ঝুঁকিতে মানুষ, সেতু, সড়ক

নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ আ.লীগ নেতার

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় বাঙ্গালী নদীর একটি শাখার বুকের মধ্যে খননযন্ত্র বসিয়ে মাটি তুলে এপাড় ওপাড় আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পানির স্রোত বন্ধ করে তাতে মাছ চাষ করছেন স্থানীয় এলাঙ্গী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা।প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই অবৈধ কাজের ফলে উজানে মূল নদীতে পানির তোড় ও চাপ বেড়েছে। ফলে সংলগ্ন শেরপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম, ধুনট-শেরপুর সড়ক ও সে সড়কের বথুয়াবাড়ী সেতু ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।গত ১৩ জুলাই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর বাসিন্দারা বাঁধটি কেটে দেওয়ার জন্য বগুড়ার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে আবেদন করেছেন। ডিসির নির্দেশে তদন্তের পর উপজেলা প্রশাসন নদী দখলের কথা নিশ্চিত করে প্রতিবেদন দিয়েছে আগস্টের শেষ দিকে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত বাঁধ উচ্ছেদের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।এদিকে নদী দখল করে মাছ চাষের হোতা হিসেবে অভিযুক্ত সরকারদলীয় নেতা এম এ তারেক আবার এলাঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানও। বাঁধসংলগ্ন দু-তিনটি গ্রামে তাঁর এ কাজের প্রতি সমর্থন রয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত বাঁধের ওপর ২০টিরও বেশি দোকানঘর বসানোর কাজ চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শ খানেক মানুষ জড়ো হয়ে যান। তাঁরা সাংবাদিকের কাছে বাঁধ ও মাছ চাষের পক্ষে কথা বলতে থাকেন। আর মোটরসাইকেলে করে চলে আসেন ইউপি চেয়ারম্যান তারেক।

তারেক দাবি করেন, এটি কোনো নদী নয়, একটি খাল মাত্র। সত্তরের দশকে গ্রামবাসী সেচ-সুবিধার জন্য মাটি কেটে খালটিকে নদীর সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিল। কিন্তু পরে ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়ে এবং একটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে যায়।

তারেক আরও বলেন, ‘এ কারণে কয়েক গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে বাঁধ দিয়েছে। আমি শুধু তাতে সমর্থন করেছি মাত্র। যাঁদের জমিতে খাল, তাঁরাই সেখানে মাছ চাষ করছেন।’

পরে তারেককে দোকানঘর নির্মাণের তদারক করতে দেখা যায়। একাধিক এলাকাবাসী বলেন, তারেকের উদ্যোগেই নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। তাঁর নির্দেশেই বাঁধে তড়িঘড়ি করে বাজার বসানো হচ্ছে, যাতে প্রশাসন সহজে বাঁধটি কাটতে না পারে। বাঁধ দেওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নদীতে মাছ চাষ।

এদিকে সরেজমিনে দেখে এবং প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাঙ্গালি নদী এলাঙ্গী ইউনিয়নের নবীনগর গ্রামসংলগ্ন বিলচাপড়ী মৌজায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এর মূল ধারাটি বথুয়াবাড়ী সেতু হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। ওদিকে শাখাটি শৈলমারী ও নবীনগর গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার গিয়ে মূল নদীর সঙ্গে মিশেছে।

কয়েক মাস আগে তারেকের নেতৃত্বে নবীনগর, শৈলমারী ও তারাকান্দি গ্রামবাসী তাঁর সমর্থকেরা এই অংশেই বাঁধ দিয়েছেন। শাখার দুই মাথায় নদীর মূল স্রোতের সংযোগস্থলে জালের ঘের দিয়ে তাঁরা বাঁধের দুই পাশেই মাছ চাষ করছেন।

গ্রামবাসী বাবলু আকন্দ বলেন, বাঁধটি তৈরি করতে চারটি খননযন্ত্র ব্যবহূত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নবীনগরের কয়েক হাজার মানুষের পানিবন্দী থাকা কাটানোর জন্যই চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাঁধ দেওয়ার পরপরই নদীর উজান এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ায় ধুনটসংলগ্ন শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, চৌবাড়িয়া, সলিফা, গজারিয়া, বড়ইতলীসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে।

চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আবদুল করিম ও তফিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে বাঁধ দেওয়ার পর থেকে এই এলাকার অন্তত আটটি গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। বাড়িঘর ভাঙছে, তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, উজান এলাকার কয়েকটি গ্রামের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তের জন্য ধুনটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দেন। ইউএনও মো. হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাঁধ দেওয়া অংশটি সরকারি নথিতে বাঙ্গালি নদী হিসেবেই চিহ্নিত।

ইউএনও জানান, তিনি সম্প্রতি পুলিশ নিয়ে বাঁধ পরিদর্শনে যান এবং উজানের ফসলি জমি, ধুনট-শেরপুর সড়ক ও বথুয়াবাড়ী সেতুটির ঝুঁকির প্রমাণ পান। কিন্তু এলাকাবাসীর বাধার মুখে তাঁকে চলে আসতে হয়। পরে তিনি উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের কানুনগোকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। কানুনগো ২৫ আগস্ট প্রতিবেদন দিলে সেটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বাঁধ নির্মাণকে অবৈধ চিহ্নিত করে সেতু ও সড়কের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।

এদিকে যোগাযোগ করা হলে বগুড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম সরদার প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে বাঁধ দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।