বিশিষ্ট নাগরিকদের অভিমত

দুই নেত্রীর সমঝোতা না হলে গভীর সংকট

নির্বাচন ঘিরে একের পর এক সহিংসতা ও হরতালের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। তাঁরা বলেছেন, ধারাবাহিক সহিংস পরিস্থিতিতে সারা দেশের মানুষ ভয়াবহ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপ হতেই হবে। অন্যথায় দেশে আরো ঘনীভূত হবে রাজনৈতিক সংকট। গতকাল রবিবার কালে কণ্ঠের সঙ্গে আলাপে তাঁরা এ অভিমত জানান। তাঁরা আরো বলেন, সংলাপ ব্যর্থ হলে হয়তো সরকার বাধ্য হয়ে একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটবে। এটি শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই অমঙ্গল ডেকে আনবে। তবে এই মুহূর্তে কেউই এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দীন খান বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল- দুপক্ষই সংলাপের কথা বলছে। কিন্তু এ-সংক্রান্ত প্রথম উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়েছে। তবে বিএনপি মহাসচিব-পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশাবাদ। শর্তহীন সংলাপ হলে এটি শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হবে বলেই আমি আশাবাদী।’

হাফিজ উদ্দীন খান আরো বলেন, একের পর এক হরতালে দেশে সহিংসতা বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। সংঘাত-সহিংসতা দমনে বেসামরিক বাহিনী ব্যর্থ হলে সামরিক-আধাসামরিক বাহিনী হয়তো সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে। তবে সেটি হতে পারে, শুধুই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নিয়মিত বাহিনীগুলোকে সহায়তা করার জন্য। এ সময় এক-এগারোর মতো সেনাবাহিনীর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কোনো সম্ভাবনা নেই।

হাফিজ উদ্দীন খান বলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ কোনদিকে এগোচ্ছে, এ নিয়ে সাধারণের মনে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। কোনো কারণে সংলাপ না হলে সরকার হয়তো একতরফা নির্বাচন দেবে। এতে সরকার, বিরোধী দল বা জনগণ- কারো জন্য ভালো হবে না। সে ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে আরেকটি রাজনৈতিক সংকট। সবাই এসব অচলাবস্থার নিরসন চায়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দুপক্ষই সংলাপের কথা বলছে। কিন্তু হরতাল-সংঘাত পরিস্থিতিও চলছে। আমার মতে, সংঘাতের মধ্যেও সংলাপ হতে পারে। দুপক্ষের আন্তরিকতাতেই এটি সম্ভব। বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয় মহাসচিব পর্যায়ের সংলাপের কথা বলা হয়েছে। যদিও এ ধরনের সংলাপ অতীতে কোনো ফল বয়ে আনেনি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আমি নিজেও খুব আশাবাদী মানুষ। তাই এবার মহাসচিব পর্যায়ে খুব দ্রুত একটি ইতিবাচক সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে বলে আমি আশা করছি।’

২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধতা রয়েছে উল্লেখ করে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘নির্বাচন প্রস্তুতির জন্য আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। তাই দুই দলকে আন্তরিকতার সঙ্গে সংলাপ করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে হবে। নইলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। দেশের মানুষ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন ভয়াবহ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। নির্দলীয় সরকার প্রধান কে হবেন, সরকারের পক্ষ থেকেও এটি স্পষ্ট করা দরকার। নইলে শেষ পর্যন্ত সংকট থেকেই যাচ্ছে। দুপক্ষকেই ছাড় দিয়ে দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে খোলামনে এগোতে হবে।’

ব্যারিস্টার রফিক বলেন, বর্তমানে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে নির্বাচনে কারচুপির খুব বেশি সুযোগ নেই। তবে ভোট গণনা সুষ্ঠুভাবে করতে এক দিনের বদলে চার দিন ভোট গ্রহণ হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রবীণ এই আইনবিদ আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে দেশ আরো পেছনের দিকে যাক বা আরো প্রাণহানি হোক, এটি কারো কাম্য নয়। এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি এখনই সৃষ্টি হয়নি। পরিস্থিতি সেদিকে মোড় নেবে, এমন আশঙ্কা এখনো নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থান সংঘর্ষের সূত্রপাত করবে। সংঘর্ষ দেশের জন্য বিপর্যয় ঢেকে আনবে। আমরা চাই না এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, যা রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করে তোলে। সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে উন্নতির ধারা ব্যাহত হয় এবং উন্নয়নের বিতরণ সামাজিকভাবে হয় না। আর সামরিক সরকারের তেমন জবাবদিহি থাকে না। বরং এ ধরনের সরকারের কোনো সমালোচনা করা যায় না। সামরিক সরকার এলে প্রথম চোট রাজনীতিবিদদের ওপর দিয়েই যায়। এ কারণে রাজনীতিবিদরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন।’

প্রবীণ এ শিক্ষক আরো বলেন, ‘দুই দলকে অবশ্যই সমঝোতায় আসতে হবে এবং নির্বাচন করতে হবে। কারণ নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর হয় না। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি বাদ দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে রাজনীতিবিদদের হাঁটা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সমঝোতা না হলে তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে। গত হরতালে ২০ জনের মতো মারা গেছে। সামনে আরো অনেক প্রাণ ঝরবে। মানুষ মারা যাওয়াটা কেউ ভালোভাবে দেখে না। এভাবে প্রাণহানি হতে থাকলে তার পরিণতি কতটা ভয়ংকর তা সবাই জানে। তবে এখনো সমঝোতার সময় শেষ হয়ে যায়নি। সরকার মনে হচ্ছে শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা বিএনপির কতটুকু শক্তি আছে তা পরীক্ষা করে দেখছে।’