দুর্নীতির বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল…মইনুল ইসলাম

৯ সেপ্টেম্বর গবেষণা সংস্থা সিপিডি জেনেভায় অবস্থিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম উদ্ভাবিত প্রশ্নমালার ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপের ফলাফল নিয়ে প্রণীত ‘গ্লোবাল কমপিটিটিভনেস রিপোর্ট’ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।
এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৭১টি বড় ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ দেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতিকেই প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ভৌত অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা এবং অর্থায়নের সূত্রসমূহে অভিগম্যতার সমস্যা ওই জরিপে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে ধরা পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, শিক্ষিত শ্রমিক ও কর্মজীবীর অভাব, বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত বাধানিষেধ, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, করের বোঝা, শ্রমশক্তির কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতার অভাব, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদিও গুরুত্ব পেয়েছে বাধা হিসেবে।
এ নিবন্ধে আমি আলোকপাত করতে চাই দুর্নীতি দমনের ইস্যুতে। আমার দাবি, অবিলম্বে দেশে দুটো ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হোক—একটি ১০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পাঁচ বছরের জন্যে দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল, আর অপর ট্রাইব্যুনালটি প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপির বিচার দ্রুত সম্পন্ন করবে, তাও পাঁচ বছরের জন্য। অনেকেই হয়তো জেনে উপকৃত হবেন যে, বিচার-প্রক্রিয়ার মারাত্মক দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই সবচেয়ে জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর ‘দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির’ জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজন হয়, এবং সাধারণত ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে দোষী সাব্যস্ত আসামিপক্ষ উচ্চতর আদালতে আপিল করতে পারে না (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম)। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠনের পর নয় বছর অতিক্রান্ত হলেও দুদকের দায়ের করা একটি মামলার চূড়ান্ত রায় পাওয়া যায়নি, এটা দুর্ভাগ্যজনক।
২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে বিলুপ্ত করে দুদক গঠন করা হলেও ওই আমলে দুদক দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করার জন্য ‘ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ’ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের ইচ্ছানুসারে।
২০০৭-০৮ সালের সশস্ত্র বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদক প্রচণ্ড শক্তিধর ও গতিশীল হয়ে ওঠে। ফলে দেশে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয় ওই সময়টায়। কিন্তু সেনা নেতৃত্বের ওই ‘ডিফেক্টো সরকার’ নিজেদের শাসনের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার খায়েশে যখন দুর্নীতি দমনকে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহারের লক্ষ্যে ‘গুরুতর অপরাধ দমন জাতীয় কমিটির’ মাধ্যমে দুদকের কাঁধে চেপে বসেছে, তখন দুদককে ওই কমিটি যথেচ্ছ ব্যবহার করতে শুরু করায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা দ্রুত হারায়। ওই ‘জাতীয় কমিটি’ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করলেও রহস্যজনকভাবে দুর্নীতিবাজ আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের তদন্তের আওতার বাইরেই রেখে দিয়েছিল। সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ছিল ওই কমিটির প্রকৃত ‘আড়ালের শক্তি’। ‘কিংস পার্টি’ গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তৎপরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করে এবং ২০০৮ সালে ওই জাতীয় কমিটির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গিয়েছিল। একই সঙ্গে, মাঠপর্যায়ে কমিটির পক্ষে দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে নিয়োজিত সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকের দুর্নীতির কারণেও জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দুদকের কার্যকারিতা যে এর ফলে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। এতৎসত্ত্বেও কয়েকটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুদককে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং এর ফলে দুদকের মামলাগুলো আদালতের বিচার-প্রক্রিয়ায় দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্নীতি দমন অধ্যাদেশে মারাত্মক পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে বলে হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পর দুদকের সবগুলো মামলার বিচার-প্রক্রিয়া থমকে যায়। অধ্যাদেশ সংশোধনের বিষয়টি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর ফয়সালা করার সুযোগ পায়নি।
মহাজোট সরকার দুর্নীতি দমন অধ্যাদেশকে সংসদের মাধ্যমে বৈধতা না দেওয়ায় পুরো বিষয়টাই ‘কেঁচে গণ্ডূষ’ হয়ে গেছে। এরপর দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রণীত আইনের খসড়া বিলটি আজও সংসদে পাস করা যায়নি। লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধূরী একবুক হতাশা নিয়ে দুদক থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর উত্তরসূরি চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দুদককে ‘নখদন্তহীন ব্যাঘ্র’ করে ফেলার অভিযোগ উত্থাপন করে প্রবলভাবে আলোচিত হলেও তাঁর মেয়াদে দুদক একেবারেই ম্রিয়মাণ ‘সার্কাসের পোষ মানা বাঘে’ পরিণত হয়। প্রতিবাদে তাঁর আগভাগে পদত্যাগ করাই ছিল সমীচীন। ব্যর্থতার ঝুলি পূর্ণ করে মেয়াদোত্তীর্ণ বিদায় তাঁর সারা জীবনের অর্জিত সুনামকে বরবাদ করে দিয়েছে বলা যায়।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই যে দুদককে অকার্যকর করে রাখতে চাইছেন, এই সত্যটা জাতি উপলব্ধি করতে ভুল করেনি এবং এই উপলব্ধিই মহাজোট সরকারের পুনর্নির্বাচনের পথে এখন বড় বাধার দেয়াল হিসেবে খাড়া হয়ে আছে। গত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহাজোটের মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থীরা যেভাবে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তার জন্য দুর্নীতিকেই ‘এক নম্বর কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি আমি। মেয়র পদপ্রার্থীদের দুর্নীতির তেমন বদনাম না থাকলেও সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা-পাতিনেতা-কর্মী-মাস্তান-লুটেরাদের দুর্নীতি ও লুটপাটের দায়ভার জনগণ শেখ হাসিনার কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছেন।
১৯৯১ সাল থেকে চারবার ক্ষমতাসীন দল ও জোটকে জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আগামী নির্বাচনেও মহাজোট আরেকটি প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ৪২ বছরের যেকোনো সরকারের চেয়ে বর্তমান সরকারের সাফল্য ও সুকৃতি অনেক বেশি। কিন্তু সেসব চাপা পড়ে গেছে এই মহা দুষ্কৃতির তলায়। ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ চারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিল, আরেকবার বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে। বর্তমান সরকারের প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে একবারও চ্যাম্পিয়নশিপ জোটেনি। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলকে জনগণের প্রত্যাখ্যানের তোড়ে বিএনপি আগামী নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জনের স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। এই নেতিবাচক ভোটের বিপ্লব জনগণের হতাশার বহিঃপ্রকাশ হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের তা পাওয়ার অধিকারী কি না? জনগণকে সুশাসন উপহার দেওয়ার যোগ্যতা তাদের আছে বলে মনে হয় না। তাই বলছিলাম, মহাজোট সরকার তাদের বদনাম কিছুটা ঘোচানোর জন্য অন্তত ১০টি প্রধান দুর্নীতির মামলা আগামী চার মাসের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি ‘দুর্নীতি বিচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করুক, যাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দুর্নীতির মামলাগুলো মুক্তি পায়। দুর্নীতি মামলার অভিযুক্ত আসামিরা নানাভাবে বিচার-প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করে চলেছে। অথচ বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এক নম্বর বাধা দুর্নীতি। সরকার চাইলে যে দুর্নীতিবাজদের ‘প্রবলভাবে ঝাঁকি’ দিতে পারে, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের দুদক সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। এর পরের প্রায় পৌনে পাঁচ বছরে দুদক যে কিছুই করতে পারল না, সেটাও সরকারের ইচ্ছাতেই। দুর্নীতিকে লাই দেওয়ার এই অভিযোগ খণ্ডাতে হলে দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঋণখেলাপিদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, ১৯৯৮ সালে প্রথম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতায়। বিআইবিএম ওই স্মারক বক্তৃতা আয়োজন করেছিল, আর ওই সময়ে আমি ছিলাম বিআইবিএমের মহাপরিচালক। তাঁর ওই প্রস্তাবটি ওই সময়ে দেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করলেও তদানীন্তন শেখ হাসিনার সরকার প্রতাপান্বিত ঋণখেলাপিদের পক্ষ নিয়ে তা বাস্তবায়িত করেনি। বিকল্প হিসেবে তখনকার সরকার ‘দেউলিয়া আইন’ পাস করেছিল ১৯৯৯ সালে। ১৪ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, বাংলাদেশে আজও একজন ঋণখেলাপিকেও চূড়ান্ত বিচারে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারেনি কোনো সরকার।
বরং ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পাঁচ বছরের পুরোনো মন্দ ঋণ অবলোপন করার নিয়ম চালু করে গত ১১ বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি অবলোপনকৃত মন্দ ঋণকে হজম করে ফেলার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে এ দেশের কয়েক হাজার রাঘববোয়াল ‘স্টার ঋণখেলাপিকে’। এ-সম্পর্কিত আমার গবেষণাগ্রন্থ A Profile of Bank loan Default in the Private Sector in Bangladesh-এ ১২৫ জন ঋণখেলাপির পুঁজি লুণ্ঠন ও দুর্নীতির কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ওই কাহিনিগুলো পড়লেই বোঝা যাবে, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের উপাখ্যান কিংবা বেসিক ব্যাংক লুটপাট উপাখ্যান এ দেশের দুর্নীতির অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান দাপটেরই নিয়ামক।
শুধু অর্থঋণ আদালতের মামলা দিয়ে এই মহাশক্তিধর পুঁজি-লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনা কিছুতেই সম্ভব হবে না এ দেশে। সে জন্য প্রয়োজন প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারে সোপর্দ করার জন্য পাঁচ বছরের জন্য একটি ‘ঋণখেলাপি বিচার ট্রাইব্যুনাল’ অবিলম্বে স্থাপন করা। এসব রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিই এ দেশের প্রকৃত দুশমন, এরাই পুঁজি পাচারকারী চক্রের পালের গোদা। সাহস ও সদিচ্ছা থাকলে এদের প্রতিরোধ করুন সর্বশক্তি দিয়ে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।