয়েকজন নেতার খোঁজে অভিযানও চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর যা-ই হোক, সংঘাত-সংঘর্ষ করে ফায়দা হাসিলের সুযোগ নেই। দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার কোনো চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না। এ ক্ষেত্রে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার তার অবস্থানে কঠোর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সর্বাত্মক প্রস্তুত।’
এদিকে গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আপনার অধীনে কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না।’ তিনি আরো বলেন, এ বাংলাদেশে নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে।
খালেদা জিয়া এরপর রাতে ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জোটের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিমূলক বলে সমালোচনা করেন। সভা-সমাবেশের ওপর পুলিশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা যেকোনো মূল্যে ২৫ অক্টোবর সমাবেশ সফল করার পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে এক দফা আন্দোলন শুরুরও প্রস্তাব দেন। ২৫ অক্টোবরের পর লাগাতার হরতাল নিয়েও আলোচনা হয় বলে সূত্র জানায়। এ বৈঠক শেষে একটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা সাংবাদিকদের জানান, আজ রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে অনুষ্ঠেয় সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকারের একটি বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরবেন। এই সরকার পরিচালনার জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি খুঁেজ বের করতে ‘একটি সার্চ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেবেন তিনি। কমিটির প্রধান হবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রধান নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি হলে নির্বাচনে যেতে আপত্তি নেই বিএনপির। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও সর্বদলীয় সরকারের প্রধান করা হলে মেনে নেবে না বিএনপি। বিরোধী দলের নেতারা মনে করেন, দলীয় ব্যক্তি প্রধান হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। দেশে ও বিদেশে এ নির্বাচন কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চলমান সংকটের সমাধান চায় দলটি। অন্যথায় সরকার যেভাবে হার্ড লাইনের দিকে এগোচ্ছে, বিএনপিও সে রকম পথই বেছে নেবে। হরতালসহ লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে। গত শনিবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ রকমই আলোচনা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না। নির্বাচন হতে হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে হবে। অন্যথায় বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।’
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া আজ সোমবার বিকেলে গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের বলরুমে সংবাদ সম্মেলন করে দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন। তিনি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে তাঁর দলের ও জোটের ফর্মুলা তুলে ধরতে পারেন।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মতে, আলোচনার বাইরে বিএনপি বিকল্প কোনো পথ অনুসরণ করতে চাইলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সমঝোতার পরিবেশ ভেস্তে গেলে প্রয়োজনে বিএনপিকে রাস্তায় নামতে না দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে আওয়ামী লীগের।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের পথে আছি। বিএনপি আমাদের যে পথে যেতে বাধ্য করবে সে পথেই যাবে আওয়ামী লীগ।’
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত সফট লাইনে আছি, নির্বাচনের পথে আছি। বিরোধী দল সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়ে ফায়দা হাসিল করতে চাইলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
জানা গেছে, গত শনিবার দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীও জানিয়ে দিয়েছেন, ২৪ অক্টোবর ঘিরে বা নির্বাচন পর্যন্ত শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো কাজ করতে বিরোধী মহলকে দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে যা যা করা দরকার সরকার তার সবই করবে।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান বিএনপি কিভাবে নেয় বা তারা কোন পথে যায় তা দেখার অপেক্ষা করছে আওয়ামী লীগ। এ সম্পর্কে বিএনপি অবস্থান পরিষ্কার করলে সরকারও তার অবস্থান পরিষ্কার করবে। তবে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা রয়েছে সমঝোতার পথে এলে বিরোধী দলকে ছাড় দেওয়ার, অন্য পথে গেলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দায়িত্বও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে সৈয়দ আশরাফ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে কয়েক দফা টেলিফোনে কথা বলেছেন বলেও জানা গেছে।
দায়িত্বশীল এক মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আশা করি বিএনপি সে প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেবে। সেই সাড়া পেলেই আলোচনার টেবিলে বসে এর রূপরেখা ও কাঠামো নিয়ে সমস্যার সমাধান হবে।’
বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিমূলক। কোনোভাবেই প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে না। সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন তা প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেননি। আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মধ্যে আলোচনা হতে হবে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের ১২ ঘণ্টার মাথায় রাজধানীতে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধী দলের নেতারা। এর প্রতিবাদে গতকাল সারা দেশের জেলা শহরে বিক্ষোভ করে বিএনপি।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে হলে চলবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমানসংখ্যক সদস্য রাখতে হবে। এমনকি সব দলের প্রতিনিধি রাখতে হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী একদিকে প্রস্তাব দিয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে হার্ড লাইনে যাচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিরোধী দলও হার্ড লাইনে যাবে।
১৮ দলীয় জোটের বৈঠক : গতকাল রাত ৯টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে যেকোনো মূল্যে ২৫ অক্টোবর সমাবেশ সফল করার পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে এক দফা আন্দোলন শুরুর প্রস্তাব দেন জোট নেতারা। বৈঠকে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ও মির্জা আব্বাস, এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রেজানুল্লাহ শাহিদীসহ ১৮ দলের অন্য নেতারা।