তথ্যপ্রযুক্তি আইন

নতুন একটি কালাকানুন?..তানজিম আল ইসলাম

অবশেষে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) অধ্যাদেশে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আর এর মধ্য দিয়ে আরও একটি কালাকানুন অধ্যাদেশ আকারে পাস করার প্রক্রিয়া শুরু হলো। জনমত যাচাই ও সংসদে আলাপ-আলোচনা না করে তড়িঘড়ি এই অধ্যাদেশ পাসের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্য দিয়ে বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি খড়্গ তৈরি করা হচ্ছে। একটা প্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের পুলিশি হয়রানি করার আরও একটি অস্ত্র রাষ্ট্র তৈরি করে দিতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে চারটি ধারা অজামিনযোগ্য করা হয়েছে। এর সঙ্গে বর্ণিত অপরাধ আমলযোগ্য করা হয়েছে। সঙ্গে সাজার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০০৬ সালে যখন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন পাস করা হয়েছিল, তখনই আইনটিতে বেশ অস্পষ্টতা ছিল। বিশেষ করে প্রস্তাবিত যে চারটি ধারায় সংশোধন আনা হচ্ছে—৫৪, ৫৬, ৫৭ ও ৬১ ধারা একেবারেই ত্রুটিপূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আমরা যদি ৫৭ ধারার ১ উপধারাটির কথাই ধরি, এখানে বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্য ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যাঁর দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে তাঁর এই কাজ হবে অপরাধ।’ এর মানে হচ্ছে, রাষ্ট্র যথেচ্ছভাবে কোনটি মানহানি কিংবা অশ্লীল বক্তব্য, যা আইনশৃঙ্খলার পর্যন্ত অবনতি ঘটাবে, তা নির্ধারণ করতে পারবে। আবার যেনব উক্তি কাউকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তা-ও অপরাধ হবে। এ রকম একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারা ও অস্পষ্ট উপায়ে অপরাধ নির্ণয় করার পর যদি তা আবার জামিন অযোগ্য অপরাধ করা হয়, তাহলে আইন রাষ্ট্রের কল্যাণে না থেকে অরাজকতা তৈরিতে আরও এক ধাপ এগোবে, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এই অধ্যাদেশে অপরাধ যদি আমলযোগ্য করা হয়, তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতার যে ব্যাপকতা, তা নষ্ট হবে, এটি দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়। নাগরিকেরা অহেতুক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ভয়ভীতির মধ্যে থাকবে।
২০০৬-এর আইনের অধীন পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করার কথা উল্লেখ আছে, ট্রাইব্যুনাল যেখানে গঠিত হয়নি, সেখানে দায়রা আদালতকে বিচারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এত দিন কোনো অভিযোগ এলে তা সরাসরি আমলে নিতে পারতেন না ট্রাইব্যুনাল কিংবা দায়রা আদালত। প্রথমেই অভিযোগটি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং পুলিশ প্রতিবেদনে অভিযোগটির সত্যতা মিললেই বিচারক সেই অপরাধ আমলে নিতে পারতেন এবং বিচারের জন্য প্রস্তুত করতেন। পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ আমল-অযোগ্য বিধায় আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করত। আদালতের পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারত না। অর্থাৎ আইনটিতে অস্পষ্টতা থাকলেও আমল-অযোগ্য থাকায় এবং জামিনযোগ্য অপরাধ হওয়ায় কিছুটা হলেও নাগরিক হয়রানি কম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
অন্তত দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধ করা ব্যক্তিটি জামিনে থাকতে পারত। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি পাস হলে নাগরিকের নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের আগেই জেলে থাকতে হবে দিনের পর দিন। এতে করে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রতার খড়্গ বয়ে বেড়াচ্ছে। বিচারের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের পন্থা আবিষ্কার না করে এবং বিচারব্যবস্থার পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো সারানোর দিকে আগে লক্ষ না রেখে শুধু সাজা বাড়িয়ে অপরাধ জামিনযোগ্য করলে কোনো লাভই হবে না। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে এর বিচার-প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিচারের মতোই পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। অর্থাৎ সাক্ষী, জেরা, জবানবন্দি সব প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে চলবে। অথচ সাক্ষ্য আইনে এখন পর্যন্ত কম্পিউটার বা ই-মেইলে কোনো সাক্ষী গ্রহণযোগ্য কি না, তা বলা হয়নি স্পষ্ট করে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের ভারও অন্যান্য আইনের মতো অভিযোগকারীর ওপর বর্তাবে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী তার ব্যবহূত কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক যন্ত্র দিয়ে সাদামাটা অভিযোগ করে যদি বলে যে প্রতিপক্ষ তাকে নীতিভ্রষ্ট করার জন্য চেষ্টা করেছে, তাহলেই কি অভিযোগ কার্যকর হয়ে যাবে? পুলিশও কি এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক কোনো অনুসন্ধান না করে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়ে দেবে? আর যেহেতু জামিনের অযোগ্য অপরাধ, আদালতও অভিযুক্তকে জামিন না দিয়ে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেবেন! প্রস্তাবিত সংশোধনীটি অধ্যাদেশ আকারে এলে এমনই ঘটবে।
আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এখন প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে পুলিশকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে যে নাগরিকদের হয়রানি করবে না কিংবা সামান্য অভিযোগে যাকে-তাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে ঢোকাবে না, এর গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারে? বরং এই অধ্যাদেশের কারণে পুলিশকে আরও বিতর্কিত করার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। কোনো মামলায় অভিযুক্তের জামিন হবে কি হবে না, এটি নির্ভর করে অপরাধের মাত্রা ও ধরনের ওপর, যা আইনে নির্দিষ্ট করা আছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মতো একটি ব্যাপক পরিধির ক্ষেত্রে অপরাধ স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন করা প্রয়োজন এবং এর ওপর ভিত্তি করেই অপরাধ জামিনযোগ্য কিংবা অযোগ্যের মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
তানজিম আল ইসলাম: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
tanzimlaw@yahoo.com