দেশে কী হতে যাচ্ছে?..আনিসুল হক

যেখানেই যাবেন, আপনাকে একটা প্রশ্ন শুনতে হবে, সুযোগ পেলে আপনিও সে প্রশ্নটাই করবেন—কী হতে যাচ্ছে দেশে? ঠিক সময়ে কি নির্বাচন হবে? হলে কী হবে? না হলে কী হবে? কোনো সমঝোতা কি হবে? না হলে কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর একটা ধাঁধাচিত্র। সেই পাজলের টুকরাগুলো কোনো একটা হাতে আছে বলে মনে হয় না। সব টুকরা একখানে করলে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যাবে, কিন্তু মুশকিল হলো টুকরাগুলো একজনের হাতে নেই। কাজেই কেউই এ প্রশ্নের উত্তর জানে বলে মনে হয় না। সরকারের মন্ত্রীরা, সাংসদেরাও জানেন না। উত্তর বিরোধী দলের কাছেও আসলে নেই।
কিন্তু আমরা আঁচ-অনুমান করতে পারি। পাঁচ সিটির নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীদের পরাজয়ের পরে সংকেত স্পষ্ট। সরকারি জোট জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। পত্রিকান্তরে আরও একটা জনমত জরিপের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয়তার দৌড়ে বিএনপি বেশ এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগের চেয়ে। আওয়ামী জোটের জনপ্রিয়তা কমার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ, তার জোট ও সরকার তাদের ভালো কীর্তিগুলো ঠিকভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। কাজেই তারা কোমর বেঁধে নেমেছে সরকারের সাফল্যগাথা প্রচারের অভিযানে। জনগণকে অবহিত করে তাদের চিত্তজয়ের বাসনা ও প্রচেষ্টা ভালো উদ্যোগ, আমাদের সমালোচনা করার কিছু নেই, যদি তা আইনকানুন মেনে করা হয়। আর অতিরিক্ত প্রচারণা বা প্রচারণার ভুল কৌশল হিতে বিপরীতকে ডেকে আনতে পারে, সেটা তাদের মাথাব্যথার ব্যাপার, মাথা যাদের। বিনয়ের বদলে দম্ভ এই দেশের মানুষ কোনো দিনও ভালো চোখে দেখেনি, অতীতে সব নির্বাচনেই আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।
এখন প্রশ্ন হলো, সমঝোতা হবে কি না, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে কি না।
এই প্রশ্নের উত্তর যাঁর কাছে আছে, আমরা তাঁকে এই সময়ের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ, অবহিত, বিচক্ষণ ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা বলে সম্মান জানাব। লক্ষণ বিচারে মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকার চায় না বিরোধী দল ও জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। তারা যদি কোনো দাবিদাওয়া ও শর্ত আরোপ না করে এই সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চায়ও, তবু সরকারি দল এমন কিছু করবে, এমন কথা বলবে, যাতে বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে বিএনপি জানে, একটা মোটামুটি মানের নির্বাচন হলেই তারা জয়লাভ করবে। সে ক্ষেত্রে তারা চাইবেই, নির্বাচন যেন ভন্ডুল না হয়। দেশে একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হোক, আর ফলে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যাক, সেটা হবে তাদের শেষতম চাওয়া। ধৈর্য ধরে আর কটা দিন পার করে একটা নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেই যদি ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, সেটাকেই তারা স্বাগত জানাবে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে করে বিএনপি ও তাদের জোটের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তারা কী করবে। এখানেই বিএনপিকে পা ফেলতে হচ্ছে অঙ্ক কষে কষে, বড় সাবধানে। বড় ধরনের গণবিক্ষোভ তৈরি করার ক্ষমতা বিএনপি ও তার জোটের আছে, না থাকলেও তারা চেষ্টা করে দেখতে পারে। তার পরিণতি কী হবে, এটা সম্ভবত কেউ জানে না। আল্লাহ না করুন, যদি এক-এগারোর মতো কিছু ঘটে যায়, আর নির্বাচন যদি তিন-চার বছর পিছিয়ে যায়, তাহলে মানুষ সব ভুলে যাবে। এই দেশের মানুষ দূর অতীতের কথা মনে রাখতে পারে না। তখন দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই দেশে যে বিরোধী দলের কাতারে থাকে, সে-ই জনপ্রিয় হয়, যে সরকারে থাকে, সে-ই জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে, কখনো কখনো জন-অপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিএনপির অবস্থানের এই সাবধানতা ও স্পর্শকাতরতার সুযোগই নিতে চাইছে সরকারি দল।
কিন্তু বিএনপি জোটকে বাদ দিয়ে কোনো একটা নির্বাচন আয়োজিত হলে কী হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬-এর নির্বাচনও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী মিলে প্রতিরোধ করতে পারেনি, যদিও সেই নির্বাচনের বিজয়ীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কেবল দিয়েছে, দেশ পরিচালনা করতে পারেনি। তর্কের খাতিরে যদি ধরা হয়, দেশে একটা একতরফা নির্বাচন হয়ে গেল, তারপর কি আওয়ামী জোট দেশ শাসন করতে পারবে? বিএনপি জোট যদি সত্যি জনপ্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে তা হয়েছে এই সরকার ও তার দল-উপদল-সহযোগীদের আচার-আচরণ-ব্যর্থতার কারণে। কোনো জনপ্রিয় জোটকে ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতার বাইরে রেখে দেশ শাসন করা যায় বলে মনে হয় না। সেটা দেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না, বিদেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না।
কাজেই দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেখলে একটাই বিকল্প সামনে আছে, সরকারের উচিত এমন একটা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বিরোধী দল অংশগ্রহণ করতে পারে। তারপর যদি এখনকার সরকারি জোট হেরে যায়, বিরোধী দল জয়লাভ করে, উচিত হবে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। ক্ষমতা হস্তান্তরের সেই প্রক্রিয়া যেন শান্তিপূর্ণ হয়, দেশের কোনো একটা অংশেও যেন অরাজকতা না হয়, সব দল, মত, ধর্ম, গোষ্ঠীর মানুষ যেন নিরাপদে থাকে, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকা উচিত সব পক্ষের। আর একটা চমৎকার, নিরপেক্ষ, সব দলের অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে যদি বর্তমান সরকারি জোট পুনর্নির্বাচিত হয়ে আসে, সেটাও তখন বিরোধী জোটকে মেনে নিতে হবে, মেনে নিতে তারা বাধ্য হবে। এই সরকারের প্রধান কর্তব্য তাই একটা সুন্দর নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, সুন্দর নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়, কিন্তু নির্বাচনে যদি জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে সেটা গণতন্ত্রই নয়। আমাদের সব চেষ্টা এখন হওয়া উচিত সুন্দর নির্বাচনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সেখানেই আসে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে ন্যূনতম একটা সমঝোতার সেতু নির্মাণ করার কথা। এ জন্য যে প্রকাশ্য সংলাপ আয়োজন করতে হবে, তারও হয়তো দরকার নেই, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমেও সেটা সম্ভব।
আসল কথা হলো সদিচ্ছা। সরকারের আদৌ সদিচ্ছা আছে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
এর পরে আসে আরও দুটো প্রশ্ন। আমরা যেখানে যাই, এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই। মানুষজন আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, সরকার কি আসলেই মনে করে, তারা কোনো ভুল করেনি, যা করেছে, ঠিক করেছে? মানুষই ঠিকভাবে বুঝছে না বা মানুষকে ঠিকভাবে জানানো যায়নি বলেই তারা সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার ধারণা, সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এটা বিশ্বাস করেন। কারণ, তাঁরা বন্দী থাকেন প্রটোকলের দেয়াল দিয়ে। তাঁদের কাছে জনগণের কাঁচা চাওয়া-পাওয়া, হতাশা-ক্ষোভের খবর পৌঁছায় না। আমলারা, প্রশাসনযন্ত্র, সিস্টেম তাঁদের জনগণের মন পড়তে দেয় না। তা যদি হয়, তার পরিণতি আরও খারাপ হবে। সরকারি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, তাঁরা অনেক ভুল করেছেন। তাঁদের সেসব ভুল থেকে এখনই সরে আসতে হবে দৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে, চোখে পড়ার মতো করে। আর ভুল স্বীকার করে বিনয়ের সঙ্গে অঙ্গীকার করতে হবে যে এসব ভুলের পুনরাবৃত্তি তাঁরা আর করবেন না। যেখানে যেখানে যারা অন্যায় করেছে, অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করতে হবে।
অন্যদিকে বিএনপি আসছে, এই কথার সঙ্গে বহু ব্যক্তি-মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্ক তৈরি হয়। আতঙ্কের একটা কারণ, তাদের ২০০১ থেকে ২০০৭-এর দুঃস্বপ্নের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আরেকটা কারণ হলো, বিএনপি যে নিজেকে আধুনিক প্রগতিশীল দল হিসেবে ঘোষণা করেছিল, নির্বাচনী রেডিও-টিভি বক্তৃতায় যেটা বেগম জিয়া নিজের মুখে বলেছিলেন, সেখান থেকে কি তারা সরে এল? বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে কি হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলো মেনে নেওয়া? গার্মেন্টসে মেয়েরা কাজ করতে যাবে না? প্রাথমিক শিক্ষার পরে মেয়েরা আর স্কুল-কলেজে পড়বে না? যুদ্ধাপরাধের বিচার স্থগিত হয়ে যাবে বা অপরাধীরা মুক্তি পাবে? তারা কি আবার মন্ত্রী হবে? তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়বে?
বিএনপি দেশে অনেকবার ক্ষমতায় ছিল। তারা জানে, দেশকে এগিয়ে নিতে হবে নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এই জায়গায় বিএনপিকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তাদের বলতে হবে, যুদ্ধাপরাধীদের তারা সঙ্গে নেবে না, যুদ্ধাপরাধী দলগুলোকে তারা বর্জন করবে, যুদ্ধাপরাধের বিচার তারা অব্যাহত রাখবে, যাদের সাজা পাওয়ার, তাদের সাজা দেওয়া হবে। আজকেই যদি বিএনপি এই ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশের কোটি তরুণ প্রাণের সমর্থন তারা লাভ করতে পারবে।
আমরা জানি, মানুষের মনে এই আতঙ্কও আছে, হায় হায়, বিএনপি জোট যদি আবারও ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশের কী হবে! আবার একই মানুষ এও বলেন, হায় হায়, এই মহাজোট যদি আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা যে বাড়াবাড়ি করবে, তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? উভয় জোটকে এই আতঙ্ক দূর করতে হবে। বিএনপিকে বলতে হবে, তারা ক্ষমতায় এলে ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করবে না, দেশ জঙ্গি ও মৌলবাদী হয়ে যাবে না। আওয়ামী লীগকে বলতে হবে, তারা ক্ষমতায় এলে সংযত হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে, লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য বিশেষ অভিযান হাতে নেবে। মানুষ এ-পক্ষের আচরণে আতঙ্কিত হয়ে ও-পক্ষের দিকে তাকাচ্ছে, ও-পক্ষের চেহারা দেখে ভীত হয়ে এ-পক্ষের দিকে তাকাচ্ছে এবং তাদের চোখে-মুখে জমা হচ্ছে রাশি রাশি আতঙ্কের অন্ধকার। এটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। এতে গণতন্ত্র ব্যাহত হতে পারে।
কিন্তু গণতন্ত্রের তো কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্রের বিকল্প হলো আরও গণতন্ত্র। বাকস্বাধীনতার বিকল্প হলো আরও বাকস্বাধীনতা। আমরা গত ২৩ বছরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় অনেক দিক থেকেই অনেক ভালো করেছি, উন্নতি করেছি। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
অনেকেই হয়তো অনেক অঙ্ক কষছেন, অনেক চাল তৈরি করছেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। নিজের পাতানো ফাঁদে অনেক সময় নিজেকেই পড়তে হয়। সেটা যেন সর্বপক্ষ মনে রাখে। একটা সুন্দর শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক, তারা যদি উন্নততর আচরণ করে, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, উদার, উন্নয়নবান্ধব, নারীবান্ধব, দুর্নীতিবিরোধী একটা দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আসে, নিজেদের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আসে, তাতে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।
দেশে যদি গণতন্ত্র থাকে, তাহলে কোনো সরকারের পক্ষেই জনবিরোধী, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মৌলিক চেতনাবিরোধী কোনো অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। যদি সে চেষ্টা হয়, রাজপথেই তার ফয়সালা করা সম্ভব। বাংলাদেশের কোটি কোটি তরুণ তাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে পেছনের দিকে যেতে দেবে না।
কাজেই বেশি আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। নিশ্চয়ই দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষই পৌঁছে দেবে মানুষকে। তবে তার জন্য বেশি মূল্য যেন আমাদের দিতে না হয়, তা দেখার দায়িত্ব দেশনেতাদের।
মানুষ কিন্তু তার পরিবার-পরিজনের জানমালের নিরাপত্তা চায়, রাস্তায় বেরিয়ে অক্ষত দেহ-মন নিয়ে ঘরে ফিরতে চায়, সন্তানের লেখাপড়ার পরিবেশ চায়, নিজের আয়-উন্নতির ক্ষেত্র চায়। সেটা যেন কিছুতেই বিঘ্নিত না হয়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।