পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড

নভেম্বরের মধ্যে মজুরি ঘোষণা নিয়ে সংশয়

আগামী নভেম্বরের মধ্যে পোশাক-শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ঘোষণা দেওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
মজুরি বোর্ডের সদস্যদের সাত দিনের বিদেশ সফর, ঈদের ছুটি, খসড়া সুপারিশের ওপর জনমত নেওয়া, শ্রম মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা, আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই (ভেটিং) শেষ করে চূড়ান্ত সুপারিশ পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া, তাতে নভেম্বর পার হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে মজুরি বোর্ডের একাধিক সদস্য মনে করেন, সদিচ্ছা থাকলে এটা সময়মতো দেওয়া সম্ভব।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চার দিন ধরে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। এ অবস্থায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গত সোমবার গভীর রাতে মালিক ও শ্রমিকনেতাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে সভা করেন। ওই বৈঠক থেকে নভেম্বরের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার জন্য মজুরি বোর্ডকে অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত হয়।
নভেম্বরে মজুরি ঘোষণা সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রমসচিব মিকাইল শিপার প্রথম আলোকে বলেন, মজুরি বোর্ডের বৈঠকের পর যে নিয়মিত কাজকর্ম রয়েছে তাতে আরও ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লেগে যাবে। আর মজুরি বোর্ডের খসড়া প্রতিবেদনে যদি কোনো পক্ষের দ্বিমত থাকে, তাহলে রিভিউ (পুনর্মূল্যায়ন) করার সুযোগ থাকবে। তিনি বলেন, ‘তবে আমরা চেষ্টা করব পর পর সভা করে দ্রুত খসড়া প্রতিবেদন জমা দিতে।’
এই পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের নেতারা তাঁদের দায়িত্বে থাকা পোশাক কারখানাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে শ্রমিকদের শান্ত রাখতে সভা করবেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হবে।
আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন আর সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর দেশীয়-আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বেতন, জীবনমান বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ জুন এ কে রায়কে প্রধান করে সিরাজুল ইসলাম, আরশাদ জামাল, কাজী সাইফুদ্দিন, কামাল উদ্দিন, ফজলুল হক ও সচিব মো. আবু হাসনাতকে নিয়ে মজুরি বোর্ড গঠিত হয়।
বোর্ডে শ্রমিকনেতারা সর্বনিম্ন আট হাজার ১১৪ টাকা মজুরি দাবি করেন। বিপরীতে মালিকপক্ষ ৬০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। শ্রমিকেরা এখন ন্যূনতম মজুরি পান তিন হাজার টাকা। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে মজুরির এই ব্যাপক ব্যবধান দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মানুযায়ী, চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় পাবে বোর্ড।
গঠনের পর মজুরি বোর্ডের সদস্যরা কয়েকটি বৈঠক করেছেন। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ। কিন্তু বোর্ডের আগের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ অক্টোবর বোর্ডের পরবর্তী সভা হবে। এর আগে তাঁরা ঢাকায় আরও একটি কারখানা পরিদর্শনে যাবেন। এরপর তারা ‘অন্য দেশের শ্রমিকদের কীভাবে মজুরি দেওয়া হয়, সে বিষয়ে আধুনিক ধারণা নিতে ও অধিকতর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে’ ২৯ সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড সফর করবেন। থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কার্যালয়ে বৈঠক করবেন তাঁরা।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আইএলও এ সফরের সব খরচ বহন করবে। এক সপ্তাহ পর ৪ বা ৫ অক্টোবর তাঁরা দেশে ফিরবেন। দেশে ফিরে যাবেন চট্টগ্রামে, দুটি কারখানা পরিদর্শন করতে। তার পরই শুরু হবে ঈদের ছুটি। ছুটির পর ২১ অক্টোবর মজুরি বোর্ডের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা পাঁচ দিন বৈঠক করেও বোর্ড যদি খসড়া সুপারিশ শ্রম মন্ত্রণালয়কে জমা দেয়, তবে মন্ত্রণালয় এ প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করবে। এরপর তা মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। ১৫ দিন ওয়েবসাইটে থাকবে। তারপর সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে এবং আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিংয়ের জন্য প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে। তারপর চূড়ান্ত সুপারিশ শেষে গেজেট প্রকাশ।
মজুরি বোর্ডের বিদেশ সফর জরুরি কি না, জানতে চাইলে শ্রমসচিব বলেন, ‘আধুনিক মজুরি স্কেল ও পদ্ধতি সম্পর্কে জানার জন্যই মজুরি বোর্ডের সদস্যদের এ সফর আয়োজন করতে আমরা আইএলওকে অনুরোধ জানিয়েছি।’
বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি ও মজুরি বোর্ডের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার বিষয়টি বিভ্রান্তিকর। সবার যদি সদিচ্ছা থাকে তবে ২১ অক্টোবর মজুরি বোর্ডের পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় স্বল্পসময়ের মধ্যে মতামত দিলে অক্টোবরেই মজুরি ঘোষণা হয়ে যাবে।
সে ক্ষেত্রে কী করতে হবে—জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষকেই অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এমনকি সদস্যদের সবার সম্মতি নিয়ে ২১ অক্টোবরের আগেই এক বা একাধিক বৈঠক করতে পারেন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান।
পরিস্থিতি শান্ত রাখার পরামর্শ: গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের ১১ জন নেতার সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় বৈঠক করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। বৈঠকে মন্ত্রী পরিস্থিতি শান্ত রাখতে নেতাদের সহায়তা চেয়েছেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নেতারা বিভিন্ন এলাকায় যৌথভাবে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া পরিস্থিতি শান্ত রাখতে মাইকিং করা, বারবার সভা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সমন্বয় পরিষদের সদস্য কামরুল আহসান বলেন, ‘আমাদের যাঁরা প্রতিনিধি আছেন, তাঁদের নিয়ে আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করব। এ ছাড়া বহিরাগত যারা রয়েছে, যারা উসকানি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সব শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ থাকব। সামনে ঈদ, তাই কোনো অজুহাতে যেন শ্রমিকেরা বেতন-বোনাস পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হবে। আমরা দর-কষাকষির মাধ্যমে আমাদের দাবি আদায় করব।’
শ্রমিকদের দাবি পূরণ না হলে কী করবেন, জানতে চাইলে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘আগে থেকেই এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে শ্রমিকেরা যেন বাঁচার মতো মজুরি পান, সেটাই আমরা আশা করছি।’
মজুরি বোর্ডের স্থায়ী প্রতিনিধি শ্রমিকনেতা ফজলুল হক বলেন, আইন অনুযায়ী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। বিজিএমইএ যদি মজুরি বোর্ডের পরবর্তী সভায় যৌক্তিক প্রস্তাব দেয়, তবে এর মধ্যেই হয়ে যেতে পারে। আর বিজিএমইএ আগের মতো অবাস্তব প্রস্তাব দিলে সময় লাগতে পারে।