দুর্নীতিতে বিপন্ন মিল্ক ভিটা

সোহেল মামুন
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা এখন সীমাহীন দুর্নীতিতে বিপন্ন। সমবায় অধিদফতরের তদন্তেই দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কমছে; অথচ বাড়ছে ব্যয়। অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত খরচেও হোঁচট খাচ্ছে এর পথচলা। জোট সরকারের আমলে শুরু হওয়া অবস্থার পরিবর্তন হয়নি বর্তমান সরকারের আমলেও।
তদন্তে দেখা গেছে, ব্যবস্থাপনা কমিটির ছত্রছায়ায় যন্ত্রপাতি কেনায় অনিয়ম, টেন্ডার ছাড়াই লাখ লাখ টাকার
কেমিক্যাল কেনা, একই বিল দু’বার পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রিম প্রদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ, রুটিন কাজের জন্য ১৪টি উপকমিটি করে সভার নামে টাকা লুট, মডেল ফার্মের নামে আত্মীয়করণ, অত্যধিক পরিবহন ব্যয় দেখানো, বাজেটবহির্ভূত ব্যয় করে আর্থিক ক্ষতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এমনকি অনিয়ম করে বাড়ানো হয়েছে তরল দুধের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে লাগামহীন দুর্নীতির কারণে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় মিল্ক ভিটার। আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ অবস্থার পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা ছিল সংশ্লিষ্টদের; কিন্তু ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, কখনও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে প্রশাসনের দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থ লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতি আর দ্বন্দ্বের কারণে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আটবার মিল্ক ভিটার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) পরিবর্তন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক কাঠামোতে কিছুটা পরিবর্তন করে প্রশাসন ক্যাডারের একজন উপসচিবকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এমডি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুনীর চৌধুরী। সেইসঙ্গে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমবায় অধিদফতর গত কয়েক বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে মিল্ক ভিটার এমডিকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে সম্প্রতি এই কমিটি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করে সমবায় অধিদফতরে নিবন্ধকের দফতরে জমা দিয়েছে। অবশ্য তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে সমবায় অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।
মিল্ক ভিটার এমডি মুনীর চৌধুরী সমকালকে জানান, তিনি কাজে যোগ দেওয়ার আগেই দুর্নীতি-অনিয়মের তদন্ত শুরু করে সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর এই তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে তদন্তে। তিনি চেষ্টা করছেন যেসব ক্ষেত্রে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রয়েছে, সেগুলো শোধরাতে।
জানা গেছে, গত দু’তিন বছরে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা চিত্র তদন্তে উঠে এসেছে। চিহ্নিত করা হয়েছে দোষীদেরও।
একই ব্যয় দু’বার পরিশোধ :তদন্তে দেখা যায়, মিল্ক ভিটার চারটি গাড়ির জন্য চার জোড়া টায়ার-টিউব কেনা হয় ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকায়। কার্যাদেশের মাধ্যমে রহিমআফরোজ ডিস্ট্রিবিউশন থেকে ক্রয় করা এই পণ্যের বিল ২০০৯-১০ অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছে। আবার এক বছর বিরতি দিয়ে একই কার্যাদেশে ২০১১-১২ অর্থবছরেও ফের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। নথি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মিল্ক ভিটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ এ অর্থ আত্মসাৎ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিব খানের কাছ থেকে এ টাকা আদায়যোগ্য। নথি প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি।
দুর্নীতির কারণে উৎপাদন কমছে, ব্যয় বাড়ছে :তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সমবায় আইন ও আর্থিক বিধিমালা মানা হয়নি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাজেটবহির্ভূত ব্যয় করা হয়েছে। আবার বেশি ব্যয় করার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রশাসনিক প্রধানের অনুমতিও নেয়নি।
দৈনিক শ্রমিকের মজুরি ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরের এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়োগ দেখিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তরল দুধের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
নিবন্ধকের অনুমতি ছাড়াই এই ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়াও উৎপাদন খাতে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বিধিবহির্ভূত খরচ দেখানো হয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো সভায় আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুমোদন নেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নথি অনুমোদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছেন।
পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে লুটপাট :পরিবহন ব্যয় বেশি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা লুট করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নাটোর প্ল্যান্টের জন্য লিটারপ্রতি তরল দুধের জন্য গড় পরিবহন ব্যয় দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় টাকা। অথচ নাটোর ছাড়া অন্য ১৭টি প্ল্যান্টে একই খাতে লিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে গড়ে দুই টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মানিকগঞ্জে লিটারপ্রতি ব্যয় হয় ২ টাকা ৫৪ পয়সা। আর সবচেয়ে কম হয় শাহজাদপুর প্ল্যান্টে ১ টাকা ছয় পয়সা।
নাটোরে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ব্যয়ের সুবিধা পান চেয়ারম্যানসহ উপমহাব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন। ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর এক সভায় যাচাই-বাছাই ছাড়া লিটারপ্রতি সাড়ে ছয় টাকা ব্যয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ ব্যয় বেশি দেখিয়ে প্রস্তাবই দেওয়া হয়েছিল ৬ টাকা ৩০ পয়সা করে। তার থেকে ২০ পয়সা বেশি করে ব্যয় করা হয়েছে। আবার এই সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি করে কার্যকর করা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নাটোর প্ল্যান্ট থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের মাদার মিল্ক নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দুধ সংগ্রহের ব্যাপারেও প্রশাসনকে অবগত করা হয়নি। অন্যদিকে দৈনিক ৫ হাজার লিটার দুধ দেওয়ার শর্তে ওই পরিবহন ভাড়া দেওয়া হবে উল্লেখ করা হলেও তা করা হয়নি।
নিয়োগ-পদোন্নতি :মিল্ক ভিটা ইউনিয়নের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অস্বচ্ছতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সমবায় সমিতির বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি সমন্বয় করার কথা থাকলেও গত দু’বছরে তা অনুসরণ করা হয়নি।
এদিকে নিয়োগ, বাকিতে দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রি, পরিবেশক নিয়োগ, পরিবহন ব্যয় বাড়ানো, কাঁচামাল কেনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও ব্যবসা-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্তে মিল্ক ভিটা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে।
পণ্য বিক্রির টাকা আত্মসাৎ :মিল্ক ভিটার মিরপুর দুগ্ধ কারখানার বিক্রয় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক খায়রুল ইসলাম আলমাজি বিভিন্ন সময় ৪২ লাখ ৯৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে খায়রুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে মিল্ক ভিটা। কিন্তু প্রচলিত চাকরিবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়নি।
অগ্রিমের নামে অর্থ আত্মসাৎ :ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই ২০১১ সালের জুন থেকে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ মাসে ১০৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেতনের বিপরীতে ৮০ লাখ ৬ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। আবার একই ব্যক্তিকে একই অর্থবছরে দু’বার অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রিম প্রদানের বিষয়ে সরকারি কোনো বিধি-বিধান অনুসরণ করা হয়নি।
এমনকি ব্যবস্থাপনা কমিটির ১০ সদস্য নিয়মবহির্ভূতভাবে ৭২ লাখ ৪১ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা সমন্বয় করা হয়েছে সমিতির বিভিন্ন সভায় সদস্যদের উপস্থিতি বাবদ সম্মানী খাত থেকে। অর্থাৎ সভায় উপস্থিতি বাবদ ভাতা না নিয়ে তা অগ্রিম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর এ কারণে অযাচিত অসংখ্য সভা করা হয়েছে। অতিরিক্ত সভার কারণে প্রতি বছর আপ্যায়ন ভাতা দ্বিগুণ বেড়েছে।
মডেল ফার্মের টাকা আত্মীয়করণ :মিল্ক ভিটা ইউনিয়নের গবাদিপশু উন্নয়ন তহবিল থেকে মডেল ফার্ম স্থাপনের জন্য ৩ কোটি টাকা গবাদিপশু উন্নয়ন তহবিলে স্থানান্তর করা হয়। ব্যবস্থাপনা কমিটি একক সিদ্ধান্তে এ টাকা হস্তান্তর করেছে। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধকের অনুমতি নেয়নি ব্যবস্থাপনা কমিটি। এতে সমবায় বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় অনেক উপকমিটি থাকলেও ‘মডেল ফার্ম’ সম্পর্কিত কোনো উপকমিটি গঠন করা হয়নি। গাভী ক্রয় ও গো-খাদ্য বিতরণ উপকমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঋণ প্রদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক মিল্ক ভিটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ নিজেই, যা ঋন বিতরণ প্রক্রিয়ায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, তাদের আত্মীয়স্বজন এবং ব্যবস্থাপনা কমিটিতে প্রতিনিধিত্বকারী সমিতির লোকজনকে এই ঋণ দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণের স্ত্রী এলিজা খানও সাড়ে সাত লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন। চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় একই সমিতির চার সদস্যও ৩০ লাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম ও ফারুক আহমেদ সাড়ে সাত লাখ টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। নজরুল ইসলামের সমিতির প্রতিনিধিত্বকারী খলিলুর রহমান ও কোরবান আলীও সাড়ে সাত লাখ টাকা ঋণ সুবিধা পেয়েছেন। ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতির বহলবাড়ী দুগ্ধ উৎপাদন সমবায় সমিতির প্রতিনিধিত্বকারী ফজলুর রহমানও নিয়েছেন একই পরিমাণ টাকা। মোট ৩৪ জন ঋণ সুবিধাভোগীর মধ্যে ১০ জনই ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত। এতে তুলনামূলক অসচ্ছল ও ভালো খামারিরা বঞ্চিত হয়েছেন। আর এই ঋণ বিতরণে এক লিটার দুধেরও উৎপাদন বাড়েনি।
জানা গেছে, ২০১১ সালে সমবায়ীদের ভোটে মিল্ক ভিটার বর্তমান ব্যবস্থাপনা কিমিটি নির্বাচিত হয়েছে। এ ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ সমকালকে বলেন, কয়েক বছর ধরে মিল্ক ভিটা লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই একপেশে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। দুর্নীতি রোধের জন্য তারা কাজ করছেন বলে তিনি জানান।