সামরিক খাত নিয়ে টিআইয়ের প্রতিবেদন

দুর্নীতির ‘অতি উচ্চ ঝুঁকিতে’ বাংলাদেশ

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) যুক্তরাজ্যের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক খাতে দুর্নীতির ‘অতি উচ্চমাত্রা’র ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর জাতীয় সংসদের পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো একই অবস্থানে আছে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাহরাইনসহ আরও ২০টি দেশ।
গতকাল মঙ্গলবার ব্রাসেলস থেকে ‘ওয়াচডগস: ৮২টি দেশে প্রতিরক্ষা খাতের ওপর সংসদীয় নজরদারির গুণগত মাত্রা’ শিরোনামে টিআই এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে ৮২টি দেশকে দুর্নীতির ঝুঁকির বিচারে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে আছে চারটি দেশ, নিম্ন ঝুঁকিতে ১২টি দেশ, মধ্যম ঝুঁকিতে ১৪টি দেশ, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি, অতি উচ্চ ঝুঁকিতে ২১টি (বাংলাদেশসহ) এবং চরম ঝুঁকিতে আছে ১৪টি দেশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘চরম ঝুঁকিতে’ থাকা ১৪টি দেশের মধ্যে আলজেরিয়া, মিসর, ইরান, লিবিয়া, কাতার, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, সিরিয়া ও ইয়েমেন অন্যতম। সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে থাকা চারটি দেশ হলো: অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়াকে নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় রয়েছে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, ইতালি, আর্জেন্টিনা। ভারত, ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ২৯ ধরনের দুর্নীতির ঝুঁকি আছে। দুর্নীতির কারণে বিশ্বের সামরিক খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে প্রতিবেদনভুক্ত ৮২টি দেশের সামরিক ব্যয়ের সামগ্রিক পরিমাণ ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৯৪ শতাংশ। টিআই যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা খাতের ২৯টি দুর্নীতির ঝুঁকিকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছে। সেগুলো হলো: রাজনৈতিক, আর্থিক, জনবল-সংশ্লিষ্ট, পরিচালনা ও সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত।
প্রতিবেদনটি টিআই যুক্তরাজ্য কর্তৃক এ বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘গভর্নমেন্ট ডিফেন্স অ্যান্টিকরাপশন ইনডেক্সে’র তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা। প্রতিরক্ষা বিষয়ে সংসদীয় সক্ষমতা নিরূপণের জন্য ১৯টি প্রশ্নের মাধ্যমে সাতটি বিষয় প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো: প্রতিরক্ষা বাজেট নজরদারি ও বিতর্ক, প্রতিরক্ষা বাজেটের স্বচ্ছতা, বহির্নিরীক্ষা, প্রতিরক্ষা নীতি, গোপন বাজেট, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রতিরক্ষা ক্রয়ের পদ্ধতি এবং নজরদারি করা।
এতে দেখা গেছে, প্রতিরক্ষা নীতি, নজরদারি এবং বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক দেশে সর্বনিম্ন মাত্রার আনুষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। অতি কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে ১৫ শতাংশ দেশের ক্ষেত্রে। এক-তৃতীয়াংশ দেশের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাজেট বহির্নিরীক্ষা করা হলেও সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা বাজেটের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ দেশে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সীমিত তথ্যের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ৭৫ শতাংশ দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যয় জনসমক্ষে প্রকাশ করে না। ৮২টি দেশের মধ্যে অর্ধেকের ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা বাহিনীর নীতি, বাজেট এবং প্রশাসনিক ব্যাপারে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র নজরদারির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ৪০ শতাংশ দেশের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ক্রয়ের নজরদারি পদ্ধতি প্রমাণ মেলেনি কিংবা যে ক্ষেত্রে নজরদারি পদ্ধতি রয়েছে, তা নিষ্ক্রিয় ও কার্যক্রম অত্যন্ত অস্পষ্ট। দুই-তৃতীয়াংশ দেশের ক্ষেত্রে বহির্নিরীক্ষা ব্যবস্থার কথা জানা গেলেও সেগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রতিরক্ষা বাজেট নজরদারি ও বিতর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বরের শতকরা হার ২৫ শতাংশ, প্রতিরক্ষা বাজেটের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ, বহির্নিরীক্ষার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, প্রতিরক্ষা নীতির নজরদারি ও বিতর্কের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ, গোপন বাজেট তদারকির ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ, গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে শূন্য শতাংশ ও প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর সংসদীয় নজরদারির কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য দুটি কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এর প্রথমটি হলো প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক দল গঠন করা। যেখানে বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা থাকতে পারেন।
দ্বিতীয় কৌশলটি হলো: সরকারের নির্দেশে মহাহিসাব নিরীক্ষকের নেতৃত্বে গঠিত একটি নিরপেক্ষ রিপোর্টিং সংস্থা—যারা প্রতিরক্ষা বাজেটের অপব্যবহার বা অপচয়-সংক্রান্ত তথ্য সংসদ সদস্য এবং জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। ওই সংস্থা প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা অনুসন্ধান করে এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংসদের কাছে প্রতিবছর উপস্থাপন করবে।
প্রতিবেদন সম্পর্কে এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থায় সংসদীয় জবাবদিহি আনা সময়ের দাবি। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে একদিকে ক্রমবর্ধমান হারে বড় ধরনের ক্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে এ বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য মঙ্গলদায়ক নয়। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সার্বিকভাবে সংসদ ও বিশেষ করে প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটি যদি সশস্ত্র বাহিনীর আয়-ব্যয়কে জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারে, তাহলে কে পারবে?