নিয়ম ভেঙে যুক্ত করা হচ্ছে মালয়েশিয়ার দুই কোম্পানিকে

দুই সাংসদের প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ

উত্তরা ফ্ল্যাট প্রকল্প নিয়ে আরও জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ, নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে পারেননি সরকারি দলের দুই সাংসদ এনামুল হক ও নসরুল হামিদ। ১৮ মাসে ৫৫ শতাংশ কাজ করার কথা থাকলেও, তাঁরা করেছেন মাত্র ৫ শতাংশ। কিন্তু দুই সাংসদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজউক চিঠি দেওয়া ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আইন অনুযায়ী, দরপত্র বাতিল করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। উল্টো দুই সাংসদ মালয়েশিয়ার দুটি কোম্পানিকে আড়াই হাজার কোটি টাকার এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ার দুই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিপত্রও হয়েছে।অভিযোগ উঠেছে, নিজেরা কাজ করতে না পেরে তাঁরা মালয়েশিয়ার কোম্পানির কাছে কাজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে না পারলে নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র বাতিল এবং প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। কারণ, পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী, তৃতীয় কোনো পক্ষকে এ কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘তৃতীয় পক্ষকে এখন কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই। যাদের কাজ দিয়েছি, আমরা তাদেরই ধরব। কার সঙ্গে কার এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) হচ্ছে, সেগুলো আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেই নোটিশ দিয়েছি। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে না পারলে আমরা জনস্বার্থে আইন অনুযায়ী যা করার করব।’

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগে রাজউকের সম্প্রসারিত উত্তরা এলাকার ১৮ নম্বর সেক্টরে সর্বমোট ২০ হাজার ফ্ল্যাট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২১৪ দশমিক ৪৪ একর জমির ওপর এ ফ্ল্যাটগুলো তৈরিতে সরকারের খরচ হবে নয় হাজার ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।

এর মধ্যে দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এ’ শ্রেণীতে (১২৫০ বর্গফুট) ১৬ তলাবিশিষ্ট ৭৯টি ভবন তৈরির জন্য কার্যাদেশ দিয়েছে সরকার। সরকারদলীয় সাংসদ এনামুল হকের মালিকানাধীন এনা প্রপার্টিজ দক্ষিণ কোরিয়ার ডোঙ্গা এএইচ ও ডিডিজের সঙ্গে যৌথভাবে ৬১টি ভবন তৈরির কাজ পেয়েছে।

সাংসদ নসরুল হামিদের মালিকানাধীন হামিদ কনস্ট্রাকশন লিমেটেডের (এইচএমএল) সঙ্গে বিল্ডিং ফর ফিউচার (বিএফএল) যৌথভাবে ১৬টি ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছে। বাকি একটি ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছে আনাম ট্রেডার্স।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, একেকটি ভবন হবে ১৬ তলা। বেইসমেন্ট ও কার পার্কিংয়ের জন্য দুটি তলা হবে। বাকি ১৪ তলার একেকটিতে ছয়টি করে মোট ৮৪টি ফ্ল্যাট থাকবে। ৭৯টি ভবনে মোট ছয় হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট হবে। রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ তদারক করছে। স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তর ভবনগুলোর নকশা তৈরি করেছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ পাওয়ার কথা জানানো হয়। ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত চুক্তি হয়। ৩০ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গত ১৮ মাসে রাজউক থেকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও কাজ এগোয়নি।

রাজউকের কর্মকর্তারা বলেন, গত মে মাসে এনাকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ২৮ দিনের মধ্যে নির্ধারিত কাজ না করলে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হবে। এর পরও কাজ এগোয়নি। এখন তাদের কার্যাদেশ বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু কয়েক দিন আগে দুই সাংসদ মন্ত্রণালয় ও রাজউককে জানান, মালয়েশিয়ান কোম্পানি এএলম বিল্ডার্স এবং গেমিল্যাং ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে তাঁরা চুক্তি করেছেন। এখন তাঁরা দ্রুত এ কাজ এগিয়ে নিতে পারবেন।

গতকাল শুক্রবার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কাজ বন্ধ। এখানে-সেখানে নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। লোহায় মরচে ধরেছে। নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, এখন লোকজন নেই। ঈদের পর পুরোদমে কাজ শুরু হবে বলে তাঁরা শুনেছেন।

কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প এলাকায় থাকা এনা প্রপার্টিজের উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘কাজ চলছে। তবে বাস্তবতা হলো, যে দরে আমরা কাজ নিয়েছি, বাস্তবে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। আমরা বিষয়টি বিবেচনার জন্য আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু সেটি বিবেচনা করা হচ্ছে না।’

মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানির প্রতিনিধি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনা তাদের বলেছে, কাজটি দিয়ে দেবে। এ জন্য এমনভাবে চুক্তি করা হবে, যাতে কাজটি আর এনার থাকবে না। তাদেরই হবে। আর সে কারণেই মালয়েশিয়ার কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে। শুধু ‘এ’ নয়, ‘বি’ এবং ‘সি’ শ্রেণীর ব্যাপারেও মালয়েশিয়ার কোম্পানি আগ্রহী।

যোগাযোগ করা হলে এনার পরিচালক সামিউল আলম বলেন, ‘মালয়েশিয়ার দুটি কোম্পানির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়েছে। আমরা যে ৬১টি ভবন তৈরির কাজ পেয়েছি, সেগুলো তারা করবে। আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা সবই তারা দেবে।’

এইচএমএল ও বিএফএলের ১৬টি ভবনের বিষয়ে কী হবে, জানতে চাইলে সাংসদ নসরুল হামিদ বলেন, ‘আমি কিছু বলতে চাই না। বিএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীরুল হক বলতে পারবেন।’

তানভীরুল হক বলেন, ‘অন্যরা কে কী করছে জানি না। আমি আমার কাজ নিজেই করতে চাই। কারণ, আমরা কাজ অনেক দূর এগিয়েছি। তবে সমঝোতা অনুযায়ী মালয়েশিয়ার কোম্পানির কাছ থেকে আমরা শুধু কারিগরি সহায়তা নেব।’

উত্তরার ওই ফ্ল্যাটের জন্য রাজউকে আবেদন করেছেন ছয় হাজার ১০০ জন। প্রত্যেকের কাছে আবেদনপত্রের সঙ্গে তিন লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট পেলে তাঁদের আরও অন্তত ৫৬ লাখ টাকা দিতে হবে। তবে কত বছর পর তাঁরা ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন, সে তথ্য কারও জানা নেই।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো সাংসদ সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এই বিধান মানা হয়নি।

মন্ত্রণালয় ও রাজউকের কর্মকর্তারা বলেন, সাংসদেরা যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটি পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে গেছে। কাজের এখন যে অবস্থা, তাতে নির্ধারিত সময়ে তো দূরের কথা, কখনো এ কাজ শেষ হবে কি না, যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।