মানব পাচার

ধরাছোঁয়ার বাইরে ২৪ চক্র

na

সাগরপথে মানব পাচার বন্ধে থাইল্যান্ড কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে পাচার কারবারের মূল উৎসভূমি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে এ ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ নেই। আর মালয়েশিয়া পাচারকারীদের শেষ গন্তব্য হলেও সেখানকার সরকারও চুপ।
মানব পাচারে জড়িত স্বদেশি চক্রগুলোকে ধরার জন্য থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। গতকাল এই সময়সীমা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে চিহ্নিত ৪৫ জন ধরা পড়লেও ১৭ জন পলাতক। এদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। নইলে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।
সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই গতকাল সোমবার পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন সাতুন প্রদেশের প্রশাসনিক সংস্থার (প্রভিনশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্গানাইজেশন) সাবেক প্রেসিডেন্ট পাজুবান অংকাচোতেফান। যিনি ‘কো তং’ বা ‘বড় ভাই’ বলে পরিচিত। পাচারকারী চক্রগুলোর মধ্যে তিনি সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে মনে করা হয়। সপরিবারে পলাতক ছিলেন তিনি। থাই পুলিশপ্রধান সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর আত্মসমর্পণের খবরটি জানান।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে সাগরপথে মানব পাচারে জড়িত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ২৪টি চক্রের প্রধানের নাম পাওয়া গেছে। এগুলোর ১১টি বাংলাদেশকেন্দ্রিক ও ১৩টি মিয়ানমারকেন্দ্রিক। মিয়ানমারের একটি চক্রের প্রধান ছাড়া অন্য সবাই বহাল তবিয়তে আছেন। মিয়ানমারের ওই চক্রপ্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে থাইল্যান্ডের পুলিশ গত ২৮ এপ্রিল। মূলত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই ১ মে জঙ্গলে গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।
মানব পাচার বন্ধে বাংলাদেশের উদ্যোগ না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারের মানুষ বেশি জড়িত। বিশেষ করে মিয়ানমারের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকার মানুষ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যারা জড়িত আছে, আমরা খবর পেলেই সঙ্গে সঙ্গে আটক করছি। এ ছাড়া যেসব দালাল চক্র এসব করছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।’
সংখলার মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংগঠন ও মানব পাচারকারীদের ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের শীর্ষস্থানীয় মানব পাচারকারীদের নাম পাওয়া গেছে। এঁরা চক্রের সদস্যদের কাছে ‘বস’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চক্রের প্রধান শরীফ ওরফে ‘শরীফ বস’। তিনি বেশির ভাগ সময় থাকেন মালয়েশিয়ায়।
এরপরই যাঁর নাম আসে, তিনি ‘কালাম বস’। বাড়ি যশোরে। বেশির ভাগ সময় থাকেন মালয়েশিয়ায়। সাগরপথ চালু হওয়ার আগে কালাম আকাশপথে ঢাকা থেকে লাওস ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে লোক পাঠাতেন। মালয়েশিয়ায় বসে আরেকটি চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন কিবরিয়া। তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের কোথায়, তা জানা যায়নি।
কক্সবাজারের টেকনাফের মিস্ত্রিপাড়ার মো. আমিন, আক্তার হোসেন মাঝি, দক্ষিণ নয়াপাড়ার আনার আলী, রঙিখালীর সলিমুল্লাহ, শাহপরী দ্বীপের মো. আবু তৈয়ব, উখিয়ার থাইয়ংখালীর মো. সুমন আলাদা চক্রের প্রধান। এঁরা শুরুতে মিয়ানমারের বড় দালালদের হয়ে কাজ করতেন, এখন নিজেরা একেকটা চক্র গড়ে তুলেছেন। সবাই থাকেন মালয়েশিয়ায়।
এর বাইরে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত থেকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের সমুদ্রপথে পাচারে যুক্ত মিয়ানমারের দুটি চক্র। চক্র দুটির প্রধান দিন মোহাম্মদ (মিয়ানমারে থাকেন) ও আবদুল গফুর (মালয়েশিয়ায় থাকেন) আরাকানের অধিবাসী। এসব চক্রের হয়ে লোক জোগাড়ের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় এঁদের বিরাট দালাল বাহিনী আছে।
এ ছাড়া থাইল্যান্ডের জঙ্গলে যাঁর যাঁর লোকদের নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশি প্রতিটি চক্রের লোক থাকে। যাঁদের এখানে বলা হয় ‘এজেন্ট’। সংখলা এলাকায় বাংলাদেশি চক্রের কথিত এজেন্ট ছিলেন অন্তত ৩০ জন। তাঁদের এখানকার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানায়, থাই সরকার অভিযান শুরুর পর এঁরা ব্যাংককের দিকে পালিয়ে যান। সেখান থেকে কেউ কেউ কম্বোডিয়া চলে গেছেন।
এখনো ব্যাংককে আছেন, এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, চক্রপ্রধান যেখানেই থাকুক, মুক্তিপণের টাকার লেনদেন হয় বাংলাদেশে। মুক্তিপণ দিয়ে থাই জঙ্গল থেকে ছাড়া পেয়েছেন—এমন অনেকে দেশে ফিরেছেন, আবার অনেকে থাই কারাগারে আছেন। এমন অন্তত ২০ জনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তাঁরা জানান, তাঁদের পরিবারের লোকজন বিকাশের মাধ্যমে টাকা দিয়েছেন।
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মালয়েশিয়াভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন কেরাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, চক্রপ্রধান যেখানেই থাকুক, টাকার লেনদেন বাংলাদেশে হলে সরকারের উচিত সেই নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারকে সে দেশে অবস্থানরত এসব অপরাধীকে ধরার জন্য চাপ সৃষ্টি করা উচিত।
এদিকে থাইল্যান্ডের স্থানীয় পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, চার দেশের চক্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলেন আনোয়ার হোসেন। আরাকানে জন্ম হলেও তিনি থাইল্যান্ডের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তাঁকে সংখলার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
তবে থাইল্যান্ডে বসবাসরত আরাকানের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের একটি সূত্রের দাবি, আনোয়ারের গুরু হলেন হাফেজ আহাম্মদ। তিনি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে থাকেন। সাগরপথে মানব পাচারের ক্ষেত্রে তাঁকে অন্যতম উদ্যোক্তা মনে করা হয়।
এ দুজন ছাড়াও আরাকানের সৈয়দ করিম, মোহাম্মদ আলী, আবদুর রশিদ, ইসমাইল, মো. হোসেন, মো. আইয়াজ, দিন মোহাম্মদ, হামিদুল্লাহ, মো. আরিফ ও শফিক আলাদা চক্রের প্রধান। এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জন থাইল্যান্ডে, আইয়াজ মালয়েশিয়ায় ও অন্যরা মিয়ানমারে থাকেন বলে জানা গেছে।
গত পাঁচ দিনে সংখলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু সূত্র ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাঁরা জানান, এ চক্রগুলো খুবই ভয়ংকর এবং তাদের সঙ্গে থাই পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের যোগাযোগ রয়েছে।
তাঁদের এসব বক্তব্যের বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। থাই সরকার মানব পাচারকারী চক্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে এই এলাকার ৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করেছে। এঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
১ মে থাইল্যান্ডে পাচারের শিকার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গণকবর পাওয়ার পর পাচারবিরোধী বড় অভিযান শুরু করে থাই কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে ৬২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ৭ মে থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল পুলিশের প্রধান সোমইয়োত পোম্পানমং গণমাধ্যমকে জানান, পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে মানব পাচারকারীদের ধরার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচা নির্দেশ দিয়েছেন।
এরপর অনেকে গ্রেপ্তার ও অনেকে আত্মসমর্পণ করেছেন। সব মিলিয়ে ৪৫ জন আইনের আওতায় এসেছে। অন্য ১৭ জনকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তাঁদের সম্পদ জব্দ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।