দূষিত রাজনীতির দায় শিক্ষিত সমাজেরও…মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের রাজনীতি বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। নব্বইয়ের পরে যে ‘গণতান্ত্রিক পর্বের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার আমাদের রাজনীতি ক্রমশ গণতান্ত্রিক, সুস্থ ও ইতিবাচক হয়ে উঠবে। প্রথম কয়েক বছর মোটামুটি ভালো চললেও পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে দূষিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে মূল ধারার রাজনীতি লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই রাজনীতিকে এখন ‘দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি’ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। তবে সত্যের খাতিরে বলা দরকার, সব রাজনৈতিক দল, নেতা বা কর্মীরা দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত নন। বড় দু-তিনটি দল, তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি অংশ, সংসদ সদস্যদের একটি অংশ, অঙ্গসংগঠনের নেতাদের একটি অংশ এই দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত। মূল দলের তুলনায় সংখ্যায় তাঁরা কম হলেও দলে ও সরকারে তাঁরা খুব প্রভাবশালী। অনেক দুর্বৃত্ত দলের নীতিনির্ধারণেও জড়িত। তাঁদের দাপটে, সন্ত্রাসে, অর্থ-বিত্তের ক্ষমতায় ও আত্মীয়তার জোরে দলের নীতিবান, সৎ, সজ্জন ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মীরা প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
আমার আজকের লেখা এই দুর্বৃত্ত রাজনীতিকদের নিয়ে নয়। তাঁদের সম্পর্কে অতীতে বহু লেখা হয়েছে। সচেতন মানুষ তাদের সম্পর্কে মোটেও বিভ্রান্ত নয়। আমার লেখার বিষয়: শিক্ষিত ও সচেতন মানুষদের ভূমিকা সম্পর্কে, যাঁরা এই দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার নন এবং নির্বাচনে তাঁদেরই ভোট দেন। সাধারণ মানুষসহ শিক্ষিত জনগণের ভোটেই এসব দল নির্বাচিত হয় ও সরকার গঠন করে। এসব দল বন্দুকের জোরে ক্ষমতা লাভ করে না। তারা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় গিয়ে যত অনাচার করে।
এখানে শিক্ষিত ও সচেতন জনগণকে আমরা দুভাবে দেখতে চাই। ক. রাজনৈতিক দলের প্রতি মোহহীন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ, খ. রাজনৈতিক দলের প্রতি মোহগ্রস্ত, দলের প্রতি অন্ধ, দলের প্রতি অনুগত শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ। দ্বিতীয় গ্রুপের (খ) ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই না। কারণ, তাঁদের অনেকেই ব্যক্তিত্বহীন, নিজের বিবেক বা বিবেচনাবোধ নেই, দলকানা ও দলদাস। আশার কথা, পুরো শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর তুলনায় এদের সংখ্যা খুবই কম। বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী স্বাধীন চিন্তা ও মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তাঁরা অনুগত নন। হয়তো অনেকে একটি দল সমর্থন করেন। সেই দলকে ভোটও দেন। কিন্তু দলের সমালোচনা করতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। নিজের পদোন্নতি বা বৈষয়িক কোনো লাভের জন্য তাঁরা দল সমর্থন করেন না বা ভোট দেন না। দেন নীতিগত কারণে, মনের তাগিদে।
আমাদের বড় দু-তিনটি দল নানা অগণতান্ত্রিক কাজে ব্যাপৃত, নানা সন্ত্রাসী কাজে মদদ দেয়। দলীয় নেতারা (মন্ত্রী) দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আরও নানা অপকর্ম করেন। প্রায় দেখা যায়, তার প্রতিবাদে শিক্ষিত-সচেতন জনগোষ্ঠী তেমন সোচ্চার নন। তাঁরা নেতাদের এই অপকর্মগুলো দেখেন, বুঝতেও পারেন। কিন্তু নিজেদের পরিমণ্ডলে বা প্রকাশ্য সভায় অপকর্মের প্রতিবাদ করেন না। জোরালো ভাষায় নিন্দা করেন না। সুযোগ থাকলেও রুখে দাঁড়ান না। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতায় তাঁরা আক্রান্ত। শিক্ষিত ও সচেতন জনগোষ্ঠীর খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ অপরাজনীতির প্রতিবাদ বা সমালোচনা করে লেখালেখি করেন বা কথা বলেন। বাকিরা যে অপরাজনীতিতে ক্ষুব্ধ হন না, তা নয়। তাঁরাও ক্ষুব্ধ। কারণ, তাঁদের আশপাশে প্রতিদিন অপরাজনীতির নানা প্রকাশ তাঁরা দেখতে পান। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে তাঁরা নীরব থাকেন।
আমরা এখানে বারবার ‘শিক্ষিত’ শব্দটি ব্যবহার করছি। আসলে বাংলাদেশে শিক্ষিত লোকের সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট নয়। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা ডিগ্রি নিলেই সমাজ তাঁকে শিক্ষিত বলে বিবেচনা করে। কিন্তু ডিগ্রি অর্জন করলেই তাঁকে কি প্রকৃত শিক্ষিত বলা যায়? তিনি কি দেশ, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সরকার, প্রশাসন ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন? ডিগ্রিধারীদের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ দেশ নিয়ে ভাবেন। আমরা এই নিবন্ধে যাঁদের শিক্ষিত বলছি, তাঁদের মনে হয় ‘সুশিক্ষিত’ বলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে। বাংলাদেশে শিক্ষিত শব্দটির খুব অপপ্রয়োগ দেখা যায়।
যার যার অবস্থান থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা একজন সুশিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তির কর্তব্য বলে আমরা মনে করি। সেই প্রতিবাদ রাজনৈতিক দলের মতো সহিংস প্রতিবাদ হবে না। সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন, লেখালেখি, টিভি টক শো, বিবৃতি ইত্যাদি ভঙ্গিতে হবে। কিন্তু ব্যাপকভাবে হবে। সোচ্চারভাবে হবে। এটা আমাদের আশা। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা দেখি না।
দেশে পেশাজীবীদের নানা ফোরাম রয়েছে। দুঃখের বিষয় বেশির ভাগ ফোরামই (সব নয়) বড় দুটি দল দ্বারা প্রভাবিত এবং কোনো কোনোটি রীতিমতো নিয়ন্ত্রিত। ‘পেশাজীবী ফোরাম’ যদি রাজনৈতিক দলের প্রভাবে বা নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, তাহলে তা আর পেশাজীবী ফোরাম থাকতে পারে না। পেশাজীবী ফোরামগুলো তাদের পেশাসংশ্লিষ্ট সরকারের ভুল নীতির প্রতিবাদ, অপরাজনীতির কারণে তাদের পেশা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এগুলো নিয়ে সোচ্চার হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। এখানেও বিভিন্ন পেশার নির্দল ব্যক্তিরা অপরাজনীতির ও সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন তাঁদের নীরবতা দিয়ে।
আজ যদি সচেতন ও সুশিক্ষিত নির্দল নাগরিক সমাজ সরকারের ভ্রান্তনীতি ও দেশের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সোচ্চার থাকত এবং সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থে (দলের স্বার্থে নয়) নানা দাবি তুলত, তাহলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। আজ দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, নানা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন না দেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার, সংসদ বর্জন, রাজপথে প্রতিবাদের নামে সন্ত্রাস, হরতালের নামে সন্ত্রাস, সরকারি ব্যাংক ও নানা সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনা, ঢাকা সিটি করপোরেশন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, বড় দুটি দলে একনায়কত্ব, পরিবারতন্ত্র, দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা না হওয়া, নির্বাচনে মনোনয়ন-বাণিজ্য, কিছু মিডিয়ার তথ্য-সন্ত্রাস—এ রকম ১০০টি বিষয় লিপিবদ্ধ করা যায়, যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো প্রতিটি সুশিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
আমাদের অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক দুর্নীতি ও সামগ্রিক অপরাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো কথাই বলেন না। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, পুঁজিবাদ, ধনতন্ত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলেন। প্রবন্ধ লেখেন। নিঃসন্দেহে এগুলো খুব প্রয়োজনীয় বিষয়। কিন্তু দেশের রাজনীতি যদি সুস্থ না হয়, গণতান্ত্রিক না হয়, বিচারব্যবস্থা যদি পক্ষপাতমুক্ত না হয়, জাতীয় সংসদ যদি কার্যকর না হয়, সরকারি প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি নিয়ম-নীতি বাদ দিয়ে দলীয়করণের নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে বুদ্ধিজীবীদের দাবি ও প্রত্যাশা কি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে?
আমরা প্রায় দূষিত রাজনীতির জন্য রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করি। নিন্দা করি। দূষিত রাজনীতি ও দুর্বৃত্ত নেতাদের যারা প্রশ্রয় দেয়, আমরা তাদেরও সমালোচনা করি। কিন্তু নির্দল নাগরিকও কি এ জন্য কম দায়ী? সবাই ভোট দিয়েই তো তাঁদের নেতা বানিয়েছি। আমাদের ভোটে জয়লাভ করেই তারা সরকার গঠন করে। আমরা তো তাদের ভোট না দিয়ে প্রত্যাখ্যান করিনি। অযোগ্য লোকদের নেতা ও সাংসদ করার জন্য আমরা কি কম দায়ী? আজ যদি দেশের সব সুশিক্ষিত ও সচেতন মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে দুর্নীতি ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন, নিয়মিত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতেন, তাহলে দুর্নীতি ও অপরাজনীতি এতটা বিস্তার লাভ করত না। নাগরিক সমাজ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজ সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্ত ব্যক্তিরা দেশের নেতা হতে পেরেছে। অযোগ্য ব্যক্তিরা দেশের কর্ণধার হয়ে উঠেছে। রাজনীতি আর লুটপাট আজ সমার্থক হয়ে গেছে। এই রুগ্ণ পরিবেশে সৎ, সজ্জন, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদেরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাঁদের সেবা থেকে দেশ আজ বঞ্চিত।
আবার নির্বাচন আসছে। আবার একটি দল বা জোট সরকার গঠন করবে। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্দল নাগরিক সমাজের উচিত এখন তাদের কর্তব্য কী, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করা।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।